গ্যালারি

ইসলামে ‘তাকওয়া’র স্বরূপ ও সমাজ জীবনে এর প্রভাব – ২

তাকওয়া ও মুত্তাকী শব্দের বিপরীতে পবিত্র কুরআনে যেসব শব্দের ব্যবহার রয়েছে সেগুলোর অর্থ ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করলেও তাকওয়ার স্বরূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাকওয়া শব্দের বিপরীতে ব্যবহৃত শব্দগুলো হলো:

(ক) কুফর: ‘কুফর’ অর্থ হচ্ছে আল্লাহর অস্তিত্বে অবিশ্বাস করা, তাঁকে স্বীকার না করা; কুরআন ও হাদীসের অকাট্য প্রমাণ দ্বারা যেসব বিষয় বিশ্বাস করা ও পালন করা ফরয-অবশ্য পালনীয়রূপে নির্ধারিত, এর যে কোন একটি বা সবগুলোকে অবিশ্বাস ও অস্বীকার করাকে কুফর বল হয়। আর অবিশ্বাসী ও অস্বীকারকারীদেরকে ‘কাফির’ বলা হয়। কাফির ও মুত্তাকী উভয়ের পরিণীত উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা বলেন, “কাফিরদেরকে জাহান্নামের দিকে দলে দলে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে…. এর বিপরীতে বলা হয়েছে ‘যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করত-তাকওয়া অবলম্বনে জীবন যাপন করত তাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হব।

(খ) ‘উদ্ওয়ান:” এর অর্থ হল সীমালঙ্ঘন, বাড়াবাড়ী , সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালংঘনে একে অন্যের সাহায্য করবে না। ”

(গ) ‘ফুজূর’ ও ‘ফুজ্জার’: অন্যায়, অনাচার, পাপাচার ও দুষ্কর্মকে ‘ফুজুর’ বলা হয় এবং এসব অন্যায়ে লিপ্ত ব্যক্তিকে ‘ফুজ্জার’ বলা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “অতপর তাকে (নফ্সকে) অসৎকর্ম (ফুজুর) ও সৎকর্মের (তাকওয়া) জ্ঞান দান করেছেন। ” “ আমি কি মুত্তাকীগণকে অপরাধীদের সমান গণ্য করব?”

(ঘ) বাখিল’: ‘বাখিলা’ শব্দটি বখীল থেকে ক্রিয়াবাচক শব্দ। এর অর্থ কৃপণ। আল্লাহর দেয়া সম্পদে ইসলাম নির্ধারিত মানুষের অধিকার তথা যাকাতসহ অন্যান্য প্রাপ্য যে ঠিকমত আদায় করে না, তাকে বখীল বা কৃপণ বলা হয়। যারা মুত্তাকী তারা যথাযথভাবে সম্পদ ব্যয় করে। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, “সুতরাং কেউ দান করলে, মুত্তাকী হলে এবং যা উত্তম তা গ্রহণ কররে আমি তার জন্য সুগম করে দেব সহজ পথ। আর কেউ কার্পন্য করলে, নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করলে এবং যা উত্তম তা বর্জন করলে, তার জন্য আমি সুগম করে দিব কঠোর পরিণামের পথ ।

(ঙ) ‘আমক্বা’ : আমক্বা’ অর্থ বদনসীব বা হতভাগ্য। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “এতে (লেলিহান অগ্নিতে) প্রবেশ করবে সে-ই, যে নিতান্ত হতভাগ্য-যে অস্বীকার করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়; আর সেখান থেকে অনেক দুরে রাখা হবে পরম মুত্তাকীকে-যে স্বীয় সম্পদ দান করে আত্মশুদ্ধির জন্য।

(চ) ‘মুজরিম’: ‘মুজরিম’ অর্থ পাপী বা অপরাধী। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, “যে দিন দয়াময়ের নিকট মুত্তাকীগণকে সম্মাণিত মেহমানরূপে সমবেত করব এবং অপরাধীদেরকে তৃঞ্চাতুর অবস্থায় জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাব। ”

(ছ) ‘যালিম’: ‘যালিম’ অর্থ অত্যাচারী বা নির্যাতনকারী। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, “পরে আমি মুত্তাকীগণকে উদ্দার করব এবং যালিমদেরকে সেখানে নতজানু অবস্থায় রেখে দিব। ”

মুসলিম মনীষীদের দৃষ্টিতে তাকওয়া ও মুত্তাকী

১. আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) বলেন, “তাকওয়া হচ্ছে পাপ কাজে জড়িয়ে থাকাকে ছেড়ে দেয়া এবং সৎকাজে প্রতারিত হওয়াকে ছেড়ে দেয়া ।” কুরআনের বাণী “হে মানবসমাজ! তোমরা তোমাদের প্রভূর ইবাদত কর, যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার ।” এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে আল্লামা কাযী নাসিরুদ্দীন বায়যাবী (র) বেলন, “এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহর পথের পথিকদের সর্বশেষ স্তর। আল্লাহ ব্যতীত সবকিছু থেকে মুক্ত হয়ে কেবল আল্লাহমুখী হয়ে জীবন যাপন করা এবং ইবাদতকারী যেন তার ইবাদত দ্বারা প্রতারিত না হয়; বরং সে ভয় ও আশা নিয়ে ইবাদত করবে। যেমন আল্লাহ্ তা’আলা অন্যত্র বলেছেন, “ তারা তাদের প্রভূর ইবাদত করে ভয়ে ভয়ে ও আশায় আশায়। তারা তাঁর রহমতের প্রত্যাশা করে এবং তাঁর শাস্তিকে ভয় করে ।”

২. উমর ইব্নু আবদুল আযীয (র) বলেন, “ আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা ছেড়ে দেয়া এবং তিনি যা ফরয করেছেন তা আদায় করার নাম হচ্ছে তাকওয়া ”।

৩. আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) মুত্তাকীদের পরিচয় দিয়ে বলেন, “ যারা মহান আল্লাহর শাস্তিকে ভয় করে এমন সব কর্মকাণ্ড ছেড়ে দিয়ে, যেগুলোর হারাম হওয়া সম্পর্কিত বিধান আল্লাহর দেয়া হেদায়েত তথা কুরআন ও হাদীস থেকে তারা জানে এবং অনুসরণের জন্য মহনবী (সা) যা নিয়ে এসেছেন তার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসী হয়ে আল্লাহ্র রহমত কামনা করে ।” তিনি আরো বলেন, “যে ব্যক্তি নিজেকে শিরক, কবীরা গুনাহ ও অশ্লীল কাজকর্ম ও কথাবার্তা থেকে বিরত রাখে, তাকে মুত্তাকী বলা হয়। ”

৪. কালবী (র.) বলেন, “যারা গুনাহে কবীরা তথা বড় ধরনের অপবাদ থেকে বেঁচে থাকে, তারা হল মুত্তাকী ।”

৫. হাসান (র.) বলেন, “ আল্লাহ্র ওপর আল্লাহ ব্যতীত কাউকে গ্রহণ না করা এবং সবকিছু তাঁর হাতে ন্যস্ত বলে জানা-এটিই হচ্ছে তাকওয়া।“তিনি আরও বলেন, “হারামের ভয়ে বহু হালালও যতক্ষণ মুত্তাকীগণ বর্জন করে চলেন ততক্ষণ পর্যন্ত মুত্তাকীদের মাঝে তাকওয়া বিদ্যমান থাকে। ” আল্লাহ্র বাণী “ লিলমুত্তাকীন ”–এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “মুত্তাকী হচ্ছে তারা, যারা তাদের প্রতি যা হারাম করা হয়েছে তা থেকে দূরে থাকে এবং তাদের ওপর যা ফরয করা হয়েছে তা পালন করে ।”

৬. ইবরাহীম ইব্নু আদহাম (র.) বলেন, “ সৃষ্টিজগত তোমার যবানে-কথায় কোন ক্রটি পাবে না, ফেরেশতাগণ তোমার কাজ-কর্মে ক্রটি পাবে না এবং আরশের অধিপতি আল্লাহ্ তোমার গোপনীয়তায় কোন ক্রটি পাবে না-এমন অবস্থার নাম তাকওয়া। ”

৭. ওয়াকেদী (র.) বলেন, “তাকওয়া হচ্ছে সত্যের জন্য তোমার মনকে সজ্জিতকরণ, যেমন তোমার বাহ্যিক অবস্থাকে চরিত্রের জন্য সাজিয়ে থাক ।”

৮. আবদুল্লাহ ইব্ন মুবারক (র.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “যদি কোন ব্যক্তি পরিহারযোগ্য একটি বিষয়েও সে করে তাহলে সে ব্যক্তি মুত্তাকীদের অন্তর্ভূক্ত হবে না ।”

৯. আবূ দারদা (রা.) বলেন, “ সম্পূর্ণ তাকওয়া হল বান্দা আল্লাহকে ভয় করবে (করণীয় বিষয়) ত্যাগ করতে গিয়ে কিছু হালালও বর্জন করবে এই ভয়ে যেন তাকে হারামে পড়তে না হয়; আর যেন সামন্য হালাল বর্জন যেন হারাম এবং হালালের মাঝখানে পর্দা-দেয়াল হয়ে যায়। ”

১০. সুফইয়ান সাওরী (র.) বলেন, “যে বিষয়ে তোমর মনে সন্দেহ হয়, তা পরত্যাগ করার চেয়ে তাকওয়ার সহজ পথ আমার জানা নেই। ” সুতরাং সন্দেহপূর্ণ যে কোন কাজ থেকে বিরত থাকা এবং সবসময় নিজের নফসের হিসাব গ্রহণ করা হল তাকওয়া।

১১. শাহর ইব্নু হাউশার (র) বলেন, “মুত্তাকী হচ্ছেন তিনি, যিনি এমন বিষয়-আশায়ও বর্জন করেন, যাতে কোন ক্ষতি নেই এই ভয়ে যাতে ক্ষতি আছে তা থেকে যেন বেঁচে থাক যায়। ”

১২. আতিয়া আল সাআদী (রা.) বলেন, “মুমিন বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত মুত্তাকী বলে গণ্য হয় না যতক্ষণ না সে এমন বিষয়ও পরিত্যাগ নাকরে যা ক্ষতির কারণ হতে পারে। ”

১৩. ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) একবার উবাই ইব্নু কা’ব (রা)-কে বললেন, “আপনি তাকওয়া সম্পর্কে আমাকে বলুন। জবাবে তিনি বললেন, ‘আপনি কি কখনও কন্টকাকীর্ণ পথ দিয়ে চলেছেন? ওমর (রা) বলেছেন, কাপড় চোপড় গুটিয়ে অত্যন্ত সাবধানে চলেছি। কা’ব (রা) বললেন, ওটাই তো তাকওয়া ।” বস্তত: বিবেকের সার্বক্ষণিক সচেতনতা ও সতর্কতা, চেতনা ও অনুভূতির স্বচ্ছতা, নিরবচ্ছিন্ন সাবধানতা, জীবন পথের কন্টকসমূহ থেকে আ্ত্মরক্ষার প্রবণতা, অব্যাহত ভীতি-এ সবেরই নাম তাকওয়া। জীবন পথের কন্টকসমূহ হচ্ছে প্রবৃত্তির কুৎসিত কামনা, বাসনা ও প্ররোচনা। অন্যায় লোভ-লালসা, মোহ, ভয়-ভীতি ও শংকা, আশা পূরণে সক্ষম নয় এমন কারো কাছে মিথ্যা আশা পোষণ করা, ক্ষতি বা উপকার সাধনে সক্ষম নয় এমন কারো মিথ্যা ভয়ে আক্রান্ত হওয়া ইত্যাদি ।

১৪. আবদুল্লাহ ইবন ওমর (রা) বলেন, “তাকওয়া হচ্ছে নিজেকে অন্য যে কারোর তুলনায় উত্তম মনে না করা ।” এ কথার অর্থ এ নয় যে, একজন মানুষ নিজেকে হীন, তুচ্ছ, নিকৃষ্ট ও অবহেলিত মনে করবে; বরং এ কথার প্রকৃত মর্ম হচ্ছে, আল্লাহ্র নির্দেশ পালন তথা ব্যক্তি জীবন থেকে রাষ্টীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসলামের যে বিধি-নিষেধ রয়েছে তা মানার ক্ষেত্রে সে ইবলিসের মত এ কথা বলবে না যে, “আমি তার [আদম (আ)] চেয়ে উত্তম-শ্রেষ্ঠ; আপনি আমাকে আগুন দিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন ।” অর্থাৎ সে অহংকারী হবে না।

১৫. কোন কোন মুফাসসির বলেন, “তাকওয়া হচ্ছে মহানবী (সা) এর অনুসরণ করা। কেউ কেউ বলেন, আল্লাহ তা’আলার বাণী ‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আদল ও ইহসান…. এর নির্দেশ দিয়েছেন’ এই বাণীতে তাকওয়ার সমাবেশ রয়েছে ।”

‘তাকওয়া’র স্তরসমূহ

‘তাকওয়া’ ‘বেঁচে থাকা’ অর্থে ব্যবহৃত হলে এর তিনটি স্তর পরিলক্ষিত হয়।

প্রথম স্তর হল কুফর ও শির্ক থেকে বেঁচে থাকা। এ অর্থে একজন সাধারণ মুসলিমকেও মুত্তাকী বলা যায়; যদিও তার থেকে গুনাহ্ প্রকাশ পেয়ে থাকে। এ অর্থ বুঝানোর জন্য পবিত্র কুরআনের বহু জায়গায় মুত্তাকূণ, মুত্তাকীন ও তাকওয়া শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।

দ্বিতীয় স্তর- যা প্রকৃতপক্ষে কাম্য, তা হল এমন সব বিষয় থেকে বেঁচে থাকা যা আল্লাহ্ তা’আলা ও তাঁর রাসূলের পছন্দনীয় নয়। কুরআন ও হাদীসে তাকওয়ার যেসব মর্যাদা ও কল্যাণ প্রতিশ্রুত হয়েছে তা এ স্তরের তাকওয়ার উপর ভিত্তি করেই হয়েছে।

তৃতীয় স্তরটি তাকওয়ার সর্বোচ্চ স্তর। সকল নবী-রাসূলগণ ও তাঁদের বিশেষ উত্তরাধিকারী ওলীগণ এ স্তরের তাকওয়া অর্জন করে থাকেন। এ স্তরের তাকওয়া হল অন্তরকে আল্লাহর ব্যতীত সবকিছু থেকে মুক্ত রাখা । উল্লেখিত মতের সাথে একমত পোষণ করে কাযী নাসিরুদ্দীন বায়যাবী (র) বলেন, ‘তাকওয়া’র তিনটি স্তর রয়েছে :

এক. শিরক থেকে মুক্ত হয়ে চিরস্থায়ী শাস্তি থেকে বেঁচে থাকা।

দুই. যা করলে পাপ হয় অথবা ছেড়ে দিলে পাপ হয় এমন সবকিছূ থেকে দূরে থাকা। কারো কারো মতে সামান্য ও ছোট-খাটো ক্রটি-বিচ্যুতি থেকেও বেঁচে থাকা। আর ইসলামী শরী’আতে এটিই তাকওয়া নামে পরিচিত। পবিত্র কুরআনের বাণী ‘আর যদি গ্রামের অধিবাসীরা ঈমান গ্রহণ করে ও তাকওয়া অবলম্বন করে’ বলে ‘তাকওয়া’র এ অর্থটি গ্রহণ করা হয়েছে।

তিন. নিজের অন্তরকে সত্য-সঠিক তথা আল্লাহ্ তা‘আলা থেকে ফিরিয়ে রাখে এমন কিছু থেকে পুত-পবিত্র থাকা এবং সম্পূর্ণরূপে আল্লাহমুখী হওয়া। এটিই হচ্ছে প্রকৃত তাকওয়া যা আল্লাহর বাণী ‘তোমরা আল্লাহকে যথার্থরূপে ভয় কর’ দ্বারা বুঝানো হয়েছে । তাফসীর জালালাইন এর টীকায়ও ‘তাকওয়া’র স্তর-বিন্যাস তিন প্রকার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এক. সাধারণের তাকওয়া। তা হল কুফর থেকে বেঁচে থাকা।

দুই. খাছ লোকদের তাকওয়া, আর তা হচ্ছে আল্লাহ্র সকল নির্দেশসমূহ পালন করা এবং তাঁর সকল নিষেধাজ্ঞা থেকে দুরে থাকা।

তিন. বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিদের তাকওয়া। আর তা হল আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত রাখে এমন সবকিছূ থেকে বেঁচে থাকা । এতে বুঝা যায় যে, পূর্ণ ইসলামই প্রকৃত পক্ষে তাকওয়া। অর্থাৎ আল্লাহ্ তা’আলা ও তাঁর রাসূল (সা)-এর পূর্ণ আনুগত্য করা এবং তাঁর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাককেই তাকওয়া বলা হয় । বস্তুত তারাই মুত্তাকী, যাদের ঈমান ও ‘আমল দুটিই পূর্ণাঙ্গ। আর ঈমান ও আমল এ দুয়ের সমন্বয়ই ইসলাম ।

ইমাম আল-গাযালী (র) তাকওয়ার চারটি স্তর বর্ণনা করেছেন।

এক. শরী’আতে যে সকল বস্তুকে হারাম করা হয়েছে, আল্লাহ্র ভয়ে সকল বস্তু থেকে বিরত থাকা। যেমন, মদ্যপান, ব্যভিচার, জুয়াখেলা ও সুদ খাওয়া প্রভৃতি হারাম কাজ থেকে আত্মরক্ষা করা। এটি সাধারণ মুমিনের তাকওয়া। এ শ্রেণীর মুত্তাকীকে বলা হয় মু’মিন।

দুই. হারাম বস্তুসমূহ হতে বিরত থাকার পর সন্দেহযু্ক্ত হালাল বস্তুসমূহ হতেও দূরে থাকা। এ শ্রেণীর মুত্তাকীকে বলা হয় সালিহ। তিন. সকল হারাম বস্তু ও সন্দেহযু্ক্ত হালাল বস্তুসমূহ হতে দূরে থাকার পর আল্লাহ্র ভয়ে অনক সন্দেহবিহীন হালাল বস্তুও পরিত্যাগ করে, এ শ্রেণীকে মুত্তাকী বলা হয় । চার. তিন শ্রেণীর তাকওয়া আয়ত্ত করার পর এমন সকল হালাল বস্তু পরিত্যাগ করা যা ইবাদাতে কোনরূপ সহায়তা করে না। এ শ্রেণীর মুত্তাকীকে বলা হয় ‘সিদ্দীক’ ।

সমাজ জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

সামাজিক জীবন দর্শনে তাকওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। তাকওয়ার পোশাক যারা আচ্ছাদিত তাদের কর্তৃক কোন রকম অন্যায় ও অসৎ কাজ হতে পারে না। অশ্লীলতা, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজী, সুদ, ঘুষ, সম্পদ লুটপাট, কাউকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করণ, ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাত-মুস্তাহাবরূপে নির্ধারিত হাক্কুল্লাহ (আল্লাহর অধিকার) ও হাক্কুল ইবাদ (মানুষের প্রতি মানুষের ও সৃষ্টিজগতের প্রতি মানুষের যাবতীয় দায়িত্ব-কর্তব্যসমূহ) পালন উদাসীন থাকা থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত থেকে মুত্তাকীগণ জীবন যাপন করে। সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখার পাশাপাশি দেশ ও জাতির উন্নয়নে গঠনমূলক কাজের মাধ্যমে অবদান রাখতে সর্বদা সচেষ্ট থাকে। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন, “আল্লাহ্ তাদেরই সঙ্গে আছে যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মপরায়ন ।” অন্যত্র বলা হয়েছে, “আল্লাহ্ মুত্তাকীদের অভিভাবক-বন্ধু ।”

তাকওয়া বা আন্তরিকতাবিহীন কোন কাজই সফলতা বয়ে আনে না। যে কোন কাজের প্রাণ হল তাকওয়া। বিশেষ করে ইবাদত হিসাবে যা কিছু করা হয় তা আল্লাহ্র কাছে গ্রহণীয় হওয়ার জন্য তাকওয়া একান্ত প্রয়োজন। কারণ, “ আল্লাহ কেবল মুত্তাকীদের কুরবানীই গ্রহণ করে থাকে। ” অন্যত্র বলা হয়েছে, “ আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর (কুরবানীর পশুর) গোশত এবং রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া-মনের একাগ্রতা। ” মূলত তাকওয়ার গুণ অর্জনের জন্যই ইসলামের যাবতীয় বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সালাত, সাওম, যাকাত ও হজ্জসহ সকল মৌলিক কাজ অবশ্য পালনীয় করে দেয়া হয়েছে কেবল মানুষের মধ্যে সুপ্ত তাকওয়া গুণকে সমুন্নত করার জন্য। যে মানুষ যতবেশী তাকওয়ার অধিকারী হবে সে জাগতিক জীবনে সমাজে ততবেশী মর্যাদা ও সম্মানের যোগ্য হবে এবং পরকালে আল্লাহর কাছে বেশী সম্মনিত হবে। আর কে কত বেশী মুত্তাকি তা নিয়ে আত্মপ্রশংসা করার কোন সুযোগ নেই। কেননা আল্লাহই ভাল জানেন কে কত বেশী মুত্তাকী। যারা তাকওয়ার গুণ অর্জন করতে পারেন তারা আল্লাহর ভালবাসা লাভে ধন্য হন, আল্লাহ তাদের অতিবাহিত হয় বলে পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করা হয়েছে। ইমাম ফখরুদ্দীন আল-রাযী (র) বলেছেন, মুত্তাকীর মর্যাদা বর্ণনায় “হুদাল লিল মুত্তাকীন” (পবিত্র কুরআন মুত্তাকীদের জন্য পথপ্রদর্শক) আয়াতাংশটি ছাড়া যদি আর একটি আয়াতও না থাকত তবে তাদের মর্যাদা বর্ণনায় এটিই যথেষ্ট ছিল। কারণ তাঁর মতে পবিত্র কুরআন মুত্তাকীদের জন্য পথ প্রদর্শক। অন্য আয়াতে “আল-কুরআন হুদাল লিন নাস” অর্থাৎ‘পবিত্র কুরআন মানুষের জন্য পথপ্রদর্শক। ” বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আর এটি সর্বজন বিদিত যে, কুরআন যার উপর অবতীর্ণ হয়েছে তাঁর আহবান ছিল বিশ্বজনীন। এতে বুঝা যাচ্ছে যে, সকল মানুষই মুত্তাকী তথা সবার মধ্যেই তাকওয়া রয়েছে। যার মধ্যে তাকওয়া নেই, সে যেন মানুষই নয়। যামাখশারী (র) আল্লাহর বাণী“ অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তাকওয়া অবলম্বন কর এবং নিজেদের মধ্যে সদ্ভাব স্থাপন কর এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর, যদি তোমরা মু’মিন হও ” এর ব্যাখ্যায় বলেন, এ আয়াতে মহান আল্লাহ্ তাকওয়া অবলম্বন, নিজেদের মধ্যে সদ্ভাব বজায় রাখা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুসরণ করাকে ঈমানের অপরিহার্য অংশ ও অবিচ্ছেদ্য দাবী বলে নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং তাকওয়া ছাড়া ঈমান পরিপূর্ণ নয়। আল্লাহর হক ও বান্দার হক উভয়টির মহত্ব ও গুরুত্ব বুঝানোর জন্য সূরা আন- নিসার প্রথম আয়াতটি শুরু করা হয়েছে তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিয়ে এবং শেষও করা হয়েছে তাকওয়ার মাধ্যমে পরস্পরিক লেন-দেন সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়ে। সুতরাং মানুষের উচিত জীবনের সকল ক্ষেত্রে তাকওয়া অবরম্বন করা।

তাকওয়ার মৌলিকত্ব বাহ্যিকতার চেয়ে ভিতরটায় সম্পৃক্ত বেশী। গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে মহান আল্লাহকে ভয় করার মানসিকতা গড়ে তোলা এবং জীবনের সকল কর্মকাণ্ড তথা ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, পাপ-পূণ্য, ঠিক-বেঠিক, হালাল-হারাম যা-ই করুক না কেন তা লিপিবদ্ধকরার জন্য ফেরেশতা নিয়োজিত রয়েছে। ছোট-বড় কোন কিছুই তার খতিয়ানে লেখা থেকে বাদ যাচ্ছে না। এক সময় সে তার কৃত সমুদয় কর্মকান্ড স্বচক্ষে দেখতে পাবে। এই অনুভূতি নিয়ে জীবন পরিচালনা করাই হল তাকওয়ার দাবী। তাকওয়া বাহ্যিক আড়ম্বরতা ও লোকিকতার কোন স্থান নেই। “মানুষের বাহ্যিক অবয়ব এবং সম্পদের প্রতি আল্লাহ তাকান না; বরং তিনি দেখেন মানুষের কর্মকাণ্ড এবং মন-মানসিকতা। মানব দেহের কোন স্থানে তাকওয়ার অবস্থান সে সম্পর্কে প্রিয় নবী (সা)-এর সুস্পষ্ট বক্তব্য হল “তাকওয়া এখানে এবং তিনি তাঁর বুকের দিকে ইশারা করলেন।” অর্থাৎ যে মন বা অন্তকরণ মানুষের সকল কর্মকাণ্ডের চালিকা শক্তি সেই মনের শুদ্ধতাই হচ্ছে তাকওয়া। কেননা মানব দেহের এ অংশটি সুস্থ থাকলে পুরো দেহই সুস্থ-স্বাভাবিক থাকে বলে হাদীসে প্রমাণ রয়েছে। পরকালে মুত্তাকীগণই জান্নাত লাভে ধন্য হবেন। “মুত্তাকীগণ থাকবেন প্রস্রবণ-বহুল জান্নাত। তাঁদেরকে বলা হবে তোমরা শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে তাতে প্রবেশ কর…..”।

তাকওয়ার ব্যক্তিগত , পারিবারিক ও সমাজ জীবনে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি করে মানব মনে ইতিবাচক মুল্যবোধ সৃষ্টি করে এবং তাকওয়ার অভাব মানব জীবনকে অস্থির, নিরাপত্তাহীন, পঙ্কিল ও দুর্বিসহ করে তোলা। কেননা, উপর্যূক্ত আলোচনায় দেখা যায়, তাকওয়া শুধু আল্লাহ্ ভীতির মাধ্যেই সীমিত নয়; বরং সত্য সন্ধান, সত্য গ্রহণ, সত্যের উপর সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকা, আল্লাহ্ তা‘আলাকে ভয় করা, আল্লাহর ভয়ের ভিত্তিতে দায়িত্ব সচেতনতা ও দায়িত্ব সচেতনতার সাথে কর্তব্য সম্পাদনই হচেছ তাকওয়া। অর্থাৎ মানব জীবনের সকল কর্মকান্ড ও তৎপরতাকে আল্লাহ্র নির্দেশিত পথে পরিচালনা করা, আল্লাহ্র ইচ্ছানুযায়ী সকল কাজ সম্পাদন করা, আল্লাহ্ কর্তৃক নিষিদ্ধ পথ ও পন্থা পরিহার করা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ্র সৃষ্টিকূলের কল্যাণ কামনা করা, সর্বোপরি জবাবদিহিতামূলক সচেতনতার সাথে দায়িত্ব পালন করাই প্রকৃত তাকওয়া। তাই নানা সমস্যায় জর্জরিত মুসলিম জাতির ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কাঙ্খিত কল্যাণ লাভের জন্য প্রয়োজন মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাকওয়া অর্জন এবং তাকওয়ার ভিত্তিতে জীবন গঠন। আমাদের সমাজে যে দিন থেকে পূর্ণরূপ প্রকৃত তাকওয়া সৃষ্টি হবে সেদিনই এ বিশৃঙ্খলাপূর্ণ সমাজে শৃঙ্খলা ফিলে আসবে এবং সমাজ হবে সুখে-শান্তিতে সমৃদ্ধ, স্থিতিশীল ও প্রাণবন্ত।

সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ:

Advertisements

3 comments on “ইসলামে ‘তাকওয়া’র স্বরূপ ও সমাজ জীবনে এর প্রভাব – ২

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s