গ্যালারি

সঠিক আকীদা-বিশ্বাস ও যা এর পরিপন্থী – ১

সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য, দরুদ ও সালাম সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবীগণের উপর। কুরআন ও সুন্নাতে বর্ণিত শরীয়াতি প্রমাণাদির দ্বারা একথা সুস্পষ্টরূপে পরিজ্ঞাত রয়েছে যে, যাবতীয় কথা-বার্তা ও কার্যাবলি কেবল তখনই আল্লাহ তা‘আলার নিকট স্বীকৃত ও গৃহীত হয়, যখন ইহা ‘বিশুদ্ধ আকীদা’ অর্থাৎ সঠিক ধর্ম বিশ্বাসের ভিত্তিতে সম্পাদিত হয়ে থাকে। আর যদি আকীদা বিশুদ্ধ না হয় তাহলে ইহার ভিত্তিতে সম্পাদিত যাবতীয় কথা ও কাজ আল্লাহ্‌র নিকট বাতেল বলে গণ্য হয়।

আল্লাহ্‌ তা‘আলা বলেন:

 “যে কেউ ঈমান প্রত্যাখ্যান করবে তার সমস্ত কাজ অবশ্যই বিফলে যাবে এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভুক্ত হবে”। (আল-মায়েদা-৫)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

“তোমার প্রতি এবং তোমার পূর্বে অতীত সমস্ত নবী রাসূলগণের প্রতি অবশ্যই এ বার্তা পাঠানো হয়েছে, তুমি যদি আল্লাহর সাথে শিরক কর, তাহলে তোমার সমস্ত কাজ অবশ্যই বৃথা হয়ে যাবে, আর তুমি নিঃসন্দেহে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে”। (সূরা-যুমার-৬৫)

এই অর্থের স্বপক্ষে কুরআন শরীফে বর্ণিত আয়াতের সংখ্যা অনেক। আল্লাহ তা‘আলার অবতীর্ণ সুস্পষ্ট কিতাব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীসে প্রমাণিত আছে যে, বিশুদ্ধ আকীদার সারকথা হলো: আল্লাহর উপর, তাঁর ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ ও রাসূলগণের উপর, আখেরাতের দিন এবং ভাগ্যের মঙ্গল-অমঙ্গলের উপর বিশ্বাস স্থপন করা। এ ছয়টি বিষয়ই হলো সেই সঠিক ধর্মবিশ্বাসের মৌলিক বিষয়বস্তু বা নীতিমালা, যা নিয়ে নাযেল হলো মহাগ্রন্থ আল-কোরআন এবং প্রেরিত হলেন আল্লাহ্‌র প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম । এই মৌলিক নীতিমালারই শাখা-প্রশাখা হলো অদৃশ্য বিষয়াদি এবং আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূল কৃর্তক প্রদত্ত যাবতীয় খবরা-খবর, যেগুলির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা প্রত্যেকের জন্য অপরিহার্য। উক্ত ছয় নীতিমালার স্বপক্ষে কুরআন ও সুন্নাহতে ভুরি ভুরি প্রমানাদি রয়েছে। তম্মধ্যে আল্লাহ তা‘আলার নিম্নোক্ত বাণীগুলো সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য।

আল্লাহ্‌ তা‘আলা বলেন:

তোমরা পূর্বদিকে মুখ করলে কি পশ্চিম দিকে, তা প্রকৃত কোন পূর্ণ্যের ব্যাপার নয়। বরং প্রকৃত পূণ্যের কাজ হলো যে, আল্লাহ তা‘আলা, পরকাল ও ফেরেশতাকুল, অবতীর্ণ কিতাবসমূহ এবং প্রেরিত নবীগণের প্রতি নিষ্ঠার সাথে বিশ্বাস স্থাপন করা”। (সূরা বাকারা-১৭৭)

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

“রাসূল সেই হেদায়াতকেই (পথ নির্দেশ) বিশ্বাস করেছেন যা স্বীয় প্রতিপালকের নিকট হতে তাঁর প্রতি নাজিল হয়েছে, আর মুমিনগণও সেই হেদায়েতকে মেনে নিয়েছে। তাঁরা সকলেই আল্লাহ তা‘আলা, তাঁর ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ এবং রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস স্থপন করেছে। তাঁরা বলে: আমরা আল্লাহ্‌র রাসূলগণের মধ্যে কোন ভেদাভেদ করিনা”। (সূরা আল-বাকারা-২৮৫)

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:

“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহ্‌র প্রতি, তাঁর রাসূলের প্রতি এবং সেই কিতাবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর, যা আল্লাহ স্বীয় রাসূলের প্রতি নাযিল করেছেন। আর সেইসব কিতাবের প্রতিও বিশ্বাস স্থপন কর, যা এর পূর্বে নাজিল করেছেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌ তাঁর ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ ও রাসূলগণ এবং পরকাল অস্বীকার করবে সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়বে”। (সূরা আন-নিসা-১৩৬)

আল্লাহ্‌ তা‘আলা আরো বলেন:

 

“তোমার কি জানা নেই যে, আসমান-জমীনের সবকিছুই আল্লাহ্‌র জ্ঞানের আওতাভূক্ত, সবকিছুই একটি কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এতো আল্লাহর পক্ষে অতি সহজ”। (সূরা আল-হজ্জ-৭০)

উপরোক্ত নীতিমালার প্রমাণে সহীহ হাদিসের সংখ্যাও অনেক। তম্মধ্যে সেই সুপ্রসিদ্ধ হাদীসটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যা ইমাম মুসলিম স্বীয় সহীহ হাদীস গ্র্রন্থে আমীরূল মুমিনীন উমর বিন খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু হতে বর্ণনা করেছেন। উক্ত হাদীসে আছে যে, জিবরীল আলাইহিস্‌ সালাম যখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন; তখন তিনি উত্তরে বলেন- “ঈমান হচ্ছে তুমি আল্লাহ্‌ ত‘আলার প্রতি, তাঁর ফেরেশতাকুল, কিতাব সমূহ ও রাসূলগণের প্রতি এবং পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে; আর এই বিশ্বাসও স্থাপন করবে যে, ভাগ্যের ভালোমন্দ আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকেই নির্ধারিত”। (বুখারী ও মুসলিম)

[প্রথম নীতি]

আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমান

আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমানের প্রথম কথা হলো এই বিশ্বাসই স্থাপন করা যে, তিনিই ইবাদতের একমাত্র যোগ্য, সত্যিকার মা‘বুদ, অন্য কেউ নয়। কেননা, একমাত্র তিনিই বান্দাহদের স্রষ্টা, তাদের প্রতি অনুগ্রহকারী এবং তাদের জীবিকার ব্যবস্থাপক। তিনি তাদের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত এবং তিনি তাঁর অনুগত বান্দাকে প্রতিফলদানে ও অবাধ্যজনকে শাস্তি প্রদানে সম্পূর্ণ সক্ষম। আর এই ইবাদতের জন্যেই আল্লাহ্‌ তা‘আলা জ্বিন ও ইন্‌সানকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের প্রতি তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ্‌ বলেন:

“আমি জ্বিন ও ইনসানকে কেবল আমারই ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি। আমি তাদের নিকট কোন রিজিক চাইনা, এটাও চাইনা যে, তারা আমাকে খাওয়াবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ নিজেইতো রিজিকদাতা, মহান শক্তিধর ও প্রবল পরাক্রান্ত”। (সূরা যারিয়াত: ৫৬,৫৭)

আল্লাহ্‌ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:

 “হে মানুষ, তোমরা তোমাদের প্রভূ প্রতিপালকের ইবাদত কর যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তী সকলকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পার। তিনিই সেই প্রভূ যিনি তোমাদের জন্যে পৃথিবীকে বিছানা স্বরূপ, আকাশকে ছাদ স্বরূপ তৈরী করেছেন এবং আকাশ হতে বৃষ্টিধারা বর্ষণ করে এর সাহায্যে নানা প্রকার ফল-শষ্য উৎপাদন করে তোমাদের জীবিকার ব্যবস্থা করেছেন। অতএব, তোমরা এসব কথা জেনেশুনে কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করোনা”। (সূরা বাকার : ২১,২২)

এ সত্যকে স্পষ্ট করে তুলে ধরার জন্য এবং এর প্রতি উদাত্ত আহবান জানিয়ে এর পরিপন্থী বিষয় থেকে সতর্ক করে দেয়ার উদ্দেশ্যে আল্লাহ্‌ যুগে যুগে বহু নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন ও কিতাবসমূহ নাজিল করেছেন।

মহান আল্লাহ বলেন:

“প্রত্যেক জাতির প্রতি আমি রাসূল পাঠিয়েছি এই আদেশ সহকারে যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত কর এবং তাগুত (শয়তানি শক্তি) এর ইবাদত থেকে দুরে থাক”। (সূরা নাহল-৩৬)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

 “প্রত্যেক জাতির প্রতি আমি রাসূল পাঠিয়েছি এই আদেশ সহকারে যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহ্‌রই ইবাদত কর এবং তাগুত (শয়তানি শক্তি) আর কোন মা‘বুদ নেই। অতএব, তোমরা কেবল আমারই ইবাদত কর”। (সূরা আম্বিয়া: ২৫)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

“ইহা এমন একটি কিতাব যার আয়াতসমূহ এক প্রজ্ঞাময় সর্বজ্ঞ সত্তার নিকট থেকে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত এবং সবিস্তারে বিবৃত রয়েছে, যেন তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত না কর। অনন্তর, আমি তাঁরই পক্ষ হতে তোমদের প্রতি একজন ভয় প্রদর্শনকারী ও সুসংবাদদাতা”। (সূরা হূদ : ১.২)

উল্লেখিত ইবাদতের প্রকৃত অর্থ হলো: যাবতীয় ইবাদত একমাত্র আল্লাহ্‌ পাকের তরেই নিবেদিত করা। প্রার্থনা, ভয়, আশা, নামায, রোজা, জবেহ, মানত ইত্যাদি সর্বপ্রকার ইবদত তাঁরই প্রতি পূর্ণ ভালোবাসা রেখে শ্রদ্ধাপূর্ণ ভয় ও পূর্ণ বশ্যতা সহকারে সম্পাদন করা। কুরআন শরীফের অধিকাংশ আয়াত এই মহান মৌলিক নীতি সম্পর্কেই অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ বলেন:

“অতএব তুমি এক আল্লাহ্‌রই ইবাদত কর, দ্বীনকে একমাত্র তাঁরই জন্যে খালেছ কর। সাবধান, খালেছ দ্বীনতো একমাত্র আল্লাহরই প্রাপ্য”। (সূরা যুমার: ২, ৩)

আল্লাহ্‌ পাক বলেন:

 “তোমার প্রতিপালক এই বিধান করে দিয়েছেন যে, তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদত করবে, অন্য কারো নয়”। (সূরা ইসরা: ২৩)

মহান আল্লাহ আরো বলেন:

“অতএব, তোমরা আল্লাহকেই ডাক, নিজেদের দ্বীনকে কেবল তাঁরই জন্যে খালেছ ভাবে নির্দিষ্ট কর, কাফেরদের কাছে তা যতই দুঃসহ হোক না কেন”। (সূরা গাফের: ১৪)

মু‘আয রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, ‘বান্দার উপর আল্লাহ্‌র অধিকার হলো তারা যেন কেবল তাঁরই ইবাদত করে এবং এতে অন্য কাউকে তাঁর সাথে অংশীদার না করে’।

আল্লাহর প্রতি ঈমানের আরেকটি দিক হলো-ঐ সমস্ত বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থপন করা, যা আল্লাহ্‌ পাক তাঁর বান্দাগণের উপর ওয়াজিব ও ফরজ করেছেন। যথা: ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ:

  • (১) সাক্ষ্য প্রদান করা যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মা‘বুদ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্‌র রাসূল ,
  • (২) নামাজ প্রতিষ্ঠা করা,
  • (৩) যাকাত দেয়া,
  •  (৪) রমজানের রোজা পালন,
  • (৫) বায়তুল্লাহ শরীফে পৌঁছার সামর্থ থাকলে হজ্জব্রত পালন করা ইত্যাদি সহ অন্যান্য ফরজগুলি, যা নিয়ে পবিত্র শরীয়তের আগমন ঘটেছে।

উপরোক্ত স্তম্ভ বা রুকনগুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান করুন হলো এই সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন মা‘বুদ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহুর রাসূল। এটিই হলো কালিমা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’এর প্রকৃত মর্মার্থ। কেননা, এর যথার্থ অর্থ হলো-আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন সত্যিকার কোন মা‘বুদ নেই। সুতরাং তাঁকে ব্যতীত যা কিছুর ইবাদত করা হয়, সে মানব সন্তান হোক আর ফেরেশতা, জ্বিন বা অন্য এই যাই হোক সবই বাতেল। সত্যিকার মা‘বুদ হলেন কেবল সেই মহান আল্লাহ তা‘আলাই। আল্লাহপাক বলেন:

“তা এই জন্যে যে, আল্লাহই প্রকৃত সত্য এবং তাঁকে বাদ দিয়ে ওরা যারা ইবাদত করছে তা নিঃসন্দেহে বাতেল”। (সূরা হজ্জ: ৬২)

ইতিপূর্বে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ এই যথার্থ মৌলিক বিষয়ের উদ্দেশ্যেই জ্বিন ও ইন্‌সান সৃষ্টি করেছেন এবং তাদেরকে তা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং হে পাঠক; বিষয়টি ভাল করে ভেবে দেখুন এবং এ সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করুন। আপনার কাছে নিশ্চয়ই স্পষ্ট হয়ে উঠবে, অধিকাংশ মুসলিম উক্ত গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক নীতি সম্পর্কে বিরাট অজ্ঞতার মধ্যে নিপতিত রয়েছে। ফলে তারা আল্লাহ্‌র সাথে অন্যেরও ইবাদত করছে এবং তাঁর প্রাপ্য ও খালেছ অধিকার অন্যের তরে নিবেদিত করে চলছে।

এ বিশ্বাসও আল্লাহ্‌ পাকের প্রতি ঈমানের অন্তর্ভুক্ত যে, তিনিই সর্ব জগতের সৃষ্টিকর্তা, তাদের যাবতীয় বিষয়ের ব্যবস্থাপক এবং আল্লাহ্‌ যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে স্বীয় জ্ঞান ও কুদরতের দ্বারা তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি দুনিয়া-আখেরাতের মালিক ও সমগ্র জগৎবাসীর প্রতিপালক। তিনিই আপন বান্দাহগণের যাবতীয় সংশোধন, তাদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মঙ্গল ও কল্যানের প্রতি আহবান জানানোর উদ্দেশ্যে রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন। ঐ সমস্ত ব্যাপারে পবিত্র আল্লাহ তা‘আলার কোন শরীক নেই। তিনি আল্লাহ্‌ বলেন:

“ আল্লাহই প্রতিটি বস্তুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই সর্ব বিষয়ের যিম্মাদার”। (সূরা যুমার-৬২)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

 “নিশ্চয়ই তোমাদের প্রভূ হলেন আল্লাহ, যিনি আকাশমন্ডল ও পৃথিবীকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশের উপর উঠলেন হলেন। তিনি রাতকে দিনের অনুসরণ করে চলে। আর তিনি সৃষ্টি করেছেন সূর্য, চন্দ্র ও তারকারাজি সবই তাঁর নির্দেশে পরিচালিত। জেনে রাখো, সৃষ্টি আর হুকুম প্রদানের মালিক তিনিই। চির মঙ্গলময় মহান আল্লাহ তিনিই সর্বজগতের প্রভূ”। (সূরা আল-আ’রাফ-৫৪)

আল্লাহ্‌ তা‘আলার প্রতি ঈমানের আরেকটি দিক হলো, কুরআন শরীফে উদ্ধৃত এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে প্রমাণিত আল্লাহর সর্ব সৃন্দর নামসমূহ ও তাঁর সর্বোন্নত গুণরাজির উপর কোন প্রকার বিকৃতি, অস্বীকৃতি, ধরন, গঠন বা সাদৃশ্য আরোপ না করে বিশ্বাস স্থাপন করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

“কোন কিছুই তাঁর সাদৃশ্য নেই। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা”। (সূরা শূরা-১১)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

“সুতরাং তোমরা আল্লাহ্‌র কোন সদৃশ্য স্থির করো না, নিঃসন্দেহে আল্লাহ্‌ই জানেন, তোমরা জান না”। (সূরা নাহল : ৭৪)

এই হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণ ও তাঁদের নিষ্ঠাবান অনুসারী আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আকিদা বা বিশ্বাস। ইমাম আবুল হাসান আল-আশ’আরী রহিমাহুল্লাহ্‌ তাঁর ‘আল-মাকালাত আন আসহাবিল হাদীস অ আহলিস-সুন্নাহ’ গ্রন্থে এই আকীদার কথাই উদ্ধৃত করেছেন। এভাবে ইল্‌ম ও ঈমানের বিজ্ঞজনেরাও বর্ণনা করে গেছেন। ঈমাম আওযায়ী রহিমাহুল্লাহ বলেন: ইমাম যুহরী ও মাকহুলকে আল্লাহ্‌র গুণরাজি সম্পর্কিত আয়াতগুলি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তাঁরা বলেন: এগুলি যেভাবে এসেছে ঠিক সেভাবেই মেনে নাও। ওয়ালীদ বিন মুসলিম রহিমাহুল্লাহ বলেন ইমাম মালেক, আওযায়ী, লাইছ বিন সা‘দ ও সুফইয়ান ছাওরীকে আল্লাহর গুণরাজি সম্বন্ধে বর্ণিত হাদিসসমূহ জিজ্ঞাসা করা হলে তাঁরা সকলেই উত্তরে বলেন: ‘এগুলি যেভাবে এসেছে ঠিক সেভাবে মেনে নাও’। ইমাম আওযায়ী বলেন: বহুল সংখ্যায় তাবেয়ীগণের জীবদ্দশায় আমরা বলাবলি করতাম যে, আল্লাহ পাক তাঁর আরশের উপর বিরাজমান রয়েছেন এবং হাদীস শরীফে বর্ণিত তাঁর সব গুণাবলীর উপর আমরা বিশ্বাস স্থাপন করি।

ইমাম মালেকের উস্তাদ রাবীআ বিন আবু আব্দুর রহমান রহিমাহুল্লাহকে (আল্লাহ তাঁরই আরশের উপর উঠা) সম্পর্কে যখন জিজ্ঞাসা করা হয় তখন তিনি বলেন: আল্লাহ তাঁর আরশের উপর উঠা অজানা ব্যাপার নয়; তবে এর বাস্তব ধরণ আমাদের বোধগম্য নয়। আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে রিসালাত, আর রাসূলের দায়িত্ব হলো স্পষ্টভাবে এর ঘোষণা করা এবং আমাদের কর্তব্য হলো এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহ কে [الاستواء] সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে উত্তরে তিনি বলেন: উপরে উঠা আমাদের জ্ঞাত আছে তবে এর বাস্তবধরণ অজ্ঞাত, এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা আমাদের অবশ্য কর্তব্য এবং এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা বিদ‘আত। উম্মে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে ঐ একই অর্থে হাদীস বর্ণিত আছে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআ‘ত আল্লাহ তা‘আলার জন্যে ঐসব গুণাবলী সাদৃশ্যহীনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন, যা তিনি স্বীয় কোরআন শরীফে অথবা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সহীহ হাদীসসমূহে আল্লাহর জন্যে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁরা আল্লাহকে তাঁর সৃষ্টির সাদৃশ হওয়া থেকে এমনভাবে পবিত্র রাখেন যার মধ্যে তা‘তীল বা গুণমুক্ত হওয়ার কোন লেশ থাকেনা। ফলে তারা পরস্পর বিরোধী আস্থা থেকে মুক্ত হয়ে দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে আল্লাহর গুণাবলীর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে থাকেন।

বস্তুত: আল্লাহ পাকের বিধানই হলো, যেন মানুষ রাসূলগণের মাধ্যমে প্রেরিত সত্যকে আঁকড়ে তাঁর সমুদয় সামর্থ সে পথে ব্যয় করে এবং নিষ্ঠার সাথে এর অম্বেষায় থাকে, তবেই তাকে আল্লাহ সত্যের পথে চলার তৌফিক দান করেন এবং তার বক্তব্যকে বিজয়ী করে দেন। আল্লাহ পাক বলেন:

 “বরং আমিতো বাতেলের উপর সত্যের আঘাত হেনে থাকি, ফলে তা অসত্যকে চুর্ণ-বিচুর্ণ করে দেয় এবং তৎক্ষনাৎই বাতেল বিলুপ্ত হয়ে যায়।” (সূরা আম্বিয়া : ১৮)

আল্লাহ তা‘আলা আরেকটি আয়াতে বলেন:

“আর যখনই তারা তোমার সম্মুখে কোন নুতন কথা নিয়ে এসেছে, সঙ্গে সঙ্গে আমি এর জবাব তোমাকে জানিয়ে দিয়েছি এবং অতি উত্তমভাবে মূল কথা ব্যক্ত করে দিয়েছি”। (সূরা ফুরকান: ৩৩)

হাফেয ইবনে কাছির রহিমাহুল্লাহ তাঁর বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থে আল্লাহ পাকের বাণী:

“বস্তুত তোমাদের প্রভু সেই আল্লাহ যিনি আকাশ মন্ডল ও পৃথিবীকে ছয় দিনের মধ্যে সৃষ্টি করেন, অতঃপর তিনি আরশের উপর উঠেন”। (সূরা আরাফ: ৫৪)

এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে অতি সুন্দর কথা বলেছেন যা অত্যন্ত উপকারী বিধায় এখানে প্রণিধানযোগ্য মনে করি। তিনি বলেন, এ প্র্রসঙ্গে লোকদের বক্তব্য অনেক, এর বিস্তারিত বর্ণনার স্থান এখানে নয়। আমরা এ ব্যাপারে ঐ পথই গ্রহণ করবো, যে পথে চলেছেন পূর্বেকার সুযোগ্য মনীষী ইমাম মালেক, আওযায়ী, ছাওরী, লাইছ বিন সা‘দ, শাফেয়ী, আহমদ বিন রাহওয়া সহ তৎকালীন ও পরবর্তী মুসলিমদের ইমামগণ। আর তা হলো: আল্লাহর গুণাবলীর বর্ণনা যেভাবে আমাদের কাছে পৌঁছেছে ঠিক সেভাবেই তা মেনে নেয়া, এর কোন ধরণ, সাদৃশ্য বা গুণ বিমুক্তি নির্ণয় ব্যতিরেকেই। সাদৃশ্য পন্থিদের মস্তিষ্কে প্রথম লগ্নেই আল্লাহর গুণাবলি সম্পর্কে যে কল্পনার উদয় ঘটে তা আল্লাহপাক থেকে সম্পূর্ণরূপে বিদুরিত। কেননা কোন ব্যাপারেই কোন সৃষ্টি আল্লাহর সদৃশ হতে পারে না। তাঁর সমতুল্য কোন বস্তু নেই। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি তদ্রুপই, যেরূপ শ্রদ্ধেয় ইমামগণ বলে গেছেন। তাঁদের মধ্যে ইমাম বুখারীর উস্তাদ নায়ীম বিন হাম্মাদ আল খুজায়ী অন্যতম। তিনি বলেছেন: যে লোক আল্লাহকে তাঁর সৃষ্টির সাথে কোন ব্যাপারে সদৃশ মনে করে সে কাফের এবং যে আল্লাহুর সব গুণরাজি অস্বীকার করে যা দ্বারা তিনি নিজেকে বিশেষিত করেছেন, সেও কাফের। কেননা আল্লাহকে স্বয়ং তিনি বা তাঁর রাসূল যেসব গুণরাজির দ্বারা বিশেষিত করেছেন, সৃষ্টির সাথে সেগুলির কোন সাদৃশ্য নেই।

সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার জন্যে কুরআন শরীফের স্পষ্ট আয়াত ও সহীহ হাদীসসমূহে বর্ণিত গুণরাজি এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করে যা, আল্লাহর মহত্বের সাথে মানানসই হয় এবং তাঁকে যাবতীয় অপূর্ণতা, খুঁত বা ক্রটি-বিচ্যুতি থেকে পাক-পবিত্র রাখে সে ব্যক্তিই হেদায়াতের পথ সঠিকভাবে অনুসরণ করে চলে।

 

[দ্বিতীয় নীতি]

ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান

 ফেরেশতাগণের প্রতি ব্যাপক ও বিশদভাবে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। একজন মুসলিম ব্যাপকভাবে এ বিশ্বাস স্থাপন করবে যে, আল্লাহ তা‘আলার বিপুল সংখ্যক ফেরেশতা রয়েছেন। তাদেরকে তিনি নিজ আনুগত্যের জন্যে সৃষ্টি করেছেন। তাদের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেছেন যে, তারা আল্লাহর আগেভাগে কোন কথা বলে না, বরং তারা সবর্দা তাঁর আদেশানুসারে নিজ নিজ পালন করে থাকে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

“তারা আল্লাহর সম্মানিত বান্দাহ। তাঁর (আল্লাহর) আগেভাগে তারা কথা বলে না বরং তারা সর্বদা তাঁকেই আদেশানুযায়ী দায়িত্ব পালন করে। তাদের সম্মুখে এবং পশ্চাতে যা কিছু আছে সবকিছুই তাঁর জানা রয়েছে। যাদের পক্ষে সুপারিশ করবে। আর তারা (ফেরেশতারা) আল্লাহর ভয়ে সদা সর্বদা ভীত সন্ত্রস্ত থাকে”। (সূরা আম্বিয়া-২৬-২৮)

আল্লাহর ফেরেশতাগণ অনেক প্রকার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। তম্মধ্যে একদল তাঁর আরশ উত্তোলন কাজে, অপর একদল বেহেশ্‌ত-দোযখের তত্বাবধানে এবং আরেক দল মানুষের আমলনামা সংরক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন।

আর আমরা বিশদভাবে ঐসব ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব, যাদের নাম আল্লাহ ও তাঁর রাসূল উল্লেখ করেছেন। যেমন-জীবরিল, মিকাঈল, মালিক-তিনি দোযখের তত্বাবধায়ক এভং ইসরাফীল-তিনি মহাপ্রলয়ের দিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়ার দায়িত্বে রয়েছেন। একাধিক সহীহ হাদীসে তাঁর কথা উল্লেখ আছে।

আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা) হতে বর্ণিত এক সহীহ হাদীসে আছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “ফেরেশতাগণ নুরের সৃষ্টি, জ্বিনকুল খাঁটি আগুন থেকে সৃষ্টি এবং আদমকে যা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন তা আল্লাহ তা‘আলা (কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে) তোমাদেরকে বলে দিয়েছেন”। ইমাম মুসলিম উক্ত হাদীসটি সহীহ সনদে স্বীয় গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।

[তৃতীয় নীতি]

আসমানী কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান

এভবে আল্লাহ তা‘আলার কিতাবসমূহের প্রতি ইমান আনয়নের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে এ বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে যে, আল্লাহ পাক আপন সত্যের ঘোষণা এবং এর প্রতি আহ্‌বান জানানোর উদ্দেশ্যে তাঁর নবী ও রাসূলগণের উপর অসংখ্য কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ বলেন:

“আমি আমার রাসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনাদিসহ পাঠিয়েছি এবং তাঁদের সাথে কিতাব ও মানদন্ড নাজিল করেছি, যাতে মানুষ ইনসাফ ও সুবিচারের উপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে”। (সূরা হাদীদ : ২৫)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

 “প্রথমদিকে মানুষ একই পথের অনুসারী ছিল। অনন্তর আল্লাহ নবীদের প্রেরণ করেন সঠিক পথের অুসারীদের জন্য সুসংবাদদাতা এবং বিভ্রান্তদের জন্য ভীতি প্রদর্শণকারী হিসেবে। আর, তাদের সাথে নাজিল করেন সত্যের প্রতীকসমূহ, এ উদ্দেশ্যে যে, লোকদের মধ্যে যেসব বিষয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে তিনি তার চুড়ান্ত ফায়সালা করে দেন”। (সূরা আল-বাকারা:২১৩)

আর বিশদভাবে আমরা ঐসব কিতাবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবো যেগুলির নাম আল্লাহ তা‘আলা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। যেমন, তাওরাত, ইঞ্জিল, যাবুর ও কুরআন। এগুলির মধ্যে কুরআনই সর্বোত্তম ও সর্বশেষ কিতাব যা পূর্ববর্তী অপর কিতাবসমূহের সংরক্ষক ও সত্যয়নকারী। সমগ্র উম্মতকে ইহারই অনুসরণ করতে হবে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত সহীহ সুন্নাতসহ ইহারই ফায়সালা মেনে নিতে হবে। কেননা, আল্লাহপাক তাঁর নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সমগ্র জ্বিন ও ইনসানের প্রতি রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন এবং তাঁর প্রতি এই মহান কিতাব ‘কুরআন শরীফ’ নাযিল করেছেন, যাতে তিনি ইহা দ্বারা লোকদের মধ্যে ফায়সালা করেন। উপরন্তু, আল্লাহ তা‘আলা এই কুরআনকে তাদের অন্তরস্থ যাবতীয় ব্যাধির প্রতিকার, তাদের প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট প্রতিপাদক এবং মু’মিনদের জন্য হেদায়াত ও রহমতস্বরূপ অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

“আর, ইহা এক মাহকল্যাণময় গ্রন্থ যা আমি অবতীর্ণ করেছি। সুতরাং তোমরা ইহারই অনুসরন কর এবং তাকওয়াপূর্ণ আচরণ-বিধি গ্রহণ কর। তাহলে তোমাদের প্রতি রহমত নাজিল হবে”। (সূরা আল-আনআম: ১৫৫)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

“আমি মুসলিমদের জন্য প্রত্যেকটি বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা, পথ নির্দেশ, রহমত ও সুসংবাদস্বরূপ এই কিতাব অবতীর্ণ করলাম”। (সূরা আন-নাহল: ৮৯)

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:

“(হে রাসূল) বল, ওহে মানবমন্ডলী ! নিশ্চয়ই আমি তোমদের সকলের প্রতি প্রেরিত সেই আল্লাহর রাসূল যিনি জমীন ও আকাশ সমূহের একচ্ছত্র মালিক। তিনি ব্যাতীত আর কোন মা‘বুদ নেই, তিনিই জীবন মৃত্যু দান করেন। অতএব, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর নিরক্ষর নবীর প্রতি ঈমান আন, যে আল্লাহ ও তাঁর সকল বাণীর প্রতি বিশ্বাস রাখে। আর তোমরা তার অনুসরণ কর যাতে তোমরা সরল সঠিক পথের সন্ধান লাভ করতে পার”। (সূরা আল-আ‘রাফ: ১৫৮)

 

[চতুর্থ নীতি]

রাসূলুগণের প্রতি ঈমান

আল্লাহর প্রেরিত রাসূলগণের প্রতিও ব্যাপক ও বিশদভাবে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। সুতরাং আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহপাক আপন বান্দাদের প্রতি তাদের মধ্য হতে বহু সংখ্যক রাসূল-শুভসংবাদবাহী, ভীতি প্রদর্শণকারী ও সত্যের পানে আহবায়ক রূপে প্রেরণ করেছেন। যে ব্যক্তি তাদের আহবানে সাড়া দিয়েছে সে সৌভাগ্যের পরশ লাভ করেছে, আর যে তাদের বিরোধিতা করেছে সে হত্যাশা ও অনুশোচনার শিকারে নিপতিত হয়েছে।

রাসূলগণের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ হলেন আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ,তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

“প্রত্যেক জাতির প্রতি আমি রাসূল পাঠিয়েছি এই আদেশ সহকারে যে,তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুতের (শয়তান বা শয়তানী শক্তির) ইবাদত থেকে দূরে থাক”। (সূরা আন-নাহল: ৩৬)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

“আমি তাদর সবাইকে শুভসংবাদবাহী ও সতর্ককারী রাসূল হিসেবে প্রেবণ করেছি যাতে এ রাসূলগণের আগমণের পর মানুষের পক্ষে আল্লাহর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ না থাকে”। (সূরা নিসা-১৬৫)

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:

 “মুহাম্মদ তোমাদের পুরুষদের মধ্যে কারো পিতা নন বরং তিনি তো আল্লাহর রাসূল ও সর্বশেষ নবী”। (সূরা আল-আহ্‌যাব: ৪০)

ঐ সমস্ত নবী –রাসূলগণেরে মধ্যে আল্লাহ যাদের নাম উল্লেখ করেছেন বা যাদের নাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত হয়েছে তাদের প্রতি আমরা বিশদভাবে ও নির্দিষ্ট করে বিশ্বাস স্থাপন করি। যেমন: -হযরত নূহ, হযরত হুদ, হযরত সালেহ, হযরত ইবরাহীম ও অন্যান্য রাসূলগণ। আল্লাহ তাঁদের সকলের উপর, তাদের পরিবারবর্গ ও অনুসারীদের উপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন।

 

[পঞ্চম নীতি]

আখেররাত দিবসের উপর ঈমান

 পরকাল সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রদত্ত যাবতীয় সংবাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন আখেরাতের দিনের উপর ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। মৃত্যুর পর যা কিছু ঘটবে যেমন: কবরের পরীক্ষা, সেখানকার আযাব ও নেয়ামত, রোজা কেয়ামতের ভয়াবহতা ও প্রচন্ডতা, পুলসিরাত, দাঁড়িপাল্লাহ, হিসাব-নিকাশ, প্রতিফল প্রদান, মানুষের মধ্যে তাদের আমলনামা বিতরণ: তখন কেউবা তা ডান হাতে গ্রহণ করবে আবার কেউবা তা বাম হাতে বা পিছনের দিক হতে গ্রহন করবে ইত্যাদি সব কিছুর উপর বিশ্বাস স্থাপন উক্ত ঈমানের আওতাভূক্ত। এতদ্ব্যতীত আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবতরনের জন্য নির্ধারিত হাউজে কাউসার, বেহেশত-দোযখ, মুমিন বান্দাগণ কর্তৃক তাদের প্রভু পাকের দর্শন লাভে এবং তাদের সাথে আল্লাহর কথোপকথনসহ অন্যান্য যা কিছু কুরআনে কারীম ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ রয়েছে তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনও আখেরাতের দিনের উপর ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং উপরোক্ত সব কয়টি বিষয়ের উপর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কর্তৃক নির্দেশিত পন্থায় বিশ্বাস করা আমাদের উপর ওয়াজিব।

 

[যষ্ঠ নীতি]

ভাগ্যের প্রতি ঈমান

ভাগ্যের প্রতি ঈমান বলতে নিম্নোক্ত চারটি বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপনকে বুঝায়:

প্রথমত: এই বিশ্বাস স্থাপন করা যে, অতীতে যা কিছু ছিল এবং বর্তমান বা ভবিষ্যতে যা কিছু হবে তার সবকিছুই আল্লাহ পাকের জানা আছে। তিনি আপন বান্দাদের যাবতীয় অবস্থা সম্পর্কে অবহিত। তাদের রিজিক, তাদের মৃত্যুক্ষণ, তাদের দৈনন্দিন কার্যাবলীসহ অন্যান্য সব বিষয়াদি সম্পর্কে তিনি সম্যক অবগত, কোন কিছুই তাঁর অগোচরে নেই। তিনি পুত-পবিত্র মহান। এ সম্পর্কে আল্লাহপাক বলেন:

“নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেকটি বস্তু সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত”। (সূরা আল আনকাবুত: ৬২)

মহামহিম আল্লাহ আরো বলেন:

“যাতে তোমরা জানতে পার যে, আল্লাহ সব কিছুর উপর শক্তিমান এবং একথাও জানতে পার যে, আল্লাহর জ্ঞান সব কিছুতেই পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে”।(সূরা তালাক-১২)

দ্বিতীয়ত: এই বিশ্বাস স্থাপন করা যে, আল্লাহ পাক যা কিছু নির্দ্ধারণ ও সম্পাদন করেছেন সব কিছুই তাঁর লিখা রয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:

 “পৃথিবী তাদের দেহ থেকে যা কিছু ক্ষয় করে তা আমার জানা আছে এবং আমার নিকট একটি সংরক্ষক কিতাব রয়েছে”। (সূরা ক্বাফ:৪)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

“এবং আমি প্রতিটি বস্তু একটি স্পষ্ট কিতাবে সংরক্ষিত রেখেছি”। (সূরা ইয়াসিন-১২)

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:

 “তোমার কি জানা নেই, আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে আল্লাহ তা অবগত আছেন? নিশ্চয়ই ইহা একটি কিতাবে সংরক্ষিত আছে। ইহা আল্লাহর নিকট অতি সহজ”। (সূরা হজ্জ-৭০)

 তৃতীয়ত: আল্লাহ তা‘আলার কার্যকরী ইচ্ছার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। তিনি যা ইচ্ছা করেন তাই হয় এবং যা ইচ্ছা করেন না তা হয় না। এ সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেন:

“আল্লাহ যা ইচ্ছা তা করেন” (সূরা হজ্জ-১৮)

মহামহীম আল্লাহ আরো বলেন:

“বস্তুত: তিনি যখন কোন কিছুর ইচ্ছা করেন তখন তার কাজ শুধু এই হয় যে, তিনি তাকে বলেন ‘হও’ ফলে তা হয়ে যায়” । (সূরা ইয়াসিন-৮২)

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:

“আর, আসলে তোমদের চাওয়ায় কিছু হয় না, যতক্ষণ না আল্লাহ রাব্বুল আলামীন চাহেন”। (সূরা তাকভীর: ২৯)

চতুর্থত: এই বিশ্বাস রাখা যে, সমগ্র বস্তুজগত আল্লাহ পাকের সৃষ্টি। তিনি ব্যতীত না আেকান স্রষ্টা, না আছে কোন প্রভু-প্রতিপালক।

মহান আল্লাহ বলেন:

“আল্লাহ প্রতিটি বস্তুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই সবকিছুর কর্মবিধায়ক”। (যুমার: ৬২)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

“হে মানব মন্ডলী, তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্বরূপ কর। আল্লাহ ব্যতীত কি তোমাদের কোন স্রষ্টা আছে ! যে তোমাদিগকে আকাশ ও পৃথিবী হতে রিজিক দান করে? তিনি ব্যতীত অন্য কোন মা‘বুদ নেই। সুতরাং তোমরা কোন পথে পরিচালিত হচ্ছো”? (সূরা ফাতির: ৩)

অতএব, ভাগ্যের উপর ঈমান বলতে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মতে উপরোক্ত চারটি বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকেই বুঝায়। পক্ষান্তরে, বিদ্‌আ‘ত পন্থীরা ইহার কোন কোনটি অস্বীকার করে থাকে। উল্লেখযোগ্য যে, আল্লাহর উপর ঈমানের মধ্যে এ বিশ্বাসও অর্ন্তভুক্ত রয়েছে যে, ঈমান মানে কথা ও কাজ যা পূণ্যে বৃদ্ধি এবং পাপে হ্রাস পায়। একথাও ইমানের অন্তর্ভুক্ত যে, কুফরী ও শিরক ব্যতীত কোন কবীরা গুনাহ-যেমন, ব্যভিচার, চুরি, সুদ গ্রহণ, মদ্যপান, পিতামাতার অবাধ্যতা ইত্যাদির জন্য কোন মুসলিমকে কাফের বলা যাবেনা, যতক্ষণ না সে তা হালাল বলে গণ্য করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এতদ্ব্যতীত সবকিছু যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করেন”। (সূরা নিসা-১১৬)

দ্বিতীয় প্রমাণ হলো: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে একাধিক মুতাওয়াতির হাদীসে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা‘আলা পরকালে এমন লোককেও মুক্ত করবেন যার অন্তরে (এ জগতে) শষ্যদানা পরিমাণ ঈমান বিদ্যমান ছিল।

(চলবে – ইনশাল্লাহ)

———————————————————————————————————–

 

Advertisements

5 comments on “সঠিক আকীদা-বিশ্বাস ও যা এর পরিপন্থী – ১

  1. ইসলামী যতগুলো ব্লগ আমি এখন পর্য়ন্ত দেখেছি তার মধ্যে আপনার ব্লটি শেষ্ট ব্লগগুলোর একটি।হয়ত,লিষ্টে প্রথম।আমার শুভকামনা রইল।

    Like

  2. পিংব্যাকঃ সঠিক আকীদা-বিশ্বাস ও যা এর পরিপন্থী – ২ | In Search of Inner Peace | ইসলামিক বাংলা ব্লগ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s