গ্যালারি

বিংশ শতকের জাহেলিয়াত – ডঃ আবু আমিনাহ্ বিলাল ফিলিপস্-২

যুক্তিবাদ

যে মতবাদে মানুষের যুক্তিবুদ্ধিকে আল্লাহর ওহীর উপর স্থান দেয়া হয় তাকে বলা যায় যুক্তিবাদ। মডার্নিজম বা মডার্নিস্ট মুভমেন্ট যুক্তিবাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। এই চিন্তাধারায় মানুষ ইসলামকে বিংশ শতাব্দির জন্য উপযোগী করে তুলতে নতুন করে ব্যাখ্যা করতে চায়। এরকম বহু লোক পাওয়া যাবে তা সে মোহাম্মদ আবদুহুই হোক বা স্যার সৈয়দ আহমেদই হোক। সারা বিশ্বে কিছু লোক তাদের ভাষণে বা বইয়ে কয়েক শতাব্দি ধরে জেনে আসা ইসলামী শরীয়তের মূলনীতিগুলো অস্বীকার করে বসছে। তারা সেসবের এমন সব ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছে যে তা সেগুলোকে বাতিল করারই সমতুল্য। তাদের প্রিয় একটি বিষয় হচ্ছে ইসলামের বহুবিবাহ। তারা বলে আসলে একটাই বিয়ে করা উচিত। কুরআনের কোথায় বলা হয়েছে যে পুরুষরা মাত্র একটা বিয়ে করতে পারবে? আল্লাহ বলেছেন,

“তুমি তাদের (একাধিক স্ত্রীদের) সাথে যতই চেষ্টা করোনা কেন সুবিচার করতে পারবেনা।”

এজন্য তারা বলে, যদি কেউ একাধিক বিয়ে করে, তবে সুবিচার করা সম্ভব না,যদি সুবিচার করা যেত, তবে তা ঠিক আছে। কিন্তু যেহেতু তা করা অসম্ভব তাই একাধিক বিয়ে করা ঠিক নয়।

তেমনি ইউসুফ আলীর কুরআনের অনুবাদের পাদটীকায় তিনি লিখেছেন বিংশ শতকের আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সুদ আর রাসুলুল্লাহর (সা) সময়ের সুদ একরকম নয়, তাই সুদ খাওয়া যাবে। এটা কেমন কথা হলো? অথচ সুদ খাওয়া কবীরা গুনাহর মধ্যে পড়ে। রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন সুদের ৭০ টি শাখা আছে এবং এর সবচেয়ে প্রাথমিক রূপের উদাহরণ হলো মায়ের সাথে যিনার সমতুল্য। যে সুদকে এত কঠোর ভাষায় নিন্দা করা হয়েছে তা হঠাৎ করে একজন এসে বলছে হালাল। এসব হচ্ছে মডার্নিস্টদের কার্যকলাপের অংশবিশেষ।

এই আধুনিকতার রেশ হিসেবে দেখা যায় মুসলিম দেশগুলো ধর্মনিরপেক্ষ সরকার দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। ইসলামী শরীয়ত সংশোধিত আকারে শুধুমাত্র পারিবারিক মামলা মোকদ্দমায় সীমাবদ্ধ। মুসলিম দেশের আইনকানুন ব্রিটিশ, ফরাসী, জার্মান আইনের অনুরূপ। তারা বলে বর্তমানে ইসলামী আইন অচল। তারা এটা মুখে না বললেও তাদের মন মানসিকতা এরকমই। এর ফলস্বরূপ মুসলিমরা আজ ভোগান্তি পোহাচ্ছে। মুসলিম দেশগুলোতে মদ উৎপাদন, পতিতাবৃত্তির মত কবীরা গুনাহ প্রকাশ্যে সংঘটিত হচ্ছে যা কিনা রাসুলুল্লাহর (সা) সময় কল্পনাও করা যেত না।

যুক্তিবাদীদের তৃতীয় দলটি হচ্ছে চরমপন্থী বা সন্ত্রাসী। পশ্চিমা দেশে যে কেউ ইসলাম পালন করলে তাকে এসব নামে ডাকা হয় — আমি সে অর্থে বলছিনা। যদি আপনি ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক চলতে চান, ইসলামকে নিজের জীবনের পরিচালিকা শক্তিরূপে গ্রহণ করে থাকেন, তবে পশ্চিমারা আপনাকে বলবে মৌলবাদী, সন্ত্রাসী, চরমপন্থী। এভাবে বিচার করলে সব মুসলমানই মৌলবাদী, সন্ত্রাসী। তাই আমি সন্ত্রাসী তাদেরই বলছি যারা শরীয়তের সীমালংঘনকারী। মাঝে মাঝে তাদের নিয়ত ভাল হতে পারে, তারা হয়ত বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পাল্টাতে চায়। তারা যেকোন উপায়ে লক্ষ্যে পৌছাঁবার নীতি গ্রহণ করেছে। তাদের শ্লোগান তাকবীর নয়, তাদের শ্লোগান হচ্ছে তাকফীর। তাকবীর অর্থ আল্লাহু আকবার আর তাকফীর অর্থ তুই একটা কাফের। নিজেরা বাদে ডানে বায়ে সবাইকে তারা কাফের বলে।

তারা বর্তমান মুসলিমদেরকে ঢালাওভাবে কাফের মনে করে এবং পরিশেষে সাধারণ মুসলিমদের হত্যা করা জায়েজ ধরে নেয়। এর নাম নাকি ইসলামী বিপ্লব। পশ্চিমা দেশকে তারা বলে দারুল হারব অর্থাৎ আমরা যুদ্ধাবস্থায় আছি। তাদের মতে যুদ্ধাবস্থায় যেকোন পথ অবলম্বন করা যায়। তাদের মতে এ অবস্থায় সুদ খাওয়া যায়, অনেকেতো ব্যাংক ডাকাতি করা যায় বলে ফতোয়া দিয়ে বসেছে।

বর্তমানে নিউইর্য়ক জেলে আঠারো থেকে বাইশ বছরের একদল মুসলিম তরুণ বন্দী। একজন নামকরা শেখ (বর্তমানে জেলে) ফতোয়া দিয়েছিলেন মুসলিমদের স্বার্থে আমেরিকায় ব্যাংক ডাকাতি করা জায়েজ। এই তরুণরা দেখল মুসলিমরা আমেরিকায় কষ্টে আছে, জমি ব্যয়বহুল বলে মসজিদ তৈরিতে অনেক টাকার দরকার; তাই তারা শর্টকাট হিসেবে ফতোয়াটা লুফে নিল। তারা কানেকটিকাট থেকে ফ্লোরিডা পর্যন্ত চৌদ্দ পনেরোটা ব্যাংক ডাকাতি করল এবং টাকাটা নিজেরা রাখল না। কিন্তু তাদের একজন ধরা পড়ে গিয়েছিল এবং সে সব ফাঁস করে দেয়ায় বাকি সবাই ধরা পড়ে যায়। এই তরুণরা যারা কলেজ পড়ুয়া, নববিবাহিত তারা এখন ৪৫ বছরের জন্য জেল খাটবে।

এ হলো আমাদের জাহেলিয়াতের অংশবিশেষ। আমাদের ধৈর্য বলতে কিছু নেই। ইসলামী আন্দোলন এমন কিছু নয় যার ফলাফল আমরা আগামীকালই আমাদের প্রজন্মে চোখের সামনে দেখতে পাব। এটা একমাত্র আল্লাহর হাতে। আমাদের কাজ হচ্ছে শুধু এর বীজটা বপন করা। আল্লাহ একে বাড়তে দিলে এটা বাড়বে। বীজটা বাড়লো কি বাড়লোনা এর জন্য আল্লাহ আমাদের দায়ী করবেন না, বরং আমরা বীজটা বুনেছিলাম কিনা তার জন্য জবাবদিহি করতে হবে। ইসলামের প্রসার ও ইসলামকে কায়েম করতে আমাদের তাই ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে।

যুক্তিবাদী চিন্তাধারায় মানুষ কুরআন ও সুন্নাহকে বিবেক বুদ্ধি দিয়ে বিচার করছে এবং যা তার প্রয়োজন তা গ্রহণ করছে আর যা দরকার নেই তা অস্বীকার করছে। এর সহজ উদাহরণ হচ্ছে ‘বাইবেল, কুরআন ও বিজ্ঞান’ বইটি। এই বইটি আমরা অমুসলিমদের মধ্যে বিতরণ করে থাকি। বইটির প্রথম নব্বই ভাগ কিছু ভুল থাকা সত্তেও চমৎকার, কিন্তু শেষ দশভাগে রাসুলুল্লাহর সুন্নতের উপর সরাসরি আক্রমণ করা হয়েছে। লেখক (মরিস বুকাইলি) বলেছেন, কুরআন যেহেতু আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিল হয়েছে তাই এটি বিজ্ঞানের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু তিনি কয়েকটি সহীহ হাদিস নিয়ে দেখাতে চেয়েছেন যে সেগুলো বিজ্ঞানের সাথে মিলছেনা, তাই তাঁর কাছে মনে হয়েছে এ কারণে সুন্নত পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য নয়। মাছির হাদীসের কথাই ধরা যাক, রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন

“যদি তোমাদের পাত্রে মাছি পড়ে তবে সেটি পাত্রে ডুবিয়ে ফেলে দিবে এবং এরপর পান করো; কারণ মাছির এক ডানায় রোগ ও অপর ডানায় এর উপশম আছে।” (আবু হুরায়রা কর্তৃক বর্ণিত সহীহ বুখারী ৪র্থ খন্ড ৫৩৭ নং হাদীস)

একজন ডাক্তার হিসেবে লেখক বলেছেন মাছি শুধু রোগই ছড়ায়, এর উপশমের কোন তথ্য তাঁর জানা নেই। এজন্য তিনি বলেছেন হাদীসটি গ্রহণযোগ্য নয়। এটিকে বলা যায় যুক্তিবাদী চিনতাভাবনা। এরকম চিন্তায় অবশ্যই ত্রুটি আছে। আপনি যদি একশ বছর আগে কোন ডাক্তারকে বলতেন বিষ খেলে মানুষের হৃদরোগ ভালো হয়ে যাবে, তবে তিনি আপনাকে পাগল ভাববেন। কিন্তু সাপের বিষ যা স্নায়ুতন্ত্রের উপর কাজ করে তা দিয়ে আজকাল হৃদপিন্ড চালু রাখা হচ্ছে, বিষ দেয়া বন্ধ করলে রোগী মারা যাবে। আজকাল বাংলাদেশ ও অন্যান্য অঞ্চলে সাপের চাষ করা হয়, বিষ সংগ্রহ করে অস্ট্রিয়া এবং অন্যান্য দেশে পাঠানো হচ্ছে, সেই সাপের বিষ থেকে একটা অংশ নিয়ে হৃদরোগীর ওষুধও তৈরি হচ্ছে। এরকম আরেকটা উদাহরণ দিই। যারা বিস্ফোরক নিয়ে কাজ করেন, তারা জানেন নাইট্রোগ্লিসারিন কি করতে পারে। এটি আগের আমলের প্রথম সারির বিস্ফোরক। কেউ যদি বলে নাইট্রোগ্লিসারিন হৃদরোগীর জন্য পান করা ভাল, তবে অন্যরা হেসে বলবে ঝাঁকি খেলেই তো বিস্ফোরণে টুকরো টুকরো হয়ে যাব। কিন্তু আজকাল এই নাইট্রোগ্লিসারিন হৃদরোগীদের ওষুধ। তাই আজ যে সম্পর্কে আমরা বুঝে উঠতে পারছি না, যেমন মাছির মধ্যে উপশম দেখছি না, তার মানে এই নয় যে তা আসলেই নেই। এর অর্থ হচ্ছে আমাদের পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই।

আমরা জানি সাপের নিজের বিষের জন্য প্রতিষেধক আছে। যদি এর প্রতিষেধক না থাকতো তবে মৃত্যু নিশ্চিত ছিল। যদি এটি বিষ দিয়ে মারা কোন প্রাণী খায় তবে মারা যাওয়ার কথা। অনুরূপে প্রকৃতিতে অনেকেই ক্ষতি এবং এর প্রতিকার বহন করে। তাই সঠিক যুক্তিবুদ্ধি প্রয়োগ করলে আমাদের ডাক্তার সাহেব সুন্নতকে তর্কের খাতিরে আক্রমণ করতে পারতেন না।

এ প্রসঙ্গে আমি প্রায়ই একটি উদাহরণ দিয়ে থাকি আর তা হচ্ছে উপুড় হয়ে ঘুমানো। একটি হাদীসে আছে একজন সাহাবী উপুড় হয়ে ঘুমাচ্ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা) তাকে বললেন উপুড় হয়ে ঘুমিয়ো না, আল্লাহ এরকরম পছন্দ করেননা। কেন আমরা উপুড় হয়ে ঘুমাবো না? অনেকে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন কিন্তু আমার কাছে তা যথাযথ মনে হয়নি। তাবলীগের লোকরা বলে সফরে গেলে উপুড় হয়ে ঘুমালে স্বপ্নদোষ হয়। তাহলে মহিলাদের উপুড় হয়ে ঘুমাতে সমস্যা কোথায়? আমি এই ব্যাখ্যা শুনে চুপ থেকেছি আর কাউকে জানাতে চাইনি। এর কয়েকদিন পর আমি প্লেনে ভ্রমণ করছিলাম, সেখানে দেখলাম টাইম ম্যাগাজিনে স্পাইনাল কর্ড অপারেশনের ক্ষেত্রে বড় বড় চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির কথা ছাপা হয়েছে। অপারেশনের নতুন ধরনের কলাকৌশল; ফাঁক হয়ে যাওয়া কশেরুকায় স্টীল পিন লাগানো ইত্যাদি চমৎকার সব ব্যাপার। অপারেশনের সবরকমের সমস্যা দেখে সবশেষে ডাক্তারদের পরামর্শও দেয়া হয়েছিল যার এক নম্বরে ছিল “উপুড় হয়ে ঘুমাবেন না”। যখন আমরা উপুড় হয়ে ঘুমাই তখন আমাদের শরীরের সবচেয়ে ভারী হাড় সমষ্টি মেরুদন্ডকে বহন করার জন্য চর্বি জাতীয় অঙ্গ ছাড়া আর কিছুই থাকেনা। ফলে মেরুদন্ড নিচের দিকে ঝুঁকে পড়ে। বৃদ্ধ বয়সে কুঁজো হয়ে যাওয়ার এটাই প্রধান কারণ। ডাক্তাররা তাই পরামর্শ দেন এক পাশে কাত হয়ে হাটু ভাঁজ করে ঘুমাতে; রাসুলল্লাহ (সা) ঠিক তাই করতেন। মুসলিম উম্মাহ ১৪০০ বছর ধরে এ সুন্নত পালন করে আসছে।

এছাড়া চার বছর আগে ইংল্যান্ডে সাডেন ডেথ সিনড্রোম (এস.ডি.এস) বা কট-ডেথ নিয়ে গবেষণা হয়। এই রোগে দুই তিন বছরের শিশুরা ঘুমের মধ্যে কোন নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই মারা যায়। গবেষকরা যেসব পিতামাতার সন্তানরা এই রোগে মারা গেছে তাদের সাক্ষাৎকার নেন এবং যাবতীয় তথ্য (যেমন ঘরের তাপমাত্রা, বিছানার ধরন, আবরণ ছিল কি না ছিল ইত্যাদি) সংগ্রহ করেন। তারা সবক্ষেত্রেই দেখতে পান একটা ব্যাপার মিলে যাচ্ছে; বাচ্চাদের উপুড় করে শোয়ানো হয়েছিল। এটা নিয়ে হুলস্থুল বেঁেধ গিয়েছিল, পত্রিকার হেডলাইনে এসেছিল “শিশুদের উপুড় করে ঘুম পাড়াতে ডাক্তাররা মায়েদের নিষেধ করছেন”।

আবু দাউদে একটি সহীহ হাদীসে আলী (রা) কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে

যদি ধর্মটা পুরোপুরি যুক্তির উপর ভিত্তি করে হতো তবে মোজার উপরে মাসেহ না করে তলদেশ মাসেহ করা হতো। আমরা অযুর সময় নিজেদের ধুয়ে পরিস্কার করি। যখন জুতা খুলে হাঁটি তখন মোজার কোন অংশটা ময়লা হয়? অবশ্যই নিচের অংশ। তাই অযু করার সময় তলা মাসেহ করাই তো যুক্তিযুক্ত। কিন্তু আলী (রা) বলেছেন “আমি রাসুলুল্লাহকে (সা) মোজার উপর মাসেহ করতে দেখেছি, তলা নয়।”

আলী (রা) আমাদের যা বুঝিয়ে দিলেন তা আমাদের মনে রাখতে হবে। ধর্মের মধ্যে যুক্তি বুদ্ধি অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু যেখানে নবীজী কিছু বলেছেন তা আমরা যুক্তি দিয়ে সমালোচনা করিনা, আমরা তার কথা শুরুতেই মেনে নিই। তিনি মোজার উপর মাসেহ করতেন, আমরাও তা করি। কেউ বলতে পারেনা এ কাজটা যুক্তিযুক্ত হয়নি। আমাদের আসমানী ওহীকে যুক্তির উপর প্রাধান্য দিতে হবে। আমরা যুক্তিকে বাতিল করে দিচ্ছিনা কিন’ কোন কিছু না বুঝলেও আমরা ওহীর কথাই মেনে নিব।

আমরা বর্তমানকালের জাহেলিয়াত বা অজ্ঞতার কারণস্বরূপ যেসব সমস্যার কথা আলোচনা করলাম তা হচ্ছে —

  • ১. ঐতিহ্যবাদ : এই মতবাদ থেকে বেদ’আত জন্ম নিয়েছে যা আমাদের শিরকের দিকে ধাবিত করছে। সুফি মতবাদ সৃষ্টি করছে দুর্নীতি। ঐতিহ্যবাদের তৃতীয় রূপ হচ্ছে মাযহাব যা কুরআন্তসুন্নাহর থেকে মানুষকে দূরে ঠেলে দিয়েছে এবং জন্ম দিয়েছে অনাকাঙ্খিত দ্বন্দ্বের।
  • ২.যুক্তিবাদ: যুক্তিবাদীদের অবদান আধুনিকতা, চরমপন্থা ও ধর্মনিরপেক্ষতা।

সমাধান:

এই সব সমস্যার সমাধানও আমাদের জানা দরকার। সমস্যা আসলে খুব সহজ, মানুষ আজ ওহী দ্বারা পরিচালিত নয়; সমাধানও সহজ, মানুষকে ওহীর আলোকে পরিচালিত করতে হবে অর্থাৎ আমাদের ইসলামী শিক্ষার দিকে মন দিতে হবে। বর্তমানের মুসলিমদের এই অবস্থা পরিবর্তন করা সম্ভব নয় যতক্ষণ না মুসলিমদের সঠিকভাবে ইসলমী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা হচ্ছে। একজন খলীফা হলেই সব কিছু পাল্টে যাবেনা – যেমনটি অনেকে দাবী করে থাকে। কোন নেতাকে উৎখাত করে একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক বসাতে পারলেই সব পরিবর্তন হয়ে যাবে তা নয়। ত্রিনিদাদে এরকম চেষ্টা করা হয়েছিল, ইয়াসিন ও তার ভাইয়েরা কুদেতার মাধ্যমে বিপ্লব ঘটাতে চেয়েছিল। অধিকাংশ লোকই যদি ইসলাম সম্পর্কে পুরোপুরি অজ্ঞ থাকে, ইসলামের নামে মিসলাম বা অন্যকিছু পালন করে তবে তারা ক্ষমতায় এসে জোর করে কিছু চাপাতে পারতো? এজন্য নবীদের কর্মপন্থা ছিল আগে ভিত্তি তৈরি করা, যথেষ্ট পরিমাণ লোককে ইসলাম সম্পর্কে শিক্ষিত করে তোলা; এর পর তারাই নেতৃত্ব ঠিক করে নেবে। যেমনটি একটি হাদীসের ভাবার্থ হচ্ছে, নেতা তেমনই হবে যেমনটা তার অনুসারীরা। সর্বোপরি জনসাধারণই নেতা নির্বাচন করে। কিন্তু তারা যদি অজ্ঞ হয় তবে তাদের নেতাও হবে অজ্ঞ। এভাবে অজ্ঞতারই জয় হয়। তারা যদি সচেতন হয়ে উঠে তবে তারা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী নেতা দাবী করবে। তাই সঠিক পদ্ধতি হচ্ছে নিচের থেকে উপরে উঠা, উপর থেকে নিচের দিকে নামা নয়।

বাস্তবিক প্রেক্ষাপটে আমাদের সারা মুসলিম জাহানে মুসলিম স্কুল গড়ে তুলতে হবে। সেসব স্কুলে ইসলামী শিক্ষা ও বর্তমানে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাকে একত্র করতে হবে। মূলত এই দুই শিক্ষা একই জিনিস, আমরা একে পৃথক করে দেখি। আমরা যে স্কুলে গণিত, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, জীববিদ্যা পড়াই সেখানে এক পিরিয়ড রাখি ইসলামী শিক্ষা বা কুরআনের জন্য। কিন্তু এটা কোন সমাধান হতে পারেনা। এই পদ্ধতি অবলম্বন করলে ছাত্রদের মধ্যে এক মানসিক রোগ সৃষ্টি হয়, তারা ভাবে ধর্ম ও জীবন আলাদা তাই প্রাত্যহিক জীবনে আমাদের গতানুগতিক শিক্ষার দরকার, ধর্মের সেখানে প্রবেশাধিকার নেই!

আমরা যখন বিজ্ঞান,ইংরেজি,গণিত পড়াবো তখন মুসলিমদের দিয়ে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে পড়াতে হবে। গণিতকে আবার ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে পড়ানো যায় নাকি? বেশ, এটা বাচ্চাদের বুঝতে দিন যে গণিতের বিকাশে মুসলিমদের বড় ও মৌলিক অবদান রয়েছে। কোন মুসলিম পন্ডিতের নাম আসলে আপনারা তাদের জানান, মুসলিমরাই এসব আবিস্কার করেছে, ধর্ম ও জ্ঞান পৃথক নয়। কুরআন ও হাদীসে অনেক গাণিতিক বিষয় আছে, এগুলোও পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এভাবে ছাত্রছাত্রীরা ধর্ম ও শিক্ষার সম্পর্ক বুঝতে পারবে।

প্রতিটা বিষয়ে কিভাবে ধর্মের সাথে সম্পর্কযুক্ত করা যায়? এই ক্ষেত্রটিতে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরী। বিশ্বাস করুন কাজটি অসম্ভব নয়। অতীতের মুসলিম বিজ্ঞানীরা আলোকবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, এলজ্যাবরা, পদার্থবিদ্যাতেই শুধু পারদর্শী ছিলেননা তারা হাদীসশাস্ত্র, ফিকহবিদ্যাতেও দক্ষ ছিলেন। যা কিছু সত্য তা আল্লাহর কাছ থেকেই আগত। আমাদের নতুন শিক্ষানীতি দরকার যার লক্ষ্য হবে এমন মুসলিম স্নাতক তৈরী করা যারা মুসলিম সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে। তারা নিজেদের বন্ধনমুক্ত মনে করবেনা, যা খুশি তাই করবেনা। তারা চিন্তা করবে আল্লাহর দয়ায় এবং মুসলিম ভাইদের জন্য আমি আজ এ পর্যায়ে পৌঁছাতে পেরেছি। মুসলিম সমাজ আমার জন্য যে আত্মত্যাগ স্বীকার করেছে তার জন্য আমি ঋণী, আমি যা শিখেছি তা আমার তাদের উপকারে লাগানো উচিত। আমি মুসলিমদের মঙ্গলের জন্য সেবা করবো এবং নিজের কিছু সময় গরিবদের বিনামূল্যে সেবার জন্য (ডাক্তার, উকিল ইত্যাদি পেশায়) দিব। আমার পেশাই আমার সদকা। এভাবেই আমরা ভবিষ্যতকে পরিবর্তন করতে পারি।

আনুষঙ্গিক বিষয়সমূহ

Advertisements

One comment on “বিংশ শতকের জাহেলিয়াত – ডঃ আবু আমিনাহ্ বিলাল ফিলিপস্-২

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s