তাওহীদের মূলসূত্রাবলীঃ আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা -২

তাওহীদ আল আসমা ওয়া সিফাত:

অর্থ: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নাম এবং গুণাবলীর ক্ষেত্রে তাঁর একত্ব। এর অর্থ হচ্ছে:

১) আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ওপর কেবল সেসকল নাম ও গুণাবলী আরোপ করা যাবে যা আল্লাহ বা তাঁর রাসূল (সা) করেছেন, এক্ষেত্রে এসব নাম এবং গুণাবলীকে ব্যাখ্যা- বিশ্লেষন করার চেষ্টা করা যাবে না কিংবা এগুলোর বাহ্যিক অর্থ ব্যতীত অন্য কোন অর্থ খোঁজা যাবে না। যেমন কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর ক্রোধের কথা উল্লেখ করেছেন:

“… আল্লাহ তাদের প্রতি ক্ষুদ্ধ, তাদেরকে অভিসম্পাত করেন, এবং তাদের জন্য মন্দ পরিণতি প্রস্তুত রেখেছেন।” (সূরা আল ফাতহ, ৪৮ : ৬)

এ আয়াত থেকে এটুকুই বুঝতে হবে যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ক্ষুদ্ধ হন। তবে তাঁর ক্রোধকে মানুষের ক্রোধের সাথে তুলনা করা যাবে না কেননা:

“কোন কিছুই তাঁর মত নয়।” (সূরা আশ শূরা, ৪২ : ১১)

আল্লাহ পাক যখন নিজের কোন বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা দেন, তখন প্রথমতঃ তাতে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে, এবং তাঁর এ গুণকে মানুষের অনুরূপ গুণের সাথে তুলনা করা চলবে না।

২) আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রতি কোন নতুন নাম অথবা গুণ আরোপ করা যাবে না। যেমন: আল্লাহ পাক তাঁর ক্রোধের (ঘদব) কথা উল্লেখ করেছেন, কিন্তু তাই বলে তাঁকে “ঘাদিব” নামে ডাকা যাবে না, কেননা তিনি নিজের সম্পর্কে এ নামের উল্লেখ করেন নি।

৩) সৃষ্টির কোন বৈশিষ্ট্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ওপর আরোপ করা যাবে না। যেমন: বাইবেলে উল্লেখ আছে যে তিনি ছয়দিনে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করে সপ্তম দিন ঘুমিয়েছেন। এ বক্তব্যে মানুষের দুর্বলতা আরোপ করা হয়েছে আল্লাহ পাকের ওপর, অতএব এটা তাঁর গুণাবলীর ক্ষেত্রে শিরক্‌। তেমনি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দেখা ও শোনার ক্ষেত্রে কখনওই মানুষের দেখা ও শোনার সাথে তুলনা করা চলবে না।

৪) কোন মানুষের ক্ষেত্রে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কোন গুণ আরোপ করা যাবে না। যেমন যদি বলা হয় অমুক ব্যক্তি “ভবিষ্যত” কিংবা “গায়েব” এর খবর রাখে, তবে তা হবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার গুণের ক্ষেত্রে শিরক।

৫) কোন সৃষ্টির ক্ষেত্রে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কোন নামকে এর নির্দিষ্ট রূপে (যেমন আর-রাহীম) ব্যবহার করা যাবে না। যেমন আমাদের দেশে আব্দুস সামাদ নামধারী লোককে সামাদ, সামাদ সাহেব ইত্যাদি নামে ডাকা হয়, এরূপ করা নিষিদ্ধ কেননা সামাদ আল্লাহর এমন একটি নাম, যা কোন মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে না, তাই শুরুতে আবদ শব্দ যোগ করে ডাকতে হবে। কোন কোন নাম অনির্দিষ্ট আকারে মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে। যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুহাম্মাদ (সা) কে “রাউফ” (স্নেহশীল) এবং “রাহীম” (দয়ার্দ্র) বলে উল্লেখ করেছেন:

“তোমাদের মাঝে তোমাদের মধ্য থেকেই এসেছেন এক রাসূল, (তিনি এমনই যে) তোমাদেরকে ভারাক্রান্ত করে মত সবকিছুই তাঁকে দুঃখিত করে। তিনি তোমাদের চিন্তায় সদা ব্যস্ত, মু’মিনদের জন্য স্নেহশীল ও দয়াময়।” (সূরা আত তাওবাহ, ৯ : ১২৮)

তাই কোন ব্যক্তিকে রাউফ বা রাহীম নামে ডাকা যেতে পারে কিন্তু আর-রাউফ বা আর-রাহীম নামে ডাকা যাবে না। তবে আব্দুর রাউফ বা আব্দুর রাহীম নামে ডাকা যাবে। তেমনি কাউকে আব্দুর রাসূল, আব্দুল হোসাইন প্রভৃতি নামে ডাকা যাবে না।

তাওহীদ আল ইবাদাহ বা তাওহীদ আল উলুহিয়্যাহ:

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার রুবুবিয়্যাহর ক্ষেত্রে তাঁর গুণাবলীকে স্বীকার করে নেয়া, এবং সেক্ষেত্রে তাওহীদ রক্ষা করার সাথে সাথে সমস্ত ইবাদাত হতে হবে একমাত্র এবং সরাসরি আল্লাহ পাকের উদ্দেশ্যে, শুধুমাত্র তাঁরই জন্য। যেমন রাসূলুল্লাহর (সা) যুগে মুশরিকরা আল্লাহকে রিযিকদাতা হিসেবে স্বীকার করত:

“বলুন: কে তিনি, যিনি তোমাদেরকে আসমান এবং যমীন থেকে সকল কিছু (রিযক) যোগান দেন, শোনা এবং দেখাকে নিয়স্ত্রণ করেন, মৃত থেকে জীবন নিয়ে আসেন এবং মৃতকে বের করেন জীবিত (বস্তু) থেকে এবং মানুষের বিষয়সমূহ নিয়ন্ত্রণ করেন? তারা বলবে: আল্লাহ।” (সূরা ইউনুস, ১০ : ৩১)

“যদি তুমি তাদেরকে প্রশ্ন করতে কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তারা নিশ্চয়ই বলত: ‘আল্লাহ’।” (সূরা আয যুখরুফ, ৪৩ : ৮৭)

কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা ছিল কাফির এবং মুশরিক – কেননা তারা আল্লাহকে ইবাদাত করার পাশাপাশি অন্য ‘উপাস্য’ বানিয়ে সেগুলোর ইবাদাত করত। অতএব সকল প্রকার ইবাদাত হবে একমাত্র এবং সরাসরি আল্লাহর উদ্দেশ্যে এবং তাঁরই জন্য। এবং তিনিই কেবল ইবাদাতের প্রতিদান মানুষকে দিতে পারেন। আল্লাহ পাকের সাথে মানুষের সম্পর্ক স্থাপনের জন্য এবং তাঁর ইবাদাতের দ্বারা তাঁর নৈকট্যলাভের জন্য মাধ্যম হিসেবে কোন মানুষের বা অন্য কোন সৃষ্টির প্রয়োজন নেই, মাধ্যম হিসেবে কাউকে গ্রহণ করা শিরক। আল্লাহ মানুষকে (এবং জ্বিনকে) সৃষ্টি করেছেন শুধুই তাঁর ইবাদাত করার জন্য, এবং সকল নবী রাসূল প্রেরিত হয়েছেন এই ইবাদাতের ক্ষেত্রে আল্লাহ পাকের তাওহীদকে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে, এটাই নবুওয়তের মূল বাণী। আর শিরকই হচ্ছে সবচেয়ে মারাত্মক অপরাধ – অর্থাৎ আল্লাহ পাকের ইবাদাতের ক্ষেত্রে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করা সবচেয়ে বড় গুনাহ্ । স্মরণ রাখা প্রয়োজন, দু’আও এক প্রকার ইবাদাত। তাই দু’আ করতে হবে কেবলমাত্র এবং সরাসরি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে। আমরা প্রতি রাকআত সালাতে এ আয়াতটি পাঠ করি:

“আমরা কেবল তোমারই ইবাদাত করি, কেবল তোমার কাছেই সাহায্য চাই।” (সূরা আল ফাতিহা ১ : ৪)

আল্লাহর রাসূল (সা) এই ধারণাকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে: “যদি তুমি কোন কিছু চাও, একমাত্র আল্লাহর কাছেই চাইবে, আর যদি সাহায্য চাইতে হয়, তাও কেবল আল্লাহর কাছেই চাইবে।”

“আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে বস্তুতঃ আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করে নেই, যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে। কাজেই আমার হুকুম মান্য করা এবং আমার প্রতি নিঃসংশয়ে বিশ্বাস করা তাদের একান্ত কর্তব্য। যাতে তারা সৎপথে আসতে পারে।”(সূরা আল বাকারাহ ২ : ১৮৬)

“ আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি এবং তার মন নিভৃতে যে কুচিন্তা করে, সে সম্বন্ধেও আমি অবগত আছি। আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী থেকেও অধিক নিকটবর্তী।” (সূরা কাফ, ৫০ : ১৬)

তাই আল্লাহ পাকের কাছে সবকিছু সরাসরি চাইতে হবে। ইবাদাতের ক্ষেত্রে তাওহীদ বজায় রাখার তাৎপর্য হল:

  • ইবাদাত ও দু’আর ক্ষেত্রে কোন ধরণের মাধ্যম অবলম্বন করা শিরক ।
  • জীবিত বা মৃত কারও উদ্দেশ্যে দু’আ করা শিরক, সরাসরি আল্লাহর কাছে চাইতে হবে।

যখন মক্কার মুশরিকদেরকে প্রশ্ন করা হত, কেন তারা মূর্তির উদ্দেশ্যে দু’আ করে, তারা বলত:

“আমরা শুধু এজন্যই তাদের ইবাদাত করি যেন তাদের মাধ্যমে আমরা আল্লাাহর নৈকট্য লাভ করতে পারি।” (সূরা আয যুমার, ৩৯ : ৩)

ইবাদাত বলতে ইসলামের বাহ্যিক কাজগুলো যেমন: সালাত, সাওম, যাকাত প্রভৃতি ছাড়াও, ভালবাসা, ভয়, ভরসা এগুলোর চুড়ান্তরূপকে ও বোঝানো হয়। এবং এগুলিও চুড়ান্তরূপে এক আল্লাহর জন্যই নির্ধারিত হতে হবে।

“মানুষের মাঝে কেউ কেউ অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষ করে নেয়। তারা তাদেরকে এমনভাবে ভালবাসে যেমনটি শুধু আল্লাহকেই ভালবাসা উচিৎ।” (সূরা আল বাকারাহ, ২ : ১৬৫)

“তুমি কি তাদের সাথে লড়াই করবে না যারা তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে, রাসূলকে বের করে দেয়ার ষড়যন্ত্র করেছে এবং তোমাদেরকে আক্রমন করার ক্ষেত্রে অগ্রগামী? তোমরা তাদের ভয় কর? তোমরা আল্লাহকে ভয় করবে, তিনিই এর প্রকৃত দাবীদার, যদি তোমরা সত্যিই মু’মিন হও। (সূরা আত তাওবাহ, ৯ : ১৩)

একদা রাসূলুল্লাহ’র সাহাবী আদি ইবন হাতিম (রা), যিনি খ্রীষ্ট ধর্ম ছেড়ে ইসলামে ধর্মান্তরিত হন, আল্লাহর রাসূল (সা) কে নিম্নোক্ত আয়াতটি পাঠ করতে শুনলেন:

“তারা তাদের পণ্ডিত এবং সন্ন্যাসীদের আল্লাহর পাশাপাশি তাদের রব হিসেবে গ্রহণ করেছে।” (সূরা আত তাওবাহ্ ৯ : ৩১)

শুনে তিনি মন্তব্য করলেন, ‘নিশ্চয়ই আমরা তাদের ইবাদাত করতাম না।’ আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর দিকে ফিরে প্রশ্ন করলেন:

“এমনকি হতো না যে আল্লাহ যা হালাল করেছেন, তারা তা হারাম করে দিত আর তোমরাও সেগুলোকে হারাম বলে গণ্য করতে, আর আল্লাহ যা হারাম করেছেন, তারা তাকে হালাল করে দিত, এবং তোমরাও সেগুলোকে হালাল করে নিতে?”, তিনি জবাবে বললেন: “হাঁ, আমরা নিশ্চয়ই তাই করতাম।” আল্লাহর রাসূল (সা) বললেন; “ওভাবেই তাদের ইবাদাত তোমরা করতে।”

এ থেকে বোঝা যায় যে শরীয়া বিরুদ্ধ যেকোন আনুগত্য প্রত্যাখান করতে হবে ।

আনুষঙ্গিক বিষয়সমূহ

Advertisements

2 comments on “তাওহীদের মূলসূত্রাবলীঃ আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা -২

  1. পিংব্যাকঃ প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য যা জানা একান্ত কর্তব্য-২ | In Search of Inner Peace | ইসলামিক বাংলা ব্লগ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s