গ্যালারি

একটি সুচিন্তিত অনুসন্ধান

পর্ব ১: ইসলাম : একটি ধারণা !
পর্ব ২ : সংঘাত অথবা সংঘাত নয়?
পর্ব ৩ : মৌলবাদীদের অদ্ভুত ব্যাপার
পর্ব ৪ : এ সম্পর্কে কোন সন্দেহ নেই!
পর্ব ৫ : সাক্ষ্যপ্রমাণের গুরুত্ব

শেখ আবদুর রহিম গ্রীন

অধিকিন্তু বাইজানটাইন রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস নবী (সঃ) এর অসংখ্য গুণাবলী চিনতে পেরেছিলেন যা তাঁকে নিঃসন্দেহে আল্লাহর নবী হিসাবে নির্দেশ করে, খৃষ্টানরা যার আগমনের প্রত্যাশা করেছিল-নীচের বর্ণনা থেকে যা বোঝা যায়:

“আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেছেন যে আবু সুফিয়ান ইবনে হারব আমাকে জানালেন যে, তিনি যখন কুরাইশদের এক কাফেলা নিয়ে গিয়েছিলেন, হিরাক্লিয়াস তার কাছে এক সংবাদবাহক পাঠালেন। তারা শাম দেশে (সিরিয়া, প্যালেস্টাইন, লেবানন, জর্ডান) ব্যবসা করছিলেন, এবং সেই সময়ে আল্লাহর রাসূলের সাথে আবু সুফিয়ান ও কুরাইশদের সন্ধি চুক্তি ছিল। অতএব আবু সুফিয়ান ও তার সঙ্গীরা ইলিয়াতে (জেরুসালেমে) গেলেন হিরাক্লিয়াসের সাথে দেখা করতে। হিরাক্লিয়াস তাকে দরবারে ডেকে পাঠালেন যেখানে সব উচ্চ পদমর্যাদার রাজপুরুষেরা ছিল। তিনি তার দোভাষীকে ডেকে পাঠালেন, যে হিরাক্লিয়াসের প্রশ্ন শুনে তাদেরকে শোনাল: “তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তির সবচেয়ে নিকটাত্মীয় কে যে নবী বলে দাবী করেছে?” আবু সুফিয়ান উত্তর দিলেন: “আমি তাঁর নিকটাত্মীয়।” হিরাক্লিয়াস আদেশ দিলেন: “একে আমার কাছে আন এবং তার সঙ্গীদের তার পিছনে দাঁড় করিয়ে দাও।” হিরাক্লিয়াস তার দোভাষীকে বললেন আবু সুফিয়ানের সঙ্গীদের বুঝিয়ে দিতে যে, তিনি ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে আমাকে কিছু প্রশ্ন করবেন, যদি আমি মিথ্যা বলি তাহলে সঙ্গীরা যেন তার প্রতিবাদ করে। আবু সুফিয়ান আরো যোগ করলেন: “আল্লাহর কসম, যদি আমি আমার সঙ্গীরা আমাকে মিথ্যাবাদী বলবে এই ভয় না করতাম, নবী সম্পর্কে আমি মিথ্যা বলতাম।” প্রথম যে প্রশ্ন তিনি তাঁর সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন তা ছিল: “তোমাদের মাঝে তাঁর বংশ মর্যাদা কিরূপ?” আমি উত্তর দিলাম, “তিনি আমাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান।” হিরাক্লিয়াস আরো জিজ্ঞাসা করলেন: “তোমাদের মধ্যে থেকে তাঁর পূর্বে আর কেউ কি নবুওয়াতের দাবী করেছে?” আমি উত্তর দিলাম: “না।” তিনি বললেন: “তার পূর্বপুরুষের কেউ কি রাজা ছিল?” আমি বললাম: “না।” হিরাক্লিয়াস জিজ্ঞাসা করলেন: “তাঁর অনুসরণকারীরা কি ধনী না দরিদ্র?” আমি উত্তর দিলাম: “দরিদ্ররাই তাঁর অনুসরণ করে।” তিনি বললেন: “তার অনুসারীদের সংখ্যা বাড়ছে না কমছে?” আমি উত্তর দিলাম: “তারা বাড়ছে।” তিনি তখন জিজ্ঞাসা করলেন: “তার ধর্ম গ্রহণকারীদের কেউ কি এই ধর্মে অখুশী এবং পরে পরিত্যাগ করেছে?” আমি উত্তরে বললাম: “না।” হিরাক্লিয়াস বললেন: “তোমরা কি তাঁর দাবীর পূর্বে তাঁকে কখনও মিথ্যার দায়ে অভিযুক্ত করেছো?” আমি বললাম: “না।” হিরাক্লিয়াস বললেন: “তিনি কি তাঁর প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেন?” আমি উত্তর দিলাম: “না। আমরা তাঁর সাথে চুক্তিবদ্ধ, তবে আমরা জানি না এ ব্যাপারে তিনি কি করবেন।” আমি তাঁর বিরুদ্ধে বলার কোন সুযোগ পাইনি তখন ছাড়া যখন হিরাক্লিয়াস জিজ্ঞাসা করলেন: “তোমরা কি তাঁর সাথে যুদ্ধ করেছ কখনো?” আমি উত্তর দিলাম, “হ্যাঁ।” তখন তিনি বললেন, “এই যুদ্ধের ফলাফল কি ছিল?” আমি বললাম, “কখনো তিনি জিতেছেন, কখনো আমরা।” হিরাক্লিয়াস বললেন, “তিনি তোমাদের কি করতে বলে থাকেন?” আমি বললাম, “তিনি আমাদের শুধুমাত্র এক আল্লাহর ইবাদাত করতে বলেন, তাঁর সাথে আর কাউকে ইবাদাতে শরীক করতে নিষেধ করেন, এবং আমাদের পূর্বপুরুষেরা যা বলেছেন তা সবই পরিত্যাগ করতে বলেন। তিনি আমাদের সালাত আদায় করতে বলেন, সত্য কথা বলতে, পবিত্র থাকতে ও আত্মীয়স্বজনের সাথে ভাল ব্যবহার করতে বলেন।” হিরাক্লিয়াস দোভাষীকে বললেন পরবর্তী বক্তব্য আমাকে জানিয়ে দিতে: “আমি তোমাকে তাঁর বংশমর্যাদা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি, তুমি বলেছ যে তিনি অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত বংশের সন্তান। আসলে প্রত্যেক নবীই নিজ জাতির সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকেই হয়ে থাকেন। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি তোমাদের মধ্যে আর কেউ এ দাবী করেছে কিনা, তোমার উত্তর ছিল না বোধক। যদি উত্তর হ্যাঁ বোধক হতো, আমি সন্দেহ করতাম যে এই লোকটি তার পূর্বের লোকের দাবীর অনুসরণ করছে। তারপর আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি যে তার পূর্বপুরুষেরা রাজা ছিল কিনা। তোমার উত্তর না বোধক ছিল ; এবং যদি তা হ্যাঁ বোধক হতো, আমি মনে করতাম সে তার রাজত্ব ফিরে পেতে চাইছে। আমি আরো জিজ্ঞাসা করেছি তার দাবীর পূর্বে কখনো সে মিথ্যাবাদী হিসাবে অভিযুক্ত হয়েছে কিনা। এবং তোমার উত্তর ছিল না বোধক। সুতরাং আমি অবাক হচ্ছি কিভাবে একটি লোক আল্লাহর সম্পর্কে মিথ্যা বলতে পারে যে কখনো মানুষের সম্পর্কে কোন মিথ্যা বলেনি। আমি তারপর তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি তাকে ধনীরা বা দরিদ্ররা, কারা অনুসরণ করে। তুমি বলেছে দরিদ্ররাই তাঁর অনুসারী, এবং আসলে নবীদের অনুসরণকারীরা দরিদ্র শ্রেণী থেকেই হয়ে থাকে। তারপর আমি জিজ্ঞাসা করেছি তাঁর অনুসারীরা সংখ্যায় বাড়ছে না কমছে, তুমি উত্তর দিয়েছ বাড়ছে, এবং সত্য হচ্ছে যে এটাই সত্য বিশ্বাসের লক্ষণ, যতক্ষণ না তা সবদিকে পরিপূর্ণ হবে। আমি আরো জিজ্ঞাসা করেছি এমন কেউ আছে কি না, যে তাঁর ধর্ম গ্রহণ করে অখুশী হয়ে তা পরিত্যাগ করেছে। তোমার উত্তর ছিল না বোধক, এবং আসলে এটাই সত্য বিশ্বাসেরই লক্ষণ, যখন তার আনন্দ অন্তরে প্রবেশ করে এবং তা সম্পূর্ণভাবে সত্তায় মিশে যায়। আমি জিজ্ঞাসা করেছি তিনি কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন কিনা, তুমি না বোধক উত্তর দিয়েছ এবং সত্যিই নবীরা কখনও বিশ্বাসঘাতকতা করেন না। তারপর আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি তিনি তোমাদের কি করতে বলেন। তুমি উত্তরে বলেছ যে তিনি তোমাদেরকে শুধুমাত্র এক আল্লাহর ইবাদাত করতে বলেন এবং তাঁর সাথে কোন কিছু শরীক করতে এবং মূর্তিপূজা করতে নিষেধ করেন এবং সালাত আদায় করতে, সত্য বলতে, অবৈধ উপায়ে ব্যভিচার না করতে বলেন। যদি তুমি যা বলেছ তা সত্যি হয়, তিনি খুব শীগগিরই আমার পায়ের নীচের এই ভূমি দখল করবেন এবং আমি কিতাব থেকে জানি যে তাঁর আসার সময় হয়েছে, তবে আমি জানি না যে তিনি তোমাদের মধ্য থেকে আসবেন, এবং আমি যদি নিশ্চিত হতে পারতাম যে আমি তাঁর কাছেই যাচ্ছি, তাহলে আমি এখনি তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য যেতাম এবং যদি আমি তাঁর সাথে থাকতাম, আমি নিশ্চয়ই তাঁর পা ধুয়ে দিতাম।”

হিরাক্লিয়াস তারপর দাহিয়া কর্তৃক আনীত বুরার গভর্নরের কাছে প্রদত্ত আল্লাহর রাসূলের চিঠিটি আনতে বললেন। চিঠির বিষয়বস্তু ছিল নিম্নরূপ:

“পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে। এই চিঠিটি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে বাইজানটাইনের শাসনকর্তা হিরাক্লিয়াসের প্রতি। তার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক যে সঠিক পথ অনুসরণ করে। তারপর আমি আপনাকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানাই, যদি আপনি মুসলিম হন আপনি নিরাপদ, এবং আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ প্রতিদান দেবেন, এবং যদি আপনি দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেন আপনি আপনার অধীনস্তদের পথভ্রষ্টতার পাপের ভাগী হবেন: “হে আহলে কিতাব! সে কথার উপরে আস, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই; আমরা আল্লাহ ছাড়া কারো উপাসনা করি না, কোন কিছুকেই তাঁর অংশী করি না এবং আমাদের কেউ আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাকেও প্রতিপালক রূপে গ্রহণ করে না। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে বল, ‘আমরা আত্মসমর্পণকারী, তোমরা সাক্ষী থাক।”

আবু সুফিয়ান তারপর যোগ করল, “যখন হিরাক্লিয়াস তার বক্তব্য শেষ করলেন এবং চিঠিটি পড়লেন, দরবারে বিরাট শোরগোল শুরু হলো। তাই আমাদেরকে দরবার থেকে বের করে নেওয়া হলো। আমি আমার সঙ্গীদেরকে বললাম যে আবি-কাবশার (নবীকে হেয় করার জন্য ব্যবহৃত ডাক নাম) ঘটনাটি এত লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে যে বাইজানটাইনের বাদশাও তার ভয়ে ভীত, তখন থেকে আমি নিশ্চিত হতে শুরু করলাম যে অদূর ভবিষ্যতে তিনি বিজয়ী হবেন যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম।” পরবর্তী বর্ণনাকারী যোগ করেছেন:

“ইবনে আন-নাতুর জেরুজালেমের গভর্নর ছিলেন এবং হিরাক্লিয়াস জেরুজালেম সফর করছিলেন, তিনি সকালে বিষণ্ন মনে জেগে উঠলেন। তাঁর কিছু পাদ্রী জিজ্ঞাসা করল তাঁর মন খারাপের কারণ কি? হিরাক্লিয়াস একজন ভবিষ্যদ্বক্তা ও জ্যোতিষী ছিলেন। তিনি বললেন, “এক রাত্রে আমি যখন তারাদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, আমি দেখলাম খাতনাকারীদের নেতা আবির্ভূত হয়েছেন। তারা কারা, যারা খাতনা করেন?” লোকেরা উত্তর দিল, “ইহুদীরা ছাড়া আর কেউ খাতনা করে না, সুতরাং আপনার ভয়ের কোন কারণ নেই। শুধু এই হুকুম দিয়ে দিন যে এই দেশে যত ইহুদী আছে সবাইকে হত্যা করা হোক।” এই আলোচনার সময় গাসসানের রাজার কাছ থেকে আল্লাহর রাসূলের খবর নিয়ে দূত এলো। সংবাদ শুনে তিনি লোকজনকে বললেন সংবাদবাহক খাতনা করা কিনা সন্ধান করতে। লোকজন অনুসন্ধান করে হিরাক্লিয়াসকে খবর দিল যে সে খাতনাকারী। হিরাক্লিয়াস তখন তাকে আরবদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। সংবাদবাহক বলল, “আরবরাও খাতনা করে থাকে।” এই কথা শুনে হিরাক্লিয়াস মন্তব্য করলেন যে আরবদের সার্বভৌমত্বের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। হিরাক্লিয়াস তারপর হোমস গেলেন এবং সেখানে থাকাকালীন তাঁর চিঠির উত্তরে তাঁর বন্ধুর কাছ থেকে তাঁর ধারণা সমর্থন করে এই মর্মে এক চিঠি পেলেন যে আরবে একজন আবির্ভূত হয়েছেন এবং তিনি সত্যিই নবী। তখন হিরাক্লিয়াস হোমসে অবস্থিত তাঁর প্রাসাদে বাইজানটাইনের সব প্রধানদের একত্রিত হওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। যখন তারা সমবেত হলো, তিনি প্রাসাদের সব দরজা বন্ধ করার হুকুম দিলেন। তারপর তিনি এসে বললেন: “হে বাইজানটাইনগণ, যদি সাফল্য তোমাদের আকাঙ্খা হয়ে থাকে এবং তোমরা সঠিক নির্দেশনা চাও এবং তোমাদের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে চাও তাহলে এই নবীর প্রতি আনুগত্যের শপথ নাও!” একথা শুনে লোকজন প্রাসাদের দরজার দিকে বন্য গাধার মত ছুটতে লাগলো, কিন্তু সব বন্ধ দেখতে পেলো। হিরাক্লিয়াস ইসলামের প্রতি তাদের ঘৃণা অনুভব করলেন এবং যখন তাদের ইসলাম গ্রহণের আর আশা রইল না, তিনি তাদেরকে পুনরায় একত্র করতে আদেশ দিলেন। বললেন: “আমি এই মাত্র যা বলেছি তা তোমাদের বিশ্বাসের দৃঢ়তা পরীক্ষা করার জন্য এবং আমি তা দেখেছি।” লোকেরা তার সামনে সিজদা করল এবং তাঁর উপর সন্তুষ্ট হলো, এবং এখানেই হিরাক্লিয়াসের কাহিনীর শেষ (তার বিশ্বাস সম্পর্কিত)।

আরেকটি অনুসন্ধানী মন

হিরাক্লিয়াসই একমাত্র শাসক নন যিনি মুহাম্মাদের নবুওয়াত চিনতে পেরেছিলেন। আবিসিনিয়ার শাসক, নেগাসও অনুরূপভাবে ইসলামের বাণী এবং কুরআনের ভাষার ঐশী উৎপত্তি বুঝতে পেরেছিলেন যখন তিনি মুশরিক কুরাইশদের অত্যাচার ও উৎপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা মুহাজির মুসলিমদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন। অসংখ্য খৃষ্টান ও ইহুদী বিদ্বান ব্যক্তি, যারা মুহাম্মাদকে তাদের কিতাবে উল্লেখিত শেষ নবী হিসাবে চিনতে পেরেছিলেন মুহাম্মাদের সময়ে এবং তার পরে, তাঁদের দ্বারা নবী (সঃ) এঁর দাবী আরো গুরুত্ব লাভ করেছিল। হিরাক্লিয়াসের কথা আগেই বলা হয়েছে। সাধু বহিরা, যাকে কিছু প্রাচ্যবিদ মুহাম্মাদের শিক্ষক হিসাবে চালানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা করেছেন, মুহাম্মাদের বালক অবস্থাতেই তাঁর মধ্যে নবুওয়াতের চিহ্ন দেখতে পেয়েছিলেন, যখন মুহাম্মাদ তাঁর চাচা আবু তালিবের কাফিলার সাথে সিরিয়া গিয়েছিলেন, যেমন ওয়ারাকা বুঝেছিলেন, যিনি মক্কার কতিপয় খৃষ্টানের একজন ছিলেন, যিনি খৃষ্টানদের কিতাবের কিছু অংশ আরবীতে অনুবাদ করেছিলেন। যিনি মুহাম্মাদের স্ত্রী খাদিজার চাচাত ভাই ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে প্রথম ওহী নাযিলের পর নবী এই একই ওয়ারাকার কাছে গিয়েছিলেন, যিনি বলেছিলেন, “নিশ্চয়ই, যাঁর হাতে ওয়ারাকার প্রাণ তাঁর শপথ, আপনি এই জাতির নবী। আপনার কাছে সেই মহান ফেরেশতাই এসেছেন, যিনি এসেছিলেন মূসার কাছে। আপনাকে মিথ্যাবাদী বলা হবে, তারা আপনার সাথে বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ করবে, আপনাকে বিতাড়িত করবে ও আপনার সাথে যুদ্ধ করবে।” আল জুরাদ ইবনে আকালা, এক খৃষ্টান জ্ঞানী ব্যক্তি ও শাসক নবী (সঃ) এর সাথে সাক্ষাতের জন্য এসেছিলেন ও বলেছিলেন: “আল্লাহর কসম, আপনি সত্য সহকারে এসেছেন, এবং সত্য কথাই বলেছেন, নবী হিসাবে ইনজিলে আমি আপনার বর্ণনা পেয়েছি, এবং কুমারী মাতার পুত্র আপনার আগমন ঘোষণা করেছেন।” আল জুরাদ তারপর তাঁর লোকজন সহ ইসলাম গ্রহণ করেন। এছাড়াও মুকাওকিস, কিবতীদের বাদশাহ, নবী (সঃ) এঁর তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে লেখা পত্রের উত্তরে লিখেছিলেন: “আমি আপনার বাণী পড়েছি এবং তাতে আপনি যা উল্লেখ করেছেন এবং যার প্রতি আহ্বান করেছেন তা বুঝতে পেরেছি। আমি জানতাম একজন নবী আসবেন এবং ভেবেছিলাম তিনি শাম দেশে আবির্ভূত হবেন, এবং আমি আপনার দূতের সাথে উত্তম আচরণ করেছি।”

নবী (সঃ) এঁর একজন সাহাবা, সালমান ফারসীর গল্প বিষয়টিকে আরো বিশদভাবে বর্ণনা করেছে এভাবে:

“আমি পারস্যের লোক, আমি এসেছি ইস্পাহানের জাঈ শহর থেকে। আমার পিতা নগরপ্রধান ছিলেন। তাঁর কাছে আমি আল্লাহর সৃষ্টির সবচেয়ে প্রিয় ছিলাম। আমার জন্য তাঁর ভালবাসা এতদূর ছিল যে আমাকে তিনি যে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করতেন, তার তদারকির ভার দিয়ে নিশ্চিন্ত বোধ করতেন, যা কখনো নিভতে দেওয়া হতো না। আমার পিতা ভূমি মালিক ছিলেন, এবং একদিন যখন তিনি ব্যস্ত ছিলেন, আমাকে তাঁর জমি দেখতে যেতে বললেন এবং সেখান থেকে তাঁর জন্য কিছু জিনিস আনতে বললেন। পথে আমি খৃষ্টানদের একটি গির্জা দেখতে পেলাম। আমি ভেতরের লোকজনের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম যারা তখন প্রার্থনা করছিল। আমার পিতা আমাকে গৃহে আবদ্ধ করে রাখতেন বলে অন্য মানুষের জীবনে কোথায় কি ঘটছে আমি তার কিছুই জানতাম না। সুতরাং যখন আমি এই লোকদের কাছে এলাম এবং তাদের আওয়াজ শুনলাম আমি ভিতরে ঢুকলাম তারা কি করছে জানতে। যখন আমি তাদের দেখলাম, তাদের প্রার্থনার পদ্ধতি আমার ভাল লাগল এবং আমি তাদের ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হলাম। আমি নিজেকে বললাম, “আল্লাহর শপথ, এই ধর্ম আমাদের ধর্মের চেয়ে ভাল।” আল্লাহর শপথ, সন্ধ্যা পর্যন্ত আমি তাদের ছেড়ে গেলাম না, এবং আমার পিতার জমি তদারকি করতে গেলাম না। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “এই ধর্মের উৎপত্তি কোথায়?” তারা বলল, “শাম দেশে (অর্থাৎ বৃহত্তর সিরিয়ায়)।” আমি পিতার কাছে ফিরে গেলাম যিনি আমার জন্য অসি’র হয়ে পড়েছিলেন এবং আমাকে খুঁজতে লোক পাঠিয়েছিলেন। আমি পৌঁছার পর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “বাবা, তুমি কোথায় ছিলে? আমি কি তোমার উপর একটা কাজের দায়িত্ব দিইনি?” আমি বললাম, “আমি কয়েকজন লোককে গির্জায় প্রার্থনা করতে দেখে তাদের কাছে গিয়েছিলাম এবং তারা তাদের ধর্মের যা কিছু করছিল আমার তা ভাল লেগেছে।” আমার পিতা বললেন, “বাবা! ঐ ধর্মে কোন ভাল কিছু নেই। তোমার পূর্বপুরুষের ধর্ম বেশী ভাল।” আমি বললাম, “না, আল্লাহর শপথ, ঐ ধর্ম আমাদের চেয়ে ভাল।” তিনি আমাকে ভয় দেখালেন এবং পায়ে শিকল দিয়ে ঘরে বেঁধে রাখলেন। আমি খৃষ্টানদের কাছে অনুরোধ করে সংবাদ পাঠালাম যে তারা যেন শাম থেকে কোন খৃষ্টান কাফেলা এলে আমাকে খবর দেয়। একটি বাণিজ্য কাফেলা আসতেই তারা আমাকে খবর দিল। আমি তাদের বললাম যে তারা যেন আমাকে কাফেলার লোকজন সম্পর্কে অবহিত করে এবং কখন তারা তাদের কাজকর্ম শেষ করে দেশে ফিরে যাবে তা জানায়। আমি আমার পায়ের শিকল খুলে কাফেলাতে যোগ দিলাম শাম পৌঁছা পর্যন্ত। পৌঁছে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “তোমাদের ধর্মের সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি কে?” তারা বলল, “গির্জার পাদ্রী।” আমি তাঁর কাছে গেলাম এবং বললাম, “আমি এই ধর্ম পছন্দ করি এবং আমি আপনার সাথে গির্জায় থেকে আপনার সেবা করতে চাই, আপনার কাছ থেকে শিখতে চাই ও আপনার সাথে প্রার্থনা করতে চাই।” পাদ্রী রাজী হলেন। কিছুদিন পরে আমি জানতে পারলাম যে এই পাদ্রী তার লোকজনকে দান করতে আদেশ করত এবং উৎসাহিত করত শুধু নিজে তা ভোগ করার জন্য। সে দরিদ্রকে তা দিত না। সে সাতটি পাত্র ভর্তি সোনা ও রূপা জমা করে রেখেছিল! আমি তাকে যা করতে দেখেছিলাম সেজন্য তাকে খুবই ঘৃণা করতাম। পাদ্রী মারা গেল। খৃষ্টানরা তাকে সমাহিত করার জন্য সমবেত হল। আমি তাদেরকে বললাম যে সে খারাপ লোক ছিল, সে তোমাদেরকে দান করতে বলত যাতে সে তা নিজে রাখতে পারে এবং দরিদ্রকে কিছুই দিত না। তারা বলল, “তুমি কিভাবে জানলে?” আমি বললাম, “আমি তোমাদেরকে তার ধনভাণ্ডার দেখাতে পারি।” তারা বলল, “দেখাও।” আমি তাদের জায়গাটি দেখালাম এবং যখন তারা সেটা দেখল তারা বলল: “আল্লাহর শপথ, আমরা তাকে কখনও সমাহিত করব না!” তারা তার মৃতদেহ নিয়ে সেটাকে ক্রুশবিদ্ধ করল এবং পাথর ছুঁড়ে মারল। তারা নতুন পাদ্রী নিয়োগ করল। যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে না, তাদের মধ্যে এর চেয়ে ভাল লোক আমি দেখিনি। না এমন লোক দেখেছি যে এর চেয়ে বেশী দুনিয়াত্যাগী ও পরজীবনের প্রতি আসক্ত; না এমন দায়িত্বশীল লোক যে দিন রাত কাজ করছে। আমি তাকে ভালবাসতাম সবকিছুর চেয়ে বেশী। তার মৃত্যুর কিছু সময় পূর্বপর্যন্ত আমি তার সাথে অবস্থান করলাম। যখন তার মৃত্যু নিকটবর্তী হল, আমি তাকে বললাম: “হে গুরু! আমি আপনার সাথে থেকেছি এবং আপনাকে আমি আগে যা কিছু ভালবাসতাম তার চেয়েও বেশী ভালবেসেছি। এখন আল্লাহর হুকুমে আপনার সময় শেষ হয়ে এসেছে, এখন আপনি আমাকে কার কাছে যেতে বলেন এবং আমাকে কি করতে বলেন?” পাদ্রী বললেন, “আল্লাহ কসম, মানুষ সম্পূর্ণ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে, তারা যার উপর ছিল তাকে পরিবর্তন ও বদল করেছে। আমি যা এখনও ধরে রেখেছি, আল মুসিলের একজন লোক ছাড়া আর কেউ তা ধরে রেখেছে বলে আমি জানি না। সুতরাং তুমি তার কাছে যাও।” যখন মানুষটি মারা গেলেন, আমি আল-মুসিলে গেলাম ও সুপারিশকৃত মানুষটির সাথে দেখা করলাম। আমি তাকে বললাম যে আমার পূর্বতন গুরু তার কথা আমাকে বলেছেন যাতে আমি তার সাথে থাকি; এবং আরো বলেছেন যে তারা একই পথের অনুসারী। আল-মুসিলের লোকটি আমাকে তার সাথে থাকতে বললেন, আমি থাকলাম এবং দেখলাম যে তার বন্ধুর ধারণ করা বিশ্বাসের লোকদের মধ্যে তিনি উত্তম। শীগগিরই তিনি মারা গেলেন। মৃত্যুকালীন সময়ে আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম তিনি আমাকে এই ধর্মের অনুসারী কার কাছে যেতে সুপারিশ করেন। লোকটি বললেন, “আল্লাহর কসম! আমি আর কাউকে জানি না যে আমাদের এই ধর্মের উপর রয়েছে নাসীইবিন এর একজন লোক ছাড়া, তুমি তার কাছে যাও।” তার মৃত্যুর পর আমি নাসীইবিন এর সেই লোকের কাছে গেলাম ও তার কাছে কিছুদিন বাস করলাম। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো। মৃত্যু ঘনিয়ে এলো এবং মৃত্যুর পূর্বে আমি তার উপদেশ চাইলাম কার কাছে এবং কোথায় আমি যেতে পারি। লোকটি বললেন যে আমি আম্মুরিয়াতে একই ধর্মের একজন লোকের কাছে যেতে পারি, যা আমি করলাম, এবং কিছু গরু এবং ভেড়ার মালিক হলাম। আম্মুরিয়ার লোকটির মৃত্যু নিকটবর্তী হলে আমি আমার অনুরোধের পুনরাবৃত্তি করলাম। উত্তরটি ভিন্ন হলো। লোকটি বললেন: “হে বৎস! আমি আমাদের ধর্মের উপর রয়েছে এমন আর কাউকে জানি না। যাই হোক, একজন নবীর আবির্ভাব কাল তুমি দেখতে পাবে। এই নবী ইব্রাহিম এর ধর্মেই হবেন। তিনি আরব দেশ থেকে আসবেন এবং দুটি কালো পাথরের মধ্যবর্তী ভূখণ্ডে হিজরত করবেন। এই উপত্যকার মধ্যখানে খেজুর বৃক্ষ ছড়িয়ে থাকবে। তাঁর বিশেষ কয়েকটি চিহ্ন থাকবে। তিনি উপহার হিসাবে প্রদত্ত খাবার খাবেন, কিন্তু দান গ্রহণ করবেন না। তাঁর দুই কাঁধের মাঝখানে নবুওয়াতের মোহর অঙ্কিত থাকবে। যদি তোমার পক্ষে সেখানে যাওয়া সম্ভব হয়, তবে তাই কর।” তার মৃত্যুর পর আমি কিছুদিন আম্মুরিয়াতে অবস্থান করলাম, ততদিন পর্যন্ত যখন কালব গোত্রের একদল ব্যবসায়ী আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। আমি তাদের বললাম, “আমাকে আরবে নিয়ে চল এবং আমার গরু ও ভেড়াটি নিয়ে নাও।” তারা রাজী হলো। যখন আমরা ওয়াদিউল কুরা (মদীনার কাছে) পৌঁছলাম, তারা আমাকে একজন ইহুদীর কাছে দাস হিসাবে বিক্রি করে দিল এবং খেজুর গাছগুলি দেখে আমার আশা হল হয়তো এটাই আমার বন্ধুর বর্ণিত জায়গা হতে পারে। একদিন আমার মনিবের চাচাত ভাই তার সাথে দেখা করতে এলো এবং আমাকে কিনে নিল। সে আমাকে মদীনায় নিয়ে গেল। আল্লাহর শপথ! দেখা মাত্রই আমি চিনলাম যে এটাই আমার বন্ধুর বলা সেই জায়গা। তারপর আল্লাহ তাঁর রাসূল পাঠালেন। তিনি মক্কায় যতদিন থাকার থাকলেন। আমি তাঁর সম্পর্কে কিছুই শুনিনি কারণ আমি সারাক্ষণ গোলামীর কাজে ব্যস্ত থাকতাম। তিনি মদীনায় হিজরত করলেন। আমি খেজুর গাছের উপরে আমার মনিবের কাজে ব্যস্ত ছিলাম। তার একজন চাচাত ভাই এসে সামনে দাঁড়াল এবং বললো: “বনী কাইলার ধ্বংস হোক, তারা কুবাতে একজন লোকের চারিদিকে সমবেত হয়েছে যে আজ মক্কা থেকে পৌঁছেছে এই দাবী করে যে সে নবী।” শোনামাত্র আমি এমন কাঁপতে লাগলাম যে প্রায় আমার মনিবের ঘাড়ের উপর পড়ে যাচ্ছিলাম। আমি নেমে এসে জিজ্ঞাসা করলাম: “কি বললে, কি বললে?” আমার মনিব রেগে গিয়ে আমাকে প্রচণ্ড জোরে ঘুঁষি মারলো এবং বললো: “এতে তোমার কি হলো? তোমার কাজ কর গিয়ে।” আমি বললাম, “কিছু না, আমি শুধু সে কি বলছে তা জানতে চাইছিলাম।” সেই সন্ধ্যায় আমি কুবায় রাসূলুল্লাহকে দেখতে গেলাম। আমি সাথে করে আমার জমিয়ে রাখা কিছু খাবার নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি গিয়ে বললাম, “আমি শুনেছি আপনি সৎলোক এবং আপনার সঙ্গীরা অভাবগ্রস্ত, এবং আমি আপনাকে দান হিসাবে কিছু দিতে চাই। আমি দেখলাম যে অন্য কারো চেয়ে এটা আপনারই বেশী প্রয়োজন।” আমি তাঁকে তা দিলাম, তিনি তাঁর সাথীদের বললেন, “খাও!” এবং তিনি তাঁর হাত সরিয়ে রাখলেন তা থেকে। আমি মনে মনে বললাম, “একটা চিহ্ন মিলেছে।” পরবর্তীতে আমি যখন আবার মদীনাতে নবীর কাছে গেলাম আমি বললাম: “আমি দেখেছি আপনি দান গ্রহণ করেন না, এখানে আমি আপনার জন্য উপহার হিসাবে কিছু এনেছি।” নবী সেখান থেকে নিজে খেলেন ও সাহাবাদেরও খেতে বললেন, তাঁরাও খেলেন। আমি মনে মনে বললাম, “দুটি চিহ্ন মিলল।” তৃতীয় সাক্ষাতে আমি নবীর কোন সাহাবার জানাযায় গেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম, তারপর পেছনের দিকে চলে গেলাম যাতে নবুওয়াতের মোহর দেখতে পাই আমার বন্ধুর বর্ণনামত। যখন তিনি আমাকে দেখলেন তিনি বুঝতে পারলেন আমি কি দেখতে চাইছি। তিনি তাঁর চাদরটি পিঠ থেকে সরিয়ে দিলেন এবং আমি মোহরটি দেখলাম। আমি সেটি চিনতে পারলাম। আমি নীচু হয়ে সেখানে চুমা দিলাম ও কাঁদতে শুরু করলাম। রাসূল (সঃ) আমাকে ঘুরে সামনে এসে কথা বলতে বললেন, এবং আমি তাঁকে আমার কাহিনী বললাম।”

Advertisements

2 comments on “একটি সুচিন্তিত অনুসন্ধান

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s