গ্যালারি

সংঘাত অথবা সংঘাত নয়? পর্ব – ২

পর্ব ১ : ইসলাম : একটি ধারণা !

শেখ আবদুর রহিম গ্রীন

ইসলাম ও পশ্চিমা বিশ্ব কি বিরোধিতার সম্মুখীন?

জনাব হান্টিংটনেরThe clash of the Civilizations‘ দাবী করছে “হ্যাঁ”, কিন্তু  জরিপে এ বিষয়ে কোন “দৃঢ় প্রত্যয়” ব্যক্ত করা হয়নি। এটা সত্যি যে কনফুসিয়হিন্দু সভ্যতার চাইতে মুসলিম ও পশ্চিমা বিশ্ব পরস্পরের কাছাকাছি, কিন্তু বাস্তবে জনাব হান্টিংটন ও জনাব বিডহ্যামের তুলনামূলক আলোচনা এ বিষয়ের সত্যতার উপর আলোকপাত করার ব্যাপারে অপ্রতুল। যা জনাব বিডহ্যাম স্বীকার করেছেন তা হলো যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যগুলি (পশ্চিমাদের অবিশ্বাস যে কুরআন আল্লাহর বাণী ও মুসলিমদের অবিশ্বাস যে যীশু আল্লাহর পুত্র) হচ্ছে মীমাংসার অযোগ্য, অন্ততঃ মুসলিমদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে…

“তারা বলে, ‘আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন’ তোমরা তো এক অদ্ভুত কথা সৃষ্টি করেছ। (যার জন্য) হয়তো আকাশমণ্ডলী বিদীর্ণ হয়ে যাবে, পৃথিবী বিদীর্ণ হবে ও পর্বতমণ্ডলী চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। তারা দয়াময়ের প্রতি সন্তান আরোপ করত। সন্তান গ্রহণ করা দয়াময়ের জন্য শোভন নয়! আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের কাছে দাসরূপে উপস্থিত  হবে না” (সূরা মারিয়াম ১৯:৮৮-৯৩)

ইসলাম সে সমস্ত খৃষ্টানকে “একেশ্বরবাদী” বলে স্বীকার করে না যারা দাবী করে যে যীশু আল্লাহ বা আল্লাহর পুত্র, সেসব হিন্দুদের মত যারা দাবী করে যে কৃষ্ণ “ভগবানের অবতার/ভগবানের প্রকাশ” বা বৌদ্ধদের মত যারা বলে বুদ্ধই ভগবান। এগুলি সবই কুফর এবং বহুঈশ্বরবাদ। এটাই দ্বন্দ্বের ভিত্তি। এই দ্বন্দ্ব শুধু বৈধই নয়, বরং কুরআনে এর হুকুম করা হয়েছে:

“যাদের প্রতি কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে তাদের মধ্যে যারা আল্লাহতে বিশ্বাস করে না ও পরকালেও নয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা নিষিদ্ধ করেছেন তা নিষিদ্ধ করে না এবং সত্য ধর্ম অনুসরণ করে না, তাদের সাথে যুদ্ধ করবে যে পর্যন্ত না তারা নত হয়ে আনুগত্যের নিদর্শন স্বরূপ স্বেচ্ছায় জিজিয়া দেয়।” (সূরা আত-তাওবা, ৯:২৯)

এটা সভ্যতার বিপরীতমুখী অবস্থান নয় বা সংস্কৃতির সংঘাতও নয়। ইসলাম কখনো অতীত শত্রুতার বশে আহত গর্ব পুনরুদ্ধারের ইচ্ছা থেকে বা সম্পদ ও ভূমি স্তূপীকৃত করে রাখার ইচ্ছা থেকে পশ্চিমা বিশ্ব বা অন্য কারো বিরোধিতা করে না। শুধুমাত্র একটি উদ্দেশ্যেই এই সংগ্রাম, সেটা হচ্ছে দ্বীন ইসলামকে সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত করা, যেমন নবী (সঃ) তাঁর কাছে আগত এক লোকের প্রশ্নের জবাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন:

“আমাদের কেউ গণীমতের লোভে, কেউ তার গোত্রের জন্য, কেউ বা সাহসী হিসাবে গণ্য হওয়ার জন্য যুদ্ধ করে, কার যুদ্ধকে জিহাদ বলা হবে?” নবী (সঃ) উত্তর দিলেন: “কারো না। শুধুমাত্র যে আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত রাখার জন্য যুদ্ধ করবে, সেই জিহাদ করেছে।”

যে কোন বিশ্বাসী, যে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহর সাথে পরিচিত, সেই জানে যে জিহাদ (সাধ্যানুসারে চেষ্টা করা) ঈমানের অপরিহার্য অঙ্গ, এবং ইসলামের কর্তব্যসমূহের অন্যতম। নবী (সঃ) বলেছেন, তারিক বিন শিহাব এর বর্ণনানুযায়ী:

“তোমাদের মধ্যে যে কেউ কোন অন্যায় দেখবে, সে তার হাত দিয়ে তা বাধা দেবে ; যদি সে তা না পারে, তবে মুখে তার প্রতিবাদ করবে ; এবং যদি সে তাও না পারে, তবে অন্ততঃ মনে মনে ঘৃণা করবে, এবং এটাই হচ্ছে ঈমানের দুর্বলতম স্তর” (সহীহ মুসলিম, ৭৯ নং হাদীস)।

জিহাদের তিনটি বৈশিষ্ট্য আছে। প্রথমটি হচ্ছে অন্তরের জিহাদ বা নফসের জিহাদ। এটা হচ্ছে সঠিক ধর্মবিশ্বাস অর্জনের জন্য আভ্যন্তরীণ সংগ্রাম, এবং এই ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কিত সকল ভুল ধারণা ও সন্দেহ থেকে নিজের আত্মাকে মুক্ত করা এবং বিশ্বাসীর উপর আদেশ ও নিষেধ আরোপ করা। এটা আত্মাকে সহজাত কামনা-বাসনা থেকে পরিশুদ্ধ করা এবং মহৎ গুণাবলী অর্জন করাকেও অন্তর্ভুক্ত করে। দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে মুখের ভাষা দিয়ে জিহাদ। এটা হচ্ছে মন্দ, অসৎকর্ম এবং ভুল বিশ্বাসের বিরুদ্ধে প্রচারের মাধ্যমে এবং বই লেখা ইত্যাদির মাধ্যমে সংগ্রাম করা। এই ধরনের জিহাদ মুসলিমদের মধ্যে যারা বিপথগামী তাদের বিরুদ্ধে করা হলেও অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধেও এর পরিধি বাড়ানো যায়। জিহাদের চূড়ান্ত স্তর হচ্ছে হাতের দ্বারা জিহাদ, বা তলোয়ার, যেখানে জীবন ও সম্পদ কুরবানী করা হয়। এই ধরনের জিহাদ বিশেষভাবে অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে করা হলেও মুসলিম শাসকের অধীনে বিপথগামী সমপ্রদায়ের বিরুদ্ধেও করা যায়। এই হাতের দ্বারা জিহাদ, যা সাধারণত “ধর্মযুদ্ধ” নামে অভিহিত হয়ে থাকে, তিনটি বিভাগে ভাগ করা যায়। এর প্রথমটা হচ্ছে এর নিষিদ্ধতা, যেমন মুহাম্মাদের নবুওয়াতের প্রথম দিকে ছিল। যদি মুসলিমরা দুর্বল হয় এবং যুদ্ধের মাধ্যমে ক্ষতি ছাড়া কোন লাভ অর্জিত না হয়, তাহলে এ থেকে বিরত থাকা উচিত। অমুসলিম ভূমিতে বসবাসকারীদের ক্ষেত্রে এটা বলা যায়। দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে আত্মরক্ষার স্তর, বা যুদ্ধকে সীমাবদ্ধ রাখা তাদের প্রতি

“যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে” (সূরা আল-বাকারা, ২:১৯০)

এবং মুসলিম ভূমিকে শত্রুদের হাত থেকে পুনরুদ্ধার করা। এটা হচ্ছে বর্তমান যুগের মুসলিমদের অবস্থা। চূড়ান্ত স্তর হচ্ছে অবিশ্বাসীদের ভূমিতে আল্লাহর শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য যুদ্ধ করা, নবীর সাহাবাগণ এবং পরবর্তী মুসলিম শাসকরা যা করেছিলেন।

“তোমাদের কি হয়েছে যে তোমরা আল্লাহর পথে এবং অসহায় নরনারী ও শিশুদের জন্য সংগ্রাম করবে না? যারা বলছে, ‘হে আমাদের রব! এ অত্যাচারী শাসকের দেশ থেকে আমাদের অন্যত্র নিয়ে যাও, এবং তোমার নিকট থেকে কাউকে আমাদের অভিভাবক কর এবং তোমার নিকট থেকে কাউকে আমাদের সহায় কর।” (সূরা আন নিসা, ৪:৭৬)

এভাবে নবী (সঃ) এঁর একজন সাহাবা, রাবিআ ইবনে আমের বিখ্যাত পারস্য সেনাপতি রুস্তমের অনুরোধে তাঁর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন এবং সেনাপতি তাঁকে উট, নারী উপঢৌকন দিয়ে মরুভূমিতে ফিরে যেতে অনুরোধ করেন। রাবিআ প্রত্যাখান করলেন, রুস্তম জানতে চাইলেন তাহলে কেন তাঁরা যুদ্ধ করছিলেন। রাবিআ উত্তর দিলেন: “আমরা এসেছি মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোতে মুক্তি দিতে। মিথ্যা উপাস্য বাদ দিয়ে মানুষকে আল্লাহর ইবাদতে নিয়োজিত করতে, এই দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে এই পৃথিবী এবং এর পরবর্তী জীবনের উদার ব্যাপ্তিতে এবং মানুষের তৈরি ধর্মের অবিচার থেকে ইসলামের ন্যায়বিচারের ছায়াতলে নিয়ে যেতে।”

সুতরাং এই জিহাদ হচ্ছে লক্ষ্য অর্জনের চূড়ান্ত পর্যায় এবং এর বাস্তবায়ন হচ্ছে আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন, এবং একে পরিত্যাগ করাই হচ্ছে মুসলিমদের লাঞ্ছনা ও পরাজয়ের মূল কারণ। যেমন আল্লাহ বলেছেন:

“যদি তোমরা অভিযানে বের না হও তবে তিনি তোমাদের মর্মন্তুদ শাস্তি দেবেন এবং অপর জাতিকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন। আল্লাহ সর্বশক্তিমান।” (সূরা আত তাওবা, ৯:৩৯)

এবং নবী (সঃ) এঁর হাদীস:

“যদি তোমরা আল-আইনিয়াতে (গার্হস্থ্য জীবনে তৃপ্ত ও সুখী থাকা) মগ্ন থাক এবং গরুর লেজের পিছনে ব্যস্ত হয়ে যাও এবং জিহাদ পরিত্যাগ কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদের শত্রুদের হাতে তোমাদের লাঞ্ছিত করবেন এবং সেই লাঞ্ছনা সরিয়ে নেবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা তোমাদের দ্বীনে প্রত্যাবর্তন কর।”

আমরা আজকাল তাই এমন সব মুসলিম দেখতে পাই যারা এমনভাবে জীবন যাপন করে যে মনেই হয় না তাদের কোন নবী আছে বা কোন ঐশী বাণী বা অহীতে বিশ্বাস আছে, বা কোন হিসাব নিকাশের আশা আছে বা আখিরাতের কোন ভয় আছে। তারা সেসব ইসলামপূর্ব জাতিসমূহের সদৃশ, যাদের বিরুদ্ধে অতীতে তারা যুদ্ধ করেছিল। তারা তাই ইসলাম থেকে ধর্মত্যাগীদের মত নিজেদের গোড়ালীর উপর ঘুরে গেছে এবং তারা সভ্যতায়, সামাজিক ব্যাপারে, রাজনৈতিক পদ্ধতিতে, তাদের চরিত্রে এবং জীবনের আনন্দ গ্রহণে অজ্ঞ জাতিসমূহের অনুকরণ করছে। তাই আল্লাহ তাদের ঘৃণা করেছেন এবং ভুলে গেছেন, যেমন তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তাঁর কিতাবে স্পষ্টভাবে ও তাঁর রাসূলের (সঃ) বাণীর মাধ্যমে:

“শীঘ্রই জাতিসমূহ তোমাদের কাছ থেকে তাদের প্রাপ্য বুঝে নিতে সমবেত হবে যেভাবে তোমরা ভোজের সময় সকলকে তাদের খাদ্যের ভাগ নিতে আমন্ত্রণ জানাও!” এক ব্যক্তি নবী (সঃ) কে জিজ্ঞাসা করলো: “এটা কি আমরা সংখ্যায় অল্প বলে?” নবী (সঃ) উত্তর দিলেন: “না! তোমরা হবে বহু সংখ্যক, সাগরের ফেনার মত, কিন্তু তোমরা হবে বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়া আবর্জনার মত। এবং নিঃসন্দেহে আল্লাহ তোমাদের শত্রুদের বক্ষ থেকে তোমাদের ভীতি উঠিয়ে নেবেন এবং তোমাদের বক্ষ তিনি দুর্বল করে দেবেন।” এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল: “দুর্বলতা কি?” রাসূল (সঃ) উত্তর দিলেন: “এটা হচ্ছে জীবনকে ভালবাসা ও মৃত্যুকে ভয় করা।”

নবীর ভবিদ্ব্যবাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে, এবং যদি “ইসলামের পুনর্জাগরণ” কখনও হয়, তবে সেটা এজন্য যে চোখ ও কান বিশিষ্ট যে কেউ দেখতে পাবে কিভাবে মুসলিমরা লাঞ্ছিত হচ্ছে-তাদের ভূমিগুলি তাদের শত্রুর দখলে, সেসব আইন ও নিয়ম-কানুন দিয়ে পরিচালিত যার সাথে আল্লাহর অহীর কোন সম্পর্কই নেই। নবী (সঃ) নিজে চৌদ্দশত বছর আগে এই সমস্যার সমাধান দিয়ে গেছেন, “তোমাদের দ্বীনে প্রত্যাবর্তন কর”, যা আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন তা কর, যা তিনি নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাক, আখিরাতকে এ জীবনের উপর প্রাধান্য দাও। এবং মুসলিমদের আর একবার তাদের জান্তমাল দিয়ে সংগ্রাম করতে হবে মানুষের তৈরি জীবনবিধানের জুলুম থেকে নিজেদের ও অপরকে বের করে সর্বজ্ঞানী স্রষ্টার প্রবর্তিত ন্যায়বিচারের আওতায় আনার জন্য।

সুতরাং ইসলাম ও পশ্চিমা বিশ্বের দ্বন্দ্বের কারণ যা জরিপে ধারণা করা হয়েছে তা নয়, অর্থাৎ ভৌগোলিক পরিবেশ, অতীত শত্রুতা, সংস্কৃতির সংঘাত বা অন্যান্য কিছু ; অথবা ইসলামী পুনর্জাগরণ, আত্মপরিচয় অনুসন্ধান যাতে কোন ধরনের হীনমন্যতা জড়িত এসবও নয়। বিশ্বাসীদের কাছে এই দ্বন্দ্ব হচ্ছে মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের, জুলুমের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের, জাহান্নামের পথের বিরুদ্ধে জান্নাতের পথের, মানবীয় অজ্ঞতার ভ্রষ্ট নির্দেশনার বিরুদ্ধে আল্লাহর প্রদর্শিত পূর্ণাঙ্গ পথের। অধিকন্তু এসবই পরিষ্কার করে দিচ্ছে যে নিঃসন্দেহে এখানে “এমন একটি অনতিক্রম্য কারণ রয়েছে যেজন্য মুসলিমরা ও পশ্চিমারা কখনই পরস্পরের সাথে শান্তিতে বাস করতে পারবে না।” (পৃ. ৫, অ ২) জনাব ব্রিডহ্যামের জরিপ তার সমস্ত আশাবাদ নিয়েও একটা প্রায়ই পুনরাবৃত্ত ভুল করেছে। তিনি মুসলিমদের তাঁর নিজের মান অনুযায়ী বিচার করেছেন একথা ধরে নিয়ে যে তারাও পশ্চিমের মতই কোন না কোন সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়। সত্য এই যে ইসলাম তার অনুসারীদের যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যুকামনা করতে শেখায়, কারণ আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত পাওয়ার অন্যতম নিশ্চিত উপায় হচ্ছে জিহাদের ময়দানে মৃত্যুবরণ। খালিদ বিন ওয়ালিদ, যাঁকে নবী (সঃ) “আল্লাহর তরবারি” উপাধি দিয়েছিলেন, এবং যিনি সমস্ত ভাল মুসলিম শিশুর চোখে বীর হিসাবে আদর্শ, রোমানদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে লেখা চিঠির উত্তরে বলেছিলেন: “আমাদের সাথে এমন সব লোক রয়েছে যারা মৃত্যুকে ততখানি ভালবাসে যতখানি তোমরা মদকে ভালবাস।” রোনাল্ড রিগ্যান যথার্থ ভাবেই উল্লেখ করেছেন যে: “তোমরা কিভাবে সেই জাতিকে পরাজিত করার আশা কর যারা বিশ্বাস করে যে নিহত হলে তারা সুন্দরী কুমারী ও শরাবের নহরে পূর্ণ জান্নাতে যাবে?” বিশ্বাসী তার জীবনকালে ফলাফল দেখে যেতে পারবে কিনা সেটা অপ্রাসঙ্গিক, কারণ তাদের কর্তব্য হচ্ছে আল্লাহর ক্রোধ থেকে এ দুনিয়ায় ও আখিরাতে বেঁচে থাকার জন্য জিহাদ করে যাওয়া।

যতদিন পর্যন্ত রব ও সৃষ্টিকর্তার আনুগত্যের বিরুদ্ধে উদ্ধত বাধাদানকারীরা থাকবে, ততদিন এই দ্বন্দ্ব চলবে। এসব কিছু যদি আপোষহীন মনোভাব ও মৌলবাদী ভাবধারা মনে হয়, তবে তা এজন্য যে এটা তাই। ইসলাম মানেই চরম কিছুর সাথে বোঝাপড়া করা। এই দ্বন্দ্ব যে যুদ্ধের মত প্রাণ ও ধনসম্পদ বিনাশী হিংসাত্মক কিছু হবে, এমন কোন কথা নেই। হিংসাত্মক পথ পরিহার করে পরিবর্তন আনার জন্য কার্যকরী অন্য উপায় পাওয়া গেলে ইসলাম কখনোই সেটার জন্য জিদ ধরবে না। সুতরাং জরিপে ব্যক্ত আশাবাদের স্থান থাকলেও সমাধান রয়েছে তাদের নির্দেশিত দিকের বিপরীত দিকে! আল্লাহ তাঁর কিতাবে প্রতিজ্ঞা করেছেন যে মুসলিমরা যদি তাদের কৃত অঙ্গীকার পূরণ করতে এবং নির্বোধ কুফরীর বিরুদ্ধে সংগ্রামে ব্যর্থ হয়, তাহলে আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করবেন এবং

“এমন এক সমপ্রদায় আনবেন যাদের তিনি ভালবাসেন ও যারা তাঁকে ভালবাসবে, তারা হবে বিশ্বাসীদের প্রতি কোমল ও অবিশ্বাসীদের প্রতি কঠোর। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কোন নিন্দুকের নিন্দার ভয় করবে না।” (সূরা আল-মায়িদা, ৫:৫৪)

এবং আল্লাহ সত্য বলেন, তাঁর প্রতিজ্ঞা সত্য, এবং অতীতে এটা সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে, যখন মুসলিমরা তাদের দ্বীন ত্যাগ করে নিজেদের ভিতর যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে এবং দুনিয়াবী জীবনের শোভায় মুগ্ধ হয়েছে… তখন তাতারদের দুর্যোগ আপতিত হয়েছে তাদের উপর, রাজধানী বাগদাদ ও মুসলিম ভূমি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়েছে। তারপরও এই একই বিজয়ী জাতি থেকে আল্লাহ ইসলামের রক্ষাকারী ও তার পতাকাবাহী তৈরী করেছেন, তাদের পরে তুর্কীদেরকে, এবং যখন তারা স্বধর্মভ্রষ্ট হয়েছে, আল্লাহ ইউরোপীয়ানদের হাতে তাদের ধ্বংস করেছেন। বর্তমানে মুসলিমদের অবস্থান এটাই। এটা সম্পূর্ণ সম্ভব যে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে, এবং যারা ইসলামকে আগে ধ্বংস করতে চেয়েছিল, তাদের মাধ্যমেই আবার ইসলাম শক্তিমান হবে।

মুসলিম পণ্ডিত ও চিন্তাবিদদের মাঝে এটা একটা বিতর্কের বিষয়বস্তু ছিল যে আদৌ পশ্চিম ইসলাম গ্রহণ করবে কি না। এটা অসম্ভব মনে হয় যে পশ্চিমা বিশ্বে কোন রকম সামরিক বিজয় ঘটবে, অন্ততঃ অদূর ভবিষ্যতে, কিন্তু বিজয় সব সময় অস্ত্রের হাত ধরে আসে না। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া কখনো দখলদার মুসলিম সৈন্য দেখেনি। এসব ভূখণ্ডকে ইসলাম সম্পূর্ণ ভিন্ন অস্ত্র দিয়ে “জয়” করেছে। অস্ত্রটি হচ্ছে ইসলাম নিজেই। পশ্চিমা বিশ্ব ও পৃথিবীর অন্যান্য অংশে, যারা ইসলামকে তাদের দেশ পরিচালনায় প্রভাবিত করা থেকে বহুদূরে রাখতে চায়, “মৌলবাদের” উত্থান তাদের কাছে হুমকি বলে মনে হওয়ার সত্যিকার কারণ হচ্ছে প্রকৃত মুসলিম রাষ্ট্রের আকারে ইসলামের কার্যকারিতার প্রত্যক্ষ উদাহরণ দেখতে পাওয়া, দখলদার মুসলিম জঙ্গীদের সমাবেশ নয় এটা যে এই সম্ভাবনার জন্যও এই “মৌলবাদী” রাষ্ট্রসমূহ তাদের সম্পদ ব্যবহার করে বিশ্বকে জানাবে আসলে ইসলাম কি, যা তারা তাদের প্রচারিত মিথ্যা ও বিকৃতি দিয়ে এখন পর্যন্ত চেপে রেখেছে। তাহলে এই প্রকৃত ইসলামী রাষ্ট্র বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কতটুকু, এবং কিভাবে চৌদ্দশত বছর পূর্বের একটি ধর্মের অনুসারীরা এই বিংশ শতাব্দীতে এই সম্ভাবনাকে কাজে পরিণত করবে?

আনুষাঙ্গিক বিষয়সমূহ:

পর্ব ১ : ইসলাম : একটি ধারণা !

Advertisements

One comment on “সংঘাত অথবা সংঘাত নয়? পর্ব – ২

  1. পিংব্যাকঃ ইসলাম : একটি ধারণা ! | In Search of Inner Peace | ইসলামিক বাংলা ব্লগ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s