গ্যালারি

সাক্ষ্যপ্রমাণের গুরুত্ব

পর্ব ১: ইসলাম : একটি ধারণা !
পর্ব ২ : সংঘাত অথবা সংঘাত নয়?
পর্ব ৩ : মৌলবাদীদের অদ্ভুত ব্যাপার
পর্ব ৪ : এ সম্পর্কে কোন সন্দেহ নেই!

শেখ আবদুর রহিম গ্রীন

আল্লাহ কুরআনে সাধারণভাবে সমগ্র মানবজাতির প্রতি এবং বিশেষভাবে আরবদের প্রতি প্রতিদ্বন্দ্বিতার আহ্বান জানিয়েছেন:

“আমি আমার বান্দার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি তাতে তোমাদের কোন সন্দেহ থাকলে তোমরা তার অনুরূপ কোন সূরা আনয়ন কর, এবং যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের সকল সাক্ষীকে আহ্বান কর।” (সূরা আল-বাকারা, ২:২৩)

মুহাম্মাদ (সঃ) এঁর সময় আরব সভ্যতা উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না-কোন বিশাল রাস্তা অথবা সরকারী ভবন, বা বৈজ্ঞানিক অথবা চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান, কিছুই নয়। বাস্তবে তারা খুবই আদিম ও বর্বর জীবন যাপন করত। একটি বিষয়েই তারা উৎকর্ষ অর্জন করেছিল-তা তাদের ভাষা। তারা কবিতার অত্যন্ত ভক্ত ছিল, এবং নিজেদের কাব্যদক্ষতা নিয়ে গর্ব করত। তারা পরস্পরের প্রশংসা করত, সতর্ক করত, উপদেশ দিত-এবং তর্কবিতর্কও করত-কবিতার মাধ্যমে। শুধু কবিতার জন্যই সেখানে উহাজ নামক জায়গায় বাৎসরিক মেলা বসত-সবচেয়ে সুন্দর কবিতাগুলি কা’বার দরজায় ঝুলিয়ে দেওয়া হত। মুহাম্মাদের যুগে আরবরা তাদের ভাষাগত দক্ষতার শিখরে ছিল। বাস্তবে আরবীতে সবচেয়ে সুন্দর কবিতাগুলির একটি ছিল লাবিদ ইবনে রাবিআর, যার কবিতা, যখন উহাজে আবৃত্তি করা হয়েছিল, প্রশংসায় আরবরা তার সামনে মাথা নত করেছিল। এই লাবিদই যখন কুরআনের আয়াত শুনতে শুরু করল, সে ইসলাম গ্রহণ করল এবং কবিতা লেখা ছেড়ে দিল। যখন একবার তাকে কিছু কবিতা শোনাতে বলা হল, সে উত্তর দিল: “কি! কুরআনের পরেও?” আসলে বহু আরব শুধুমাত্র কুরআন শুনেই ইসলামে প্রবেশ করেছিল, কারণ তাদের জন্য সেটা কুরআনের ঐশী উৎপত্তির সিদ্ধান্তমূলক প্রমাণ ছিল। তারা জানত কোন মানুষের পক্ষে এমন আলঙ্কারিক কাব্য রচনা সম্ভব নয়। মানুষের কাছে কুরআনের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার আহ্বান অনুরূপ একটি কুরআন রচনা করা, এর অর্থ অনেকে যা ধারণা করে তা নয়, অর্থাৎ শেক্সপিয়ার, হোমার, শেলী বা কীটস যে অর্থে অদ্বিতীয় তা নয়। কুরআন তার গঠন শৈলীর দিক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আরবী কবিতা “বিহার” (ছন্দ গঠন পদ্ধতি) এর দিক দিয়ে ষোলটি ভাগে বিভক্ত, এবং এছাড়াও তাদের আছে গণকদের ভাষণ, গদ্য কবিতা এবং সাধারণ ভাষণ। কুরআনের গঠন এর কোন ভাগেই পড়ে না এবং এটাই কুরআনকে অননুকরণীয় করেছে, এবং মুশরিক/প্রতিমা পূজারী আরবদের একে প্রতিরোধের ব্যাপারে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় ফেলেছে। আলকামা বিন আবদুল মানাফ তা সুনিশ্চিতভাবে জানিয়েছেন যখন তিনি তাদের নেতাদের সম্বোধন করে বলেন: “ওহে কুরাইশ, তোমাদের উপর একটি নতুন দুর্যোগ আপতিত হয়েছে। যখন মুহাম্মাদ যুবক ছিলেন, তিনি ছিলেন তোমাদের মাঝে সবচেয়ে প্রিয়, ভাষণে সবচেয়ে সত্যবাদী এবং সর্বাধিক বিশ্বস্ত, তখন পর্যন্ত, যখন তোমরা তার চুলে রূপালী রেখা দেখতে পাও, তিনি তোমাদের কাছে তাঁর বাণী নিয়ে আসেন। তোমরা বলেছ তিনি একজন যাদুকর, কিন্তু তিনি তা নন, কারণ আমরা এমন বহু যাদুকর দেখেছি এবং তাদের মন্ত্র পড়া ও গিঁট দেওয়া দেখেছি। তোমরা বলেছ তিনি একজন গণক, কিন্তু আমরা এদের সাথে এবং এদের আচরণের সাথে পরিচিত, এবং আমরা তাদের ছন্দোবদ্ধ পদ্যও শুনেছি। তোমরা তাঁকে ভবিষ্যদ্বক্তা বলেছ, কিন্তু তিনি ভবিষ্যদ্বক্তাও নন, কারণ আমরা তাদের ছন্দোবদ্ধ কবিতাও জানি; এবং তোমরা তাঁকে কবি বলেছ, কিন্তু তিনি কবি নন, কারণ আমরা সব ধরনের কবিতা সম্পর্কেই জানি। তোমরা তাঁকে পাগল বলেছ, কিন্তু তিনি যাদুগ্রস্ত বা পাগল নন, কারণ আমরা যাদুগ্রস্তদের দেখেছি, এবং তাঁর মাঝে তাদের মত হাঁপানো ও ফিসফিস করা ও ঘোরের কোন লক্ষণ নেই। হে কুরাইশদের লোকসকল, তোমাদের নিজেদের কার্যাবলী নিয়ে চিনি-ত হও, কারণ আল্লাহর কসম, তোমাদের উপর গুরুতর বিপদ আপতিত হয়েছে।”

কুরাইশরা সিদ্ধান্ত নিল যে নবী (সঃ) এর বিরুদ্ধে একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য যে প্রচার তারা করতে পারে তা হলো যে তাঁর ভাষণ একজনকে তার বাবা, স্ত্রী, ভাই ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। অতএব হজ্জ্বের সময় আবু লাহাব মক্কার পথে পথে দাঁড়িয়ে থাকত এবং মানুষকে মুহাম্মাদের কথা শোনার ব্যাপারে সতর্ক করত। তুফাইল ইবনে আমর, দাওস গোত্র প্রধান এবং একজন বিশিষ্ট কবি, নিজে বলেছেন যে তাঁকে মক্কাবাসীরা সম্বোধন করে বলেছিল:
“ ‘হে তুফাইল, তুমি আমাদের শহরে এসেছ, এই লোকটি যে নবী বলে দাবী করছে, সে আমাদের কর্তৃত্বকে ধ্বংস করেছে এবং আমাদের সমপ্রদায়কে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করেছে। আমরা ভয় পাচ্ছি সে তোমার লোকদের মাঝে তোমাকে ও তোমার কর্তৃত্বকে খর্ব করতে সফল হবে, যেভাবে আমাদের মাঝে করেছে। এ লোকের সাথে কথা বলো না। কোন ভাবেই তার কি বলার আছে তা শুনবে না। তার বক্তব্য যাদুকরের মত, পিতা ও পুত্রে, ভাইয়ে ভাইয়ে এবং স্বামী-স্ত্রীতে বিভেদ সৃষ্টি করে।’ তারা আমাকে খুব অদ্ভুত নানা কাহিনী শোনাতে লাগল এবং তাঁর অবিশ্বাস্য কায়কারবারের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়ে আমাকে আতঙ্কিত করে তুললো। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে এই লোকের কাছে যাব না, বা তার সাথে কথা বলবো না বা তার কোন কথাও শুনবো না। পরদিন আমি কাবার চারিদিকে তাওয়াফের জন্য ইবাদাতের স্থানে গেলাম, যা আমরা হজ্জের সময় আমাদের মূর্তির সম্মানার্থে ইবাদাত হিসাবে করে থাকি। আমি আমার কানে তুলা গুঁজে রাখলাম এই ভয়ে যে মুহাম্মাদের কথার কিছু অংশ যদি আমি শুনে ফেলি! আমি ইবাদাতের স্থানে ঢুকতেই তাঁকে কাবার কাছে দাঁড়ানো দেখতে পেলাম। তিনি আমাদের চেয়ে ভিন্ন ধরনের প্রার্থনা করছিলেন। তার সম্পূর্ণ ইবাদাতই ছিল অন্যরকমের। দৃশ্যটি আমাকে মোহিত করল। তাঁর ইবাদাত আমার ভিতরে কম্পন সৃষ্টি করল। এবং আমি তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হলাম, আমার অনিচ্ছাসত্ত্বেও এগিয়ে গেলাম যতক্ষণ না আমি তাঁর নিকটবর্তী হলাম। আমার সতর্কতা সত্ত্বেও তাঁর কিছু কথা আমার কানে গেল আল্লাহর ইচ্ছায়, এবং আমি নিজেকে শুনিয়ে বললাম: ‘তুমি কি করছ তুফাইল? তুমি একজন সহজে উপলব্ধি করতে সক্ষম কবি। তুমি কবিতার ভাল মন্দ নির্ণয় করতে পার। লোকটি কি বলছে তা শুনতে কিসে তোমাকে বাধা দিচ্ছে? তার কাছ থেকে যদি ভাল কিছু শোন, তবে তা গ্রহণ কর, এবং যদি তা মন্দ কিছু হয়, বর্জন কর।’ যতক্ষণ পর্যন্ত না ঘরে যাবার জন্য নবী তৈরী হলেন, আমি সেখানে রইলাম। তিনি যখন ঘরে প্রবেশ করলেন, আমি তাঁকে অনুসরণ করে প্রবেশ করলাম এবং বললাম: ‘হে মুহাম্মাদ, আপনার লোকেরা আপনার সম্পর্কে আমাকে কিছু কথা বলেছে। আল্লাহর কসম, তারা আমাকে আপনার বাণী থেকে ভয় দেখিয়ে দূরে সরিয়ে রেখেছে যেজন্য আমি এমনকি আমার কান তুলা গুঁজে বন্ধ রেখেছি আপনার কথা না শোনার জন্য। এত কিছুর পরও আল্লাহ আমাকে এর কিছু অংশ শুনিয়েছেন এবং আমি একে উত্তম পেয়েছি। সুতরাং আমাকে আপনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরো কিছু বলুন।’ নবী (সঃ) বললেন এবং আমাকে সূরা ফালাক আবৃত্তি করে শুনালেন। আল্লাহর শপথ, এর আগে আমি কখনো এত সুন্দর ভাষা শুনিনি। না আমার কাছে এর চেয়ে মহৎ অথবা ন্যায় কোন উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে। তক্ষুণি, আমি তাঁর দিকে আমার হাত বাড়িয়ে দিয়ে আনুগত্যের শপথ নিলাম এবং সাক্ষ্য দিলাম যে আল্লাহ ছাড়া কেউ উপাসনার যোগ্য নেই এবং মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর রাসূল। এভাবে আমি ইসলামে প্রবেশ করি। এমনকি কুরাইশ নেতারাও কুরআন শুনায় বাধা দিতে সক্ষম ছিল না।”

ইবনে ইসহাকের সীরাতে (নবীর জীবনী) একটি ঘটনার উল্লেখ আছে যে আবু সুফিয়ান, আবু জেহেল এবং আল-আখনাস রাত্রিবেলা চুপিসারে তাদের ঘর থেকে বেরিয়ে নবী (সঃ) এঁর কুরআন পাঠ শুনত-ভোর পর্যন্ত যার যার স’ানে লুকিয়ে থেকে। ফেরার পথে তারা একে অপরকে দেখতে পেল এবং পরস্পরকে ভর্ৎসনা করল, একথা বলে: “পুনরায় এমন করো না, কারণ যদি কোন দুর্বলমনা নির্বোধ তোমাদের দেখে, তোমরা তাদের মনে সন্দেহের উদ্রেক করবে।” একাধারে তিন রাত্রি এ ঘটনা ঘটলো, যতক্ষণ না তারা একে অপরের কাছে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করলো আর এমন না করার জন্য। কুরাইশদের এক পরামর্শ সভায়, যেখানে মুহাম্মাদের প্রচার বন্ধ করার সম্ভাব্য উপায় নিয়ে আলাপ আলোচনা হচ্ছিল, উতবা ইবনে রাবিআ নামক কুরাইশ নেতা পরামর্শ দিল যে মুহাম্মাদের কাছে কিছু প্রস্তাব রাখা হোক এবং “সে যা চায় তাকে দেয়া হোক, যাতে সে আমাদের শান্তিতে থাকতে দেয়।” নেতারা রাজি হলো, উতবা গেল এবং মুহাম্মাদের (সঃ) কাছে বসলো, বলল: “হে ভাতিজা, তুমি আমাদের গোত্রসমূহের সবচেয়ে সম্মানিত গোত্রের একজন এবং পূর্বপুরুষের দিক থেকে সম্ভ্রান্ত স্থানের অধিকারী, তুমি তোমার লোকেদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে এসেছ, এভাবে তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করছো এবং তাদের রীতিনীতিকে হেয় করছো, এবং তুমি তাদের দেবদেবীদের ও তাদের ধর্মকে অপমান করছো, তাদের পূর্বপুরুষদের অবিশ্বাসী ঘোষণা করেছ, সুতরাং আমার কথা শোন, আমি কিছু প্রস্তাব রাখব এবং হয়তো তুমি সেগুলির কোনটিকে গ্রহণ করবে।” নবী (সঃ) শুনতে রাজী হলেন এবং সে বলল: “যদি তুমি যা চাও তা টাকা-পয়সা হয়, তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের প্রধান বানিয়ে দেব যাতে কেউ তোমার বাইরে কোন সিদ্ধান্ত নিতে না পারে, যদি তুমি সার্বভৌম ক্ষমতা চাও, আমরা তোমাকে রাজা বানিয়ে দেব এবং এই দুষ্ট জ্বিন, যেটা তোমার কাছে আসে, তুমি যাকে দেখ, সেটা থেকে যদি তুমি মুক্তি না পাও, আমরা তোমার জন্য একজন চিকিৎসক খুঁজে বের করব এবং আমাদের সর্বস্ব ব্যয় করেও তোমাকে সুস্থ করে তুলব, কারণ প্রায়ই কোন পরিচিত আত্মা কোন মানুষের উপর ভর করে থাকে যতক্ষণ না তাকে সারিয়ে তোলা হয়।” নবী (সঃ) ধৈর্য্য ধরে শুনলেন এবং তারপর বললেন: “এখন আমার কথা শুনুন।” নবী (সঃ) তখন সূরা ফুসসিলাত (৪১ নং সূরা) এর শুরু থেকে সেজদার আয়াত পর্যন্ত তিলাওয়াত করলেন, তারপর সিজদা করলেন, সারাক্ষণ উতবা মনোযোগ দিয়ে শুনছিল, তার হাতের উপর ভর দিয়ে বসে। নবী (সঃ) তারপর বললেন: “যা শোনার আপনি শুনেছেন, আবুল ওয়ালিদ, এখন বাকী আপনার উপর।” যখন উতবা তার সাথীদের কাছে ফিরে গেল তারা খেয়াল করলো যে তার মুখের ভাব সম্পূর্ণ বদলে গেছে এবং তারা জানতে চাইল কি হয়েছে। সে বললো যে সে এমন কিছু বাক্য শুনেছে যা সে কখনো শোনেনি, যা কবিতাও নয়, যাদুও নয়। “আমার উপদেশ নাও এবং আমি যা বলি তা কর। এই লোককে তার মত চলতে দাও; কারণ আল্লাহর শপথ, আমি যে বাণী শুনেছি তার উজ্জ্বলতা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়বে। যদি অন্য আরবরা তাকে হত্যা করে, তোমরা মুক্তি পেয়ে যাবে, যদি সে আরবদের উপর বিজয়ী হয়, তার ক্ষমতা হবে তোমাদের ক্ষমতা, তার শক্তি তোমাদের শক্তি, এবং তোমরা তার মাধ্যমে সমৃদ্ধি অর্জন করবে।” তারা বলল: “সে তোমাকে তার কথা দিয়ে জাদু করেছে।” যার উত্তরে সে বললো: “তোমরা আমার মতামত শুনেছ, এখন তোমাদের যা মনে হয় তাই কর।”

কুরআনের শক্তি এমনই যে উমর ইবনুল খাত্তাব, যিনি নবী (সঃ) কে হত্যার জন্য বের হয়েছিলেন, পথেই শুনলেন তাঁর বোন এবং বোনের স্বামী কুরআন তিলাওয়াত করছে। বিশটি আয়াত পাঠ করার পর তিনি মুহাম্মদ (সঃ) কাছে গিয়ে হত্যার পরিবর্তে ইসলাম গ্রহণ করলেন। অতএব একজন নিরক্ষর এবং অশিক্ষিত লোকের পক্ষে-যাঁর কাব্যজ্ঞান ছিল না, কিভাবে অতুলনীয় অলঙ্কার এবং বিশুদ্ধ বাগ্মিতা সম্পন্ন একটি বই লেখা সম্ভব যার ক্ষুদ্রতম অধ্যায়ের সমতুল্যও কবিতার বিভিন্ন প্রকরণ ও আরবী ভাষার সমস্ত বিশেষজ্ঞ ও পণ্ডিতরা মিলে তৈরী করতে সক্ষম হয়নি? কার্যত তারা নবী (সঃ) এর সাথে যুদ্ধই বেছে নিয়েছিলো। এভাবে তাদের অভিজাত সমপ্রদায় নিহত হলো, এবং তাদের ব্যবসা বাণিজ্য ও সম্মান ধূলায় লুণ্ঠিত হলো। কিভাবে তারা কুরআনের আয়াতের চেয়ে এটাই বেছে নিতে পারলো? এর কারণ তাই যেমন আত তাবারী তাঁর তাফসীরের ভূমিকায় লিখেছেন:

“এতে কোন সন্দেহ নেই যে সর্বোচ্চ এবং সবচেয়ে উজ্জ্বল মানের প্রাঞ্জলতা সেটাই যা নিজেকে সর্বাপেক্ষা বেশী স্বচ্ছতার সাথে প্রকাশ করে, বক্তার ইচ্ছা স্পষ্ট করে তোলে এবং শ্রোতার উপলব্ধি সহজতর করে। কিন্তু যখন তা এই মানের প্রাঞ্জলতার উর্ধ্বে উঠে যায় এবং মানুষের ক্ষমতার সীমাতিক্রম করে, যাতে আল্লাহর কোন বান্দাই এর সমতুল্য তৈরী করতে পারে না, তখন সেটা সর্বশক্তিমান, এক আল্লাহর রাসূলদের জন্য প্রমাণ ও নিদর্শন হয়ে দাঁড়ায়। তখন তা মৃতকে জীবিত করা এবং কুষ্ঠরোগীকে সুস’ করা ও অন্ধকে দৃষ্টিদান করার পরিপূরক, যেগুলি নিজেরা রাসূলদের জন্য নিদর্শন ছিল, কারণ সেগুলি চিকিৎসা ও ভেষজ বিজ্ঞানে সর্বোচ্চ অর্জনকে উৎকর্ষতায় ছাপিয়ে গিয়েছিল…” তাবারী আরো বলছেন: “…এটা স্পষ্ট যে কোন উপদেশই প্রাঞ্জল নয়, কোন জ্ঞান গভীর নয়, কোন ভাষণ বেশী ভাবগম্ভীর নয়, কোন প্রকাশভঙ্গি মহত্তর নয়, এই পরিষ্কার বক্তব্য এবং ভাষণের চেয়ে-যার সাহায্যে একজন মাত্র মানুষ একত্রে এক জাতির কাছে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আহ্বান জানিয়েছিলেন যারা ছিল বাগ্মিতা ও অলঙ্কারপূর্ণ উক্তিতে, কবিতা ও গদ্যে, গদ্য কবিতা ও ভবিষ্যদ্বাণীতে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ। তিনি তাদের খেয়ালখুশিকে মূর্খতায় নামিয়ে আনলেন এবং তাদের যুক্তির অসারতা প্রদর্শন করলেন। তিনি তাদের ধর্ম থেকে বিযুক্ত হলেন এবং অন্যান্যকে তাঁর অনুসরণ করতে বললেন, তাঁর উদ্দেশ্য গ্রহণ করতে, এর সত্যের সাক্ষ্য দিতে, এবং একথা দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত করতে যে তিনি তাদের কাছে তাদের রবের প্রেরিত বাণীবাহক। তিনি তাদেরকে জানতে দিলেন যে, তিনি যা বলেছেন তার সত্যতার দৃশ্যমানতা, তাঁর নবুওয়াতের সত্যতার প্রমাণ হলো বয়ান (স্পষ্ট বর্ণনা), হিকমাহ (জ্ঞান), ফুরকান (সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী), যা তিনি তাদের কাছে তাদের নিজেদের ভাষায় বর্ণনা করেছেন, এমন বর্ণনাভঙ্গির মাধ্যমে যা তাদের নিজেদের বর্ণনাভঙ্গির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। তারপর তিনি তাদের বলেছেন যে তারা তিনি যা এনেছেন তার কোন অংশের সমতুল্যও কিছু আনতে সক্ষম হবে না, এবং তাদের সেটা করার শক্তির অভাব রয়েছে। তারা সকলেই তাদের অক্ষমতা স্বীকার করেছে, স্বেচ্ছায় সত্যকে স্বীকৃতি দিয়েছে যা তিনি এনেছেন, এবং নিজেদের ত্রুটির সাক্ষ্য দিয়েছে…।”

আমরা যদি বিশ্লেষণাত্মকভাবে যে কারো নবুওয়াতের দাবী পরীক্ষা করে দেখি, তাহলে তিনটি সম্ভাবনা পাওয়া যাবে দাবী সম্পর্কিত। প্রথম সম্ভাবনা হচ্ছে যে দাবীদার একজন মিথ্যুক। দ্বিতীয় সম্ভাবনা হল যে সে সত্যিকারভাবে বিশ্বাস করে যে সে ওহী গ্রহণ করছে, কিন্তু আসলে সে কোন ধরনের ভ্রান্তিতে তে ভুগছে, এবং তৃতীয়টি হলো যে ব্যক্তিটি সত্যিই ওহী পেয়ে থাকেন এবং তিনি সত্য বলছেন। এ প্রসঙ্গে মুহাম্মাদ (সঃ) এর বিরুদ্ধে খৃষ্টান ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী প্রাচ্যবিদদের উত্থাপিত কিছু যুক্তি উল্লেখ করা কৌতূহল উদ্দীপক হবে, কারণ সামগ্রিকভাবে তারা তাঁর সপক্ষেই সিদ্ধান্তমূলক প্রমাণ উপস্থাপন করছে। কোন এক মতাবলম্বী দল যা বলছে তার সারাংশ এই যে মুহাম্মাদ একজন মিথ্যাবাদী এবং প্রতারক; তিনি বিভিন্ন ইহুদী রাবাই ও খৃষ্টান পাদরীদের কাছ থেকে শিক্ষালাভ করেছেন, এবং বিভিন্ন সময়ে হেরা গুহায় অবস্থানকালে কুরআন সংকলন করেছেন। কেউ এই সব অভিযোগকে একটু কম কঠোর করতে গিয়ে বলেছেন যে তিনি তাঁর জাতির সংস্কার সাধনের বিশ্বস্ত আকাঙ্খা দ্বারা চালিত হয়েছিলেন এবং এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ইসলাম উদ্ভাবন করেছিলেন। অন্যেরা তাঁকে অধিকতর জাগতিক লোভের জন্য অভিযুক্ত করে এবং এর প্রমাণ হিসাবে তাঁর বহু সংখ্যক স্ত্রীর উল্লেখ করে। দ্বিতীয় মতাবলম্বী দলটি এই মনোভাবকে একেবারেই প্রত্যাখ্যান করে, তারা সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে দেখতে পায় যে মুহাম্মাদের চরিত্র তাঁকে মিথ্যা ও প্রতারণার বহু ঊর্ধ্বে স্থাপন করে, এবং তাঁর জীবনযাত্রার বাস্তবতা ছিল আড়ম্বরহীনতা ও দারিদ্র্যের শীর্ষে। কোন রাবাই বা পাদ্রী তাঁর শিক্ষক ছিল এমন কোন জোরালো প্রমাণ না পাওয়াতে এবং তাঁর নিজ পরিবারে ও স্ত্রীদের কাছে তাঁর পূর্ণ গ্রহণযোগ্যতার কারণে-যাদের কাছে কোন দ্বৈত চরিত্র অবধারিতভাবে ধরা পড়ত, তারা দাবী করে যে তিনি তাঁর নবুওয়াতের দাবীর ব্যাপারে বিশ্বস্ত, এবং তিনি সত্যিই বিশ্বাস করেন যে তিনি একজন নবী যাঁর কাছে ওহী আসে। আবার, তারা মুহাম্মাদের সত্য নবী হওয়ার সম্ভাবনা গ্রহণ করতে না পেরে নানা ধরনের মনো-বিশ্লেষণমূলক ব্যাখ্যা দিতে চেষ্টা করে, যেমন কুরআন অবচেতন মনের কণ্ঠস্বর, বা মৃগী রোগীর মত মূর্চ্ছাধীন অবস্থায় থাকাকালীন ওহী আসে ইত্যাদি। মূল দাবী হচ্ছে যে মুহাম্মাদ বিভ্রান্ত। এ সমস্ত অভিযোগ আমরা এখানে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জবাব দেওয়ার চেষ্টা করব না। বিপরীত অবস্থানগুলির ভাসাভাসা পরীক্ষা করাই যথেষ্ট হবে। এটা এজন্যই মুহাম্মাদের পক্ষে সিদ্ধান্তমূলক প্রমাণ হবে যে একই সাথে তিনি হিসাবী মিথ্যাবাদী এবং বিভ্রান্ত হতে পারেন না। যে লোক আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে যে সে নবী, সে কখনো বসে চিন্তা ও পরিকল্পনা করে না যে সে পরদিন কি বলবে, কারণ সে বিশ্বাস করে যে আল্লাহ তা তাকে ওহীর মাধ্যমে জানাবেন। তবুও ইসলামের প্রতিপক্ষরা মুহাম্মাদের ঘটনার পেছনে উভয়টিকেই ব্যাখ্যা হিসাবে দাঁড় করায়। কুরআনের তথ্য ও ভাষাগত অননুকরণীয়তা ব্যাখ্যার জন্য তাঁকে একজন ধূর্ত ও হিসাবী প্রতারক হতে হয়, তথাপি তাঁকে তাঁর স্পষ্ট প্রতীয়মান বিশ্বস্ততা ব্যাখ্যার জন্য ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হতে হয়। এই দুই ধরনের তথ্যকে একত্রে সঙ্গতিপূর্ণ করতে গেলে তৃতীয় আর একটি সম্ভাবনাই একমাত্র পথ, তা হচ্ছে যে তিনি আসলেই তা, যা তিনি দাবী করেন্তআল্লাহর রাসূল।

কার্যত কুরাইশদের মুহাম্মাদ (সঃ) এর বিরুদ্ধে কোন বিশ্বাসযোগ্য যুক্তি খুঁজে পেতে অত্যন্ত বেগ পেতে হয়েছিল। তারা জানত যে মুহাম্মদ (সঃ) কুরআনের সদৃশ কিছু তৈরী করতে সক্ষম ছিলেন না, তা প্রাঞ্জলতার দিক থেকেই হোক বা এতে বিধৃত জ্ঞানের দিক থেকেই হোক। তারা তাঁর চরিত্র ও ব্যক্তিত্বের সাথে সুপরিচিত ছিল এবং তাঁকে তাদের মধ্যে সর্বোত্তম, সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও জনপ্রিয় হিসাবে স্বীকার করে নিয়েছিল। এমনকি আবু লাহাব, নবীর চরম শত্রু, বলেছিল: “আমরা তোমাকে মিথ্যাবাদী বলি না মুহাম্মাদ, আমরা শুধু তুমি যা এনেছ তাতে বিশ্বাস করি না।” বাস্তবে মুহাম্মাদকে গ্রহণ করতে আবু লাহাবের প্রত্যাখ্যানের পেছনে রয়েছে গোত্রীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা। যখন নবী (সঃ) তাঁর জাতিকে প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার জন্য নির্দেশ পেলেন, তিনি সাফা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে মক্কার সকল গোত্রকে আহ্বান করলেন, যতক্ষণ না তারা সবাই জড়ো হল বা কোন প্রতিনিধি পাঠাল। তিনি তাদের বললেন:

“হে আমার জাতি, আমি যদি বলি যে একদল ঘোড়সওয়ার তোমাদের আক্রমণ করার জন্য এই পাহাড়ের পিছনে রয়েছে, তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে?” তারা সকলে বলল: “নিশ্চয়ই, আমরা কেন তোমাকে বিশ্বাস করব না, আমরা তোমার কাছ থেকে কখনো সত্য ছাড়া আর কিছু শুনিনি।” তখন নবী (সঃ) বললেন: “আমি তোমাদেরকে তোমাদের রবের কাছ থেকে এক ভয়ঙ্কর লাঞ্ছনার জন্য সতর্ক করতে এসেছি।” সুতরাং মুহাম্মাদের জাতি তাঁর সততার সাক্ষ্য দিয়েছে, এবং এটা যে তারা তাঁর কাছ থেকে কখনো মিথ্যা শোনেনি। এবং যেমন বাইজান্টাইন রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস আবু সুফিয়ানকে নবী (সঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর বলেছিলেন: “যদি তিনি মানুষ সম্পর্কে মিথ্যা না বলে থাকেন, তবে তিনি আল্লাহর সম্পর্কে মিথ্যা বলবেন না!”

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s