অন্তরের কাঠিন্য – ডঃ আবু আমিনাহ বিলাল ফিলিপস পর্ব -১

হালাল ও হারাম সম্পর্কিত একটি বিখ্যাত হাদীসে  মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্তেরর গুরুত্ব সম্পর্কে আমাদের জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন :
“আমাদের শরীরে এমন একটি মাংস পিণ্ড রয়েছে যা সুস্থ থাকলে সারা শরীর সুস্থ থাকে আর যা অসুস্থ হলে সারা শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে। সেটি হচ্ছে হৃদয়।” [সম্পূর্ণ হাদীসটি হচ্ছে : আন-নু’মান বিন বাশীর কর্তৃক বর্ণিত : আমি আল্লাহ’র রাসূলকে বলতে শুনেছি, “হালাল ও হারাম উভয়েই স্পষ্ট, কিন্তু এ দুটির মাঝখানে রয়েছে সন্দেহজনক বিষয়সমূহ যা অধিকাংশ লোকই জানেনা। সুতরাং যে নিজেকে সন্দেহজনক বিষয় থেকে বাঁচিয়ে চলে, সে তার দ্বীন ও সম্মানের সংরক্ষণ করে। আর যে সন্দেহজনক বিষয়ে জড়িয়ে পড়ে, তার উদাহরণ হচ্ছে সেই রাখালের মত যে তার মেষপাল চরায় কোন সংরক্ষিত চারণভূমির কাছাকাছি এমন ভাবে যে, যে কোন মুহূর্তে সে তাতে প্রবেশ করবে। (হে লোকসকল!) সাবধান! প্রত্যেক বাদশাহরই একটি সংরক্ষিত সীমানা আছে এবং আল্লাহর সংরক্ষিত সীমানা হচ্ছে তাঁর নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ। সাবধান! আমাদের শরীরে এমন একটি মাংস পিণ্ড রয়েছে যা সুস্থ (পরিশুদ্ধ) থাকলে সারা শরীর সুস্থ থাকে, কিন্তু যদি তা কলুষিত হয়ে যায় সারা শরীর কলুষিত হয় এবং সেটি হচ্ছে হৃদয়।”] (বুখারী, প্রথম খণ্ড, দ্বিতীয় পুসক্ত , ৪৯ নং হাদীস)

কথাটি তিনি বলেছেন, প্রথমে একথা ব্যাখ্যা করার পর যে হালাল স্পষ্ট, হারামও স্পষ্ট এবং এদের মাঝখানের ক্ষেত্রটি অস্পষ্ট যা অনেকেই জানেনা। যাহোক, যা একজন মানুষকে হারাম থেকে বাঁচতে ও হালাল অবলম্বন করতে সাহায্য করে তা হচ্ছে জ্ঞান ; এবং জ্ঞান ছাড়া আর যা একাজটি করতে পারে, তা হচ্ছে অন্তেরর অবস্থা। যদি অন্তর পরিশুদ্ধ হয়, জ্ঞানকে ব্যবহার করে তা হারাম এড়িয়ে চলতে পারে। যদি তা কলুষিত হয়, জ্ঞান কোন উপকারে আসে না এবং মানুষ নিষিদ্ধ বিষয়ে জড়িয়ে পড়ে।

বিদায় হজ্বে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবাদের ও অনাগত মুসলিম জাতিসমূহের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন যে, কোন অনারবের উপর কোন আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই ; কালোর উপর সাদার কোন প্রাধান্য নেই, কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টিতে সেই শ্রেষ্ঠ যে আল্লাহকে ভয় করে – যে তাকওয়া অর্জন করেছে। এ বিষয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার পর তিনি বলেন, “তাকওয়ার অবস্থান হচ্ছে আমাদের অন্তের।” এটি এবং অনুরূপ আরো বক্তব্যে অন্তেরর উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে – যাকে আল্লাহ তাঁর সৃষ্ট অন্য সব অঙ্গের উর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন।

ঈমানের অবস্থান এখানেই। শরীরের অন্য কোন অঙ্গ যদি আল্লাহর আরো কাছের হতো, তাকওয়া সেখানেই অবস্থান করতো, কারণ মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো ঈমান। এ ছাড়া আর কিছুরই মূল্য নেই। যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে, যারা তাঁর বাণী গ্রহণ করেছে এবং যারা জান্নাতকে জাহান্নামের পরিবর্তে বেছে নিয়েছে – ঈমান তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। ঈমান বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীর মধ্যে পার্থক্য। দুনিয়ার সব কিছুর চেয়ে ঈমানের মূল্য বেশী। সেজন্য আল্লাহর রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে কোন একজন মানুষকেও ইসলামের পথ দেখানো দুনিযার সব কিছুর চেয়ে উত্তম। কারো জন্য অন্য কাউকে ঈমান অর্জনে সাহায্য করা যে কোন পার্থিব বস্তুর চেয়ে মূল্যবান।

কাজের শুদ্ধতার বিচার করা হয় হৃদয়ের অবস্থা দিয়ে। নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্ললাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে :

“কর্মের বিচার করা হয় নিয়ত অনুসারে।” নিয়ত বা ইচ্ছার স্থান ঠোঁটে নয়, হৃদয়ে। [হাদীসটির পূর্ণ বক্তব্য : উমর বিন খাত্তাব বর্ণনা করেছেন : আল্লাহর রাসূল বলেছেন, “কর্মফল নিয়তের উপর নির্ভরশীল এবং প্রত্যেকই তা পাবে যা সে চেয়েছে। অতএব, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য হিজরত করেছে, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশ্যেই। আর যে কোন পার্থিব স্বার্থ অর্জন বা কোন মহিলাকে বিয়ের উদ্দেশ্যে হিজরত করেছে, তার হিজরত সে জন্যই যে জন্য সে হিজরত করেছে।”] (বুখারী, প্রথম খণ্ড, দ্বিতীয় পুসক্ত , ৫১ নং হাদীস)

আমরা যে কাজই বাহ্যিকভাবে করি না কেন, আমাদের হৃদয়ের অবস্থা তখন কি ছিল, তা দিয়েই তার বিচার হবে। এগুলি হচ্ছে ভাল কাজ। মন্দ কাজ মন্দই, কিন্তু ভাল কাজ বলতে আমরা যা বুঝি তা সেসব কাজ যা ন্যায়পরায়ণতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আল্লাহ বিচার করবেন সত্যিই সেগুলি ন্যায় কাজ কিনা।

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের জানিয়েছেন যে প্রথম যে তিন ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুনে ফেলা হবে তারা মানুষের দৃষ্টিতে বড় বড় কল্যাণকর কাজে লিপ্ত ছিল। তারা হচ্ছে জ্ঞানের প্রচারে নিয়োজিত আলেম, ধনী ব্যক্তি যে তার সম্পদ থেকে দান করতো এবং আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে শাহাদাৎ বরণকারী। একটি সহীহ হাদীসে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে তারা প্রথম জাহান্নামে নিক্ষিপ্তদের অন্তর্ভূক্ত হবে। কারণ সেই আলেম আল্লাহর সন্তুটির জন্য জ্ঞান প্রচার করতো না, করতো মানুষের কাছে বড় একজন জ্ঞানী হিসাবে সম্মান ও প্রশংসা পাওয়ার জন্য। আলাহ তাকে বলবেন : “দুনিয়াতে তুমি যা চেয়েছিলে সেই প্রশংসা তুমি পেয়ে গেছো, আখিরাতে তোমার জন্য কিছু নেই।” তারপর তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে জাহান্নামে ফেলে দেওয়া হবে। একইভাবে ধনী লোকটিও তার ধন-সম্পদ উদার হস্তে দান করতো যাতে লোকে তাকে মহান দাতা হিসাবে প্রশংসা করে। কিন্তু আল্লাহ বলবেন, “তুমি প্রশংসার জন্য দান করেছ এবং তা পেয়েছো। তুমি বিশুদ্ধভাবে আল্লাহর জন্য তা করনি। যতক্ষণ লোকে প্রশংসা করেছে, তুমি বদান্যতা দেখিয়েছো, কিন্তু লোকে যখন তোমার প্রতি মনোযোগ দেয়নি, তুমিও দান করা বন্ধ করে দিয়েছ। তোমার বদান্যতা ছিল শর্তযুক্ত, আলাহর সন্তুষ্টির জন্য নয়।” অতঃপর তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে জাহান্নামে ফেলে দেওয়া হবে। আর যে আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়েছিল, আল্লাহ তাকে বলবেন : “তুমি এজন্য যুদ্ধ করেছো যে লোকে তোমাকে বলবে কত বড় একজন শক্তিশালী ও বীর যোদ্ধা তুমি!” লোকে তার প্রশংসা করেছে, কিন্তু সে আল্লাহর জন্য যুদ্ধ করেনি, সুতরাং তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে ফেলে দেওয়া হবে।

এসব কিছুই আমাদের এই শিক্ষা দিচ্ছে যে যদি হৃদয় অসুস্থ হয়, দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, বড় বড় সৎকর্মও কোন কাজে আসবে না। সুতরাং হৃদয়ের প্রতি আমাদের গভীর মনোযোগ দেওয়া উচিত। নিজেদের হৃদয়ের অবস্থা সম্পর্কে সচেতন হওয়া ও পর্যবেক্ষণ করার জন্য আমাদের প্রচুর সময় দিতে হবে। যখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকর সিদ্দীকের উচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে মানুষকে বলছিলেন, তিনি বলেছিলেন;

“সে তোমাদের চেয়ে বেশী সালাত আদায় করে না বা রোযা রাখেনা, তোমাদের অনেকেই তার চেয়ে বেশী সালাত আদায় কর ও রোযা রাখ, কিন্তু তার হৃদয়ে এমন কিছু আছে যা গভীরভাবে প্রোথিত … তা হচ্ছে তার হৃদয়ে অবস্থিত ঈমান।”

এখানেই ছিল তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব। অতএব একজন মুমিনের কাছে মানব শরীরে ও অস্তিত্বে আর কোন যোগ্যতা থাকতে পারে না যে সম্পর্কে সে আরো অধিক সচেতন হবে। আল্লাহ যেভাবে চান সেভাবে এই দক্ষতা/যোগ্যতা ক্রিয়াশীল করার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে। এ সম্পর্কে আমাদের খুব বেশী সচেতন হতে হবে। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রায়ই দুআ শুরু করতেন এভাবে :

“হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই এমন জ্ঞান থেকে যা উপকারী নয় এবং এমন হৃদয় থেকে যা ভীত নয়।”

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন। তিনি মানুষের সাথে খুবই নম্র ব্যবহার করতেন। তাঁর স্ত্রীরা বলেছেন যে তাঁরা এমন কোন ঘটনার কথা মনে করতে পারেন না যেখানে তিনি তাঁদের সাথে কর্কশ ভাষায় কথা বলেছেন বা তাঁদের আঘাত করেছেন। তিনি তাঁর নম্রতার জন্য সুপরিচিত ছিলেন। এবং আল্লাহ এই গুণটিকে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করেছেন। সূরা আলে-ইমরানে আল্লা বলেছেন :

“আল্লাহর দয়ার কারণেই তুমি তাদের সাথে নম্র। যদি তুমি রূঢ় ও কঠিন-হৃদয় হতে, তাহলে তারা তোমার কাছে থেকে দূরে সরে যেতো।” (সূরা আলে-ইমরান, ৩ : ১৫৯)

নবীদের বৈশিষ্ট্য ছিল এটাই এবং এই বৈশিষ্ট্য তাদেরও অবশ্যই অর্জন করতে হবে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ দেখায়। যেহেতু নবীদের জন্য এই গুণটি আবশ্যকীয়, এটি আমাদের জন্যও আবশ্যকীয়। যারা জ্ঞানের সন্ধানী তাদের জন্য এটি দরকারী, সব মানুষের জন্যই এটি দরকারী। আর পিতামাতার জন্যও ছেলেমেয়েদের প্রতি কোমল-হৃদয় হওয়া বাঞ্ছনীয়।

হৃদয়ের কোমলতা এমন একটি বিষয় যাতে আমরা প্রচুর সময় দিলেও যথেষ্ট হবে না। একবার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল-আকরা বিন হারিস এর বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি তার একটি বাচ্চাকে কোলে বসিয়ে আদর করে চুমা দিলেন। আল-আকরা বলল : “আমার আরও দশটি ছেলেমেয়ে আছে, কিন্তু আমি কখনো তাদের কাউকে চুমা দেইনি।” এটি ছিল একটি গর্বের বিষয়, পৌরুষ – যা কোমল নয়, কঠোর। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, “আল্লাহ যদি তোমার অন্তর থেকে দয়ামায়া সরিয়ে নিয়ে থাকেন, তাহলে আমার কি করার আছে!” তিনি আরো বললেন, “যে অন্যকে দয়া করে না সে দয়া পাবে না।” সুতরাং বাচ্চাদের প্রতি কোমল আচরণ করা পিতামাতার জন্য জরুরী। যে ঘরে বাবা ছেলেমেয়েদের প্রতি দয়ালু ও ক্ষমাশীল, সে ঘর সুখ ও আনন্দে ভরা থাকে।

দয়া এমন কিছু যা ছাড়া আমরা বাঁচতে পারি না। যারা জ্ঞানের সন্ধানী, যেহেতু দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক, জ্ঞানের সাথে যদি সে কোমল হৃদয়ের অধিকারী না হয়, তবে জ্ঞানের সৌন্দর্য্য উপভোগ করা সম্ভব হয় না। যেমন হাসান আল-বসরী বলেছেন, “যদি কেউ জ্ঞান অনুসন্ধান করে, তা তার চেহারা, হাত ও জিহবায় এবং আল্লাহর প্রতি তার বিনয়ে প্রকাশ পাবে।” এর বিপরীত কথাটিও সত্য যে কোন কিছুই জ্ঞানকে এবং দ্বীনের প্রতি আহ্বানের কাজকে ততটা নষ্ট করে না যতটা করে হৃদয়ের কাঠিন্য। যেখানে হৃদয় কঠিন হয়ে যায়, সেখানে জ্ঞান ব্যক্তির নিজেরও কোন উপকারে লাগে না বা সে তা দিয়ে অন্যেরও উপকার করতে পারে না।

হৃদয়ের কোমলতা সত্যিকার মুসলিমের বৈশিষ্ট্য। এর অনুপস্থিতিতে জীবন দুর্ভোগ ও অস্বচ্ছান্দ্যে ভরে যায়। এটা আল্লাহর ওয়াদা। যাদের হৃদয় কোমল নয় তারা দুর্ভোগময় জীবন যাপন করবে। যেমন সূরা আয-যুমারে আল্লাহ বলেছেন :

“যাদের অন্তর আল্লাহর স্মরণের ব্যাপারে কঠোর, তাদের জন্য দুর্ভোগ।” (সূরা আয-যুমার, ৩৯ : ২২)

তারা সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতার মধ্যে রয়েছে। তাদের জন্য দুর্ভোগ যারা কুরআন শ্রবণ করে কিন্তু তারপরও তারা ভীত ও বিনীত হয় না। দুর্ভোগ তাদের জন্য যাদের চোখকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিলেও আল্লাহর ভয়ে তা ক্রন্দন করে না। দুর্ভোগ তাদের জন্য যাদের কাছে আল্লাহর সতর্কবাণী পৌঁছানোর পরও তারা তাঁর বাণীর প্রতি শ্রদ্ধাবনতও হয় না। কঠিন-হৃদয় বিশিষ্ট হওয়া একটি অভিশাপ আর হৃদয়ের নম্রতা সৌভাগ্যের কারণ। জীবনের সমস্ত কাম্য বস্তুর অধিকারী হলেও কঠিন হৃদয়-সম্পন্ন ব্যক্তি কষ্ট ভোগ করে। আপাত দৃষ্টিতে সুখময় মনে হলেও  তা এক শূন্য জীবন — একাকীত্বে পূর্ণ। তারা মনে এবং অন্তের শান্তি পায় না, কারণ তাদের অন্তর আল্লাহর প্রতি কঠিন – আল্লাহকে বিশ্বাসের ব্যাপারে ও তার আনুগত্যের ব্যাপারে। সেজন্যই আল্লাহ বলেছেন, যে তাঁর স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে সে দুদর্শাগ্রস্ত জীবন যাপন করবে।

“… যে আমার বাণী থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে তার জন্য রয়েছে সংকীর্ণ জীবন, আর বিচার দিবসে আমরা তাকে উত্থিত করবো অন্ধ করে।” (সূরা তা-হা, ২০ : ১২৪)

এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেছেনম একমাত্র আল্লাহর স্মরণেই হৃদয় শান্ত হয়।

“যারা বিশ্বাস করে, এবং যাদের হৃদয় আল্লাহর স্মরণে তৃপ্তি লাভ করে : নিঃসন্দেহে আল্লাহর স্মরণেই হৃদয়সমূহ শান্তি লাভ করে।”(সূরা রা’দ, ১৩ : ২৮)

এ জীবনে সবচেয়ে উপকারী বস্তু হচ্ছে একটি কোমল হৃদয়। আমরা হৃদয়ের কোমলতা অর্জনে চেষ্টা করবো। কারণ এছাড়া সবকিছুই অর্থহীন ও অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবে। কিভাবে আমরা তা অর্জন করতে পারি ? (চলবে)

*[আবু আমিনাহ বিলাল ফিলিপস ১৯৪৭ সালে জ্যামাইকায় একটি খ্রিস্টান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কানাডায় বড় হন। ষাটের দশকের শেষ দিকে ভ্যানকুভারে সাইমন ফ্রেসার ইউনির্ভাসিটিতে পড়া অবস্থায় সেখানকার বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনে যোগদান করেন। ধীরে ধীরে তাঁর কম্যুনিজমের প্রতি আগ্রহ জন্মায় এবং তিনি কম্যুনিস্ট আদর্শ গ্রহণ করেন। তিনি একবছর স্যান ফ্রান্সিস্কোতে কম্যুন্সিট পার্টির সাথে কাজ করার পর এই দলের কর্মকান্ডের আসল রূপ দেখতে পেয়ে পুনরায় কানাডায় ফিরে আসেন। কম্যুনিস্ট দর্শন তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারছিল না, এ দর্শন সমাজকে পরিবর্তনের কথা বললেও পরিবর্তন আনার মত বাস্তবধর্মী হাতিয়ার এর ছিল না, তাছাড়া কম্যুনিস্ট দর্শন প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ছিল ব্যর্থ, আর শ্রমজীবী শ্রেণীর স্বার্থের নামে পরিচালিত গণ নির্যাতনকে তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। তাছাড়া বহু বামপন্থী নেতাই ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অত্যন্ত- অসৎ ও অনৈতিক। অবশেষে তিনি কম্যুনিজম ত্যাগ করেন এবং হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম প্রভৃতি অন্যান্য ধর্ম ও দর্শন পরখ করে দেখেন। ১৯৭১ সালে তাঁর এক কম্যুনিস্ট বন্ধু ইসলাম গ্রহণ করলে তিনি ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং ইসলাম সম্পর্কে পড়াশুনা শুরু করেন। তিনি উপলব্ধি করেন যে ইসলামই মানবজাতির জন্য শ্রেষ্ঠ সমাধান উপস্থাপন করে, এতে রয়েছে সমাজবাদী এবং পুঁজিবাদী দর্শনের ভাল দিকগুলোর সমন্বয়। ছয় মাসের পড়াশুনা এবং আলোচনা-পর্যালোচনার পর তিনি ১৯৭২ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এর একবছর পর তিনি মদীনার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন শুরু করেন। ১৯৭৯ সালে তিনি মদীনার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উসুল আল দ্বীন অনুষদ থেকে আরবী ভাষায় ডিপ্লোমা এবং বি.এ. ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৮৫ সালে তিনি রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ইসলামিক থিওলজি’ তে এম.এ. ডিগ্রী লাভ করেন। একই বিষয়ের ওপর তিনি ১৯৯৪ সালে ডক্টরেট ডিগ্রী নেন ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলস এর ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ থেকে। উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ও এর ঠিক পরপর তিনি তাঁর কয়েকজন সঙ্গী সহ সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন বাহিনীর কাছে ইসলামের বিশুদ্ধ শিক্ষাকে উপস্থাপন করার এক প্রোজেক্ট হাতে নেন, মার্কিন সেনাদের মাঝে বিদ্যমান ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করা ছিল তাঁদের এই প্রোজেক্টের লক্ষ্য। তাঁদের এই প্রচেষ্টায় তিন হাজারের ওপর মার্কিন সেনা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৯৪ সাল থেকে তিনি আরব আমিরাতে বসবাসরত ছিলেন। সেখানে থেকে তিনি অধ্যাপনা, প্রকাশনা, খুতবা এবং বক্তৃতার মাধ্যমে ইসলামের বিশুদ্ধ শিক্ষাকে প্রচারের কাজ করে আসছিলেন। অল্প কিছুদিন আগে ইসলামের বাণী প্রচারে তাঁর স্পষ্টবাদিতার কারণে তাঁকে আরব আমিরাত ত্যাগ করতে হয়। উল্লেখ্য যে তাঁর ৩০টিরও বেশী প্রকাশনা রয়েছে এবং তিনি সারজাহতে দার আল ফাতাহ প্রেস, দুবাইতে ডিসকভার ইসলাম নামক ইসলাম প্রচার কেন্দ্র, সারজাহ টিভি চ্যানেল-২, স্যাটেলাইট (ইসলামী চ্যানেল), আজমান টিভি চ্যানেল-৪ এবং সৌদি টিভি চ্যানেল-২ এর সাথে ইসলাম প্রচারের কাজে জড়িত ছিলেন। তিনি বর্তমান বিশ্বের নামকরা ইসলামী পন্ডিত এবং চিন্তাবিদদের অন্যতম।]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s