গ্যালারি

ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের তাৎপর্য -ড: আবু আমিনাহ বিলাল ফিলিপস- ২

৪. ইসলামের চতুর্থ স্তম্ভ: সাওমরামাদানের গুরুত্ব: রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “রামাদানের আগমনে জান্নাতের দরজাগুলোকে খুলে দেয়া হয়।” প্রচুর পরিমাণে ভাল কাজ করে জান্নাতের নিকটবর্তী হওয়ার বিরাট সুযোগ আসে রামাদানে।

রামাদানে সিয়াম পালনের মাধ্যমে পূর্ববর্তী গুনাহ মাফ করিয়ে নেয়ার চমৎকার সুযোগ আসে। আবু হুরায়রা (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে উদ্ধৃত করেছেন: “যে রামাদানে বিশুদ্ধ বিশ্বাসের সাথে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদান লাভের আশায় সিয়াম পালন করবে, আল্লাহ তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দিবেন।”

বিশুদ্ধ নিয়তে সিয়াম পালন করলে মন্দের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার আত্মিক শক্তি অর্জিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “রোযা ঢাল স্বরূপ।”

একান্তভাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার জন্য রোযা পালনকারীর জন্য বিশেষ পুরস্কার রয়েছে। একটি হাদীসে কুদসীতে এসেছে আল্লাহ বলেন: “আদম সন্তানের সকল কাজই তার নিজের জন্য, সিয়াম ব্যতীত। এটা শুধুই আমার জন্য, এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।”

রামাদানের এইরূপ মর্যাদার কারণ সম্ভবতঃ এই যে এই মাসে কুরআন নাযিল হয়েছে, যা স্রষ্টার পক্ষ থেকে প্রেরিত সর্বশেষ এবং পৃথিবীতে বিদ্যমান একমাত্র অপরিবর্তিত কিতাব। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কুরআনে উল্লেখ করেছেন:

“রামাদান মাস সেই মাস, যে মাসে মানবজাতির জন্য পথনির্দেশ স্বরূপ কুরআন নাযিল করা হয়েছে। এতে রয়েছে সত্য পথ প্রদর্শনের জন্য বিশুদ্ধ শিক্ষা এবং (সত্য থেকে মিথ্যাকে পার্থক্য করার) মানদন্ড।” (সূরা আল বাক্বারাহ, ২ : ১৮৫)

কুরআন নাযিল মানবজাতির প্রতি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সর্ববৃহৎ অনুগ্রহ, যে মানবজাতি এর পূর্ববর্তী ওহী নাযিল হওয়ার পরবর্তী সময় থেকে নিয়ে অজ্ঞানতার অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিল। তাঁর দয়া নিঃসৃত এই অনুপম অনুগ্রহ ছাড়া হেদায়েতের স্তিমিত-প্রায় আলোটুকুও হারিয়ে যেত এবং গোটা মানবসমাজে প্রতিষ্ঠা হত অন্যায়ের রাজত্ব।

সিয়ামের উদ্দেশ্য: রোযার মূল লক্ষ্য তাকওয়া (আল্লাহ-ভীতি এবং তাঁর সম্পর্কে সচেতনতা) অর্জন। যেমনটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কুরআনুল কারীমে উল্লেখ করেছেন:

“…যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” (সূরা আল বাক্বারাহ, ২ : ১৮৩)

তাকওয়া হচ্ছে সর্বোচ্চ নৈতিক গুণগুলোর একটি, তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে একজন মুসলিম আল্লাহর ক্রোধ এবং নিজের মাঝে একটি ঢাল তৈরী করতে পারে। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহর সমস্ত আদেশ-নিষেধ সম্পর্কে সর্বদা সচেতন থাকা, অর্থাৎ হারাম পরিহার করা, মাকরূহ পরিহার করা এবং এমনকি সন্দেহের অবস্থায় হালালও পরিত্যাগ করা।

বিশেষজ্ঞ ডাক্তারেরা এটাও পরীক্ষা করে দেখেছেন যে রোযা বহুভাবে স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। যেমন এ সময় শরীরে সঞ্চিত অতিরিক্ত কোলেস্টেরল ব্যবহৃত হয়। এভাবে রোযা শরীরকে সবল রাখে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।

বর্তমান মুসলিম সংস্কৃতিতে রোযা: দুঃখজনকভাবে বর্তমান মুসলিম সংস্কৃতিতে রোযা ধর্মীয় চিন্তা-ভাবনা এবং সংযমের পরিবর্তে পরিণত হয়েছে উৎসবের মাসে! রামাদানের রাতগুলি পরিণত হয় পার্টি এবং ভোজের রাত্রিতে যা কিনা কোন কোন দেশে ভোর পর্যন্ত চলে। সেখানে রাত পরিবর্তিত হয় দিনে, দিন পরিবর্তিত হয় রাতে (বহু মানুষই রোযার সময়টুকু ঘুমিয়ে কাটায়)। সাধারণতঃ সেহেরীতে মানুষ হালকা খাবারের বদলে পেট ভরে খায়। ফলে রোযা অবস্থায় খুব কম মানুষই প্রকৃত ক্ষুধার তাড়না বোধ করে। আবার ইফতারীতে আরেক দফা ভরপেট খাওয়া চলে, সেই সাথে রয়েছে রকমারী খাবারের আয়োজন। ফলে অনেকেই রামাদান শেষে ওজন বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করে!

মুসলিম চরিত্রে সাওমের কাঙ্খিত প্রভাব:

  • ক. নিয়ন্ত্রণ: রোযা যেহেতু খাদ্য, পানীয় এবং যৌনাচার থেকে সংযম, তাই এর মাধ্যমে রোযাদারের আত্মনিয়ন্ত্রণের অনুশীলন হয়। প্রকৃতপক্ষে রোযার শিক্ষা অর্জিত হয়েছে কিনা, তা বোঝার মুহূর্তটি হচ্ছে রোযা ভাঙ্গার মুহূর্ত। কেননা এসময় টেবিলে যাবতীয় মজাদার খাবার সাজানো থাকে, তাই রোযা ভেঙ্গেই মুখে প্রচুর পরিমাণে খাবার পোরার ইচ্ছে হয়, কিন্তু একজন মুমিনকে এসময় সংযত থাকতে হবে এবং নামাযের আগে হালকা কিছু মুখে দিতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) তিনটি খেজুর এবং পানি দিয়ে রোযা ভাঙতেন, এবং মাগরিবের নামাযের পর, মাঝারি খাবার খেতেন।  আত্মিক সংযমও রোযার লক্ষ্য। কেবল খাদ্য, পানীয় ইত্যাদিই নয়, রোযাদারকে মিথ্যা বলা, গীবত করা, দুর্নাম করা ইত্যাদি থেকেও বেঁচে থাকতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “যে রোযা অবস্থায় মিথ্যা বলা এবং মিথ্যার ওপর আচরণ করা থেকে বিরত হল না, তার ক্ষুধা এবং তৃষ্ণায় আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।” তিনি (সা) আরও বলেছেন: “তোমাদের কেউ রোযা অবস্থায় যেন অশ্লীল কাজ ও অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে বিরত থাকে, এবং যদি কেউ কোন অশ্লীল কথা শুরু করে কিংবা তর্ক করতে আসে, তবে সে যেন তাকে বলে: ‘আমি রোযাদার।’” তাই উপরোক্ত দিক নির্দেশনা মেনে যে রোযা রাখবে, তার নৈতিক চরিত্রে উন্নতি ঘটবে, সে অধিকতর সত্যবাদী এবং কথা ও কাজে আরও সতর্ক হবে।
  • খ. মধ্যপন্থা: যেহেতু রোযা ভাঙার সময় একজন রোযাদার নিজেকে সংযত রাখে, ফলে তার খাদ্যাভাসে মধ্যপন্থা গড়ে ওঠে, যেমনটি রাসূলুল্লাহ (সা) খাদ্য গ্রহণ সম্পর্কে বলেছেন: “মুমিন এক পেটে, কাফির (যেন) সাত পেটে খায়।” জাবির (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণনা করেন, “একজনের খাদ্য দুইজনের জন্য যথেষ্ট, দুইজনের খাদ্য চারজনের জন্য যথেষ্ট।” ইবন উমার (রা) বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (সা) কাউকে সঙ্গীর অনুমতি ব্যতীত খাওয়ার সময় একেকবারে দুটো করে খেজুর নিতে নিষেধ করেছেন।
  • গ. সহমর্মিতা: রোযা একজন মানুষকে ক্ষুধা এবং তৃষ্ণার প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করায়, ফলে সে দরিদ্রের অবস্থা বুঝতে পারে। এর ফলে তার মাঝে দরিদ্রেকে সহায়তা করার এবং তাদেরকে নিজ সম্পদের ভাগ দেয়ার প্রেরণা সৃষ্টি হয়। আর এই চেতনার নমুনা হিসেবেই ঈদুল ফিতরের দিনে অভাবীকে নির্দিষ্ট পরিমাণে দান করাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

৫. ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ: হাজ্জ্ব

সাধারণতঃ মানুষ দুটি কারণে ভ্রমণ করে থাকে। এক হচ্ছে অর্থ উপার্জনের জন্য, আরেক হচ্ছে বিনোদনের জন্য। এ দুধরনের ভ্রমণই পার্থিব স্বার্থ কেন্দ্রিক। কিন্তু হাজ্জ্ব এ দুই প্রকার ভ্রমণ অপেক্ষা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটা একান্তভাবে আল্লাহর আদেশ পালনের নিমিত্ত করা হয়। বিশুদ্ধ নিয়ত নিয়ে এই ভ্রমণে বের হওয়া তার পক্ষেই কেবল সম্ভব যে সত্যিই আল্লাহকে ভালবাসে এবং ভয় করে ও হাজ্জ্বকে আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত আদেশ বলে মনে করে। ফলে যেই তার পরিবার, আত্মীয়, ব্যবসাকে পেছনে ফেলে অর্থ ব্যয় করে এবং ভ্রমণের ক্লেশ সহ্য করে হাজ্জ্ব করে, সে আল্লাহর প্রতি তার প্রকৃত ভালবাসার প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করে। সে প্রমাণ করে যে সে প্রয়োজনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য যেকোন অবস্থায় নিজের পরিবার ও গৃহকে ত্যাগ করতে, কষ্ট সহ্য করে স্বেচ্ছায় নিজের স্বাচ্ছন্দ্য ও সম্পদ ত্যাগ করতে প্রস্তুত।

হাজ্জ্বে দুই প্রকারের ইবাদত সমন্বিত রয়েছে, ১) শারীরিক পরিশ্রম, যেমনটি নামায ও রোযার ক্ষেত্রে করা হয়, ২) অর্থনৈতিক, যেমনটি যাকাত ও সাদকার ক্ষেত্রে করা হয়। তেমনি হাজ্জ্বের মাধ্যমে একজন মুসলিমের চরিত্রে ইখলাস (একান্তভাবে আল্লাহর জন্য সবকিছু করা), তাকওয়া, বিনয়, আনুগত্য, ত্যাগ এবং আত্মসমর্পণের নৈতিক গুণসমূহ অর্জনের অনুশীলন হয়। কা’বা ঘর তাওয়াফ করা, সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে দৌড়ান, মিনায়, আরাফা এবং মুযদালিফায় ভ্রমণ প্রভৃতি হাজ্জ্বের শারীরিক ইবাদতগুলো নামায ও রোযার শারীরিক পরিশ্রমকে ছাড়িয়ে যায়। তাই সালাত ও সাওমের মাঝে যে আত্মনিয়ন্ত্রণ, বিনম্রতা ও আনুগত্যের শিক্ষা রয়েছে, তাও হাজ্জ্বের আনুষ্ঠানিকতায়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তেমনি হাজ্জ্বের জন্য অর্থ ব্যয় এবং কুরবানীর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য অন্তরকে লোভ-লালসা এবং পৃথিবীর প্রতি আকর্ষণ থেকে মুক্ত করার আত্মিক শিক্ষা পাওয়া যায় যেমনটি নিহিত রয়েছে যাকাত ও সাদকার মাঝে।

হাজ্জ্বের সময় একজন মুসলিম বেশ কয়েক ওয়াক্ত নামায সেই পবিত্র মসজিদটিতে পড়ার সুুযোগ পায়, যার দিকে মুখ করে সে নামায আদায় করে এসেছে গোটা মুসলিম উম্মাহর পাশাপাশি। এই মসজিদে নামায আদায়ের সওয়াব অন্যান্য মসজিদ থেকে অনেক বেশী। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, মাসজিদুল হারামে একটি নামায অন্যত্র এক লক্ষ (১০০০০০) নামাযের সমতুল্য।

কিন্তু হাজ্জ্বে এর চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার রয়েছে। এর মধ্যে দুটি এমন যা প্রত্যেক মুমিনই কামনা করে থাকে: আত্মশুদ্ধি এবং জান্নাতের প্রতিশ্র“তি। এর প্রথমটি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “যে হাজ্জ্বের মধ্যে কোন ধরনের অশোভন কিংবা অবাধ্যতামূলক কাজ না করে আল্লাহর ঘরে হাজ্জ্ব করবে, সে এমন অবস্থায় ঘরে ফিরে আসবে যেন ঐদিনই তার মা তাকে প্রসব করল (অর্থাৎ পাপমুক্ত অবস্থায় ঘরে ফিরবে)।” দ্বিতীয়টি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “মাবরুর (আল্লাহর নিকট যা গৃহীত হয়েছে) হাজ্জ্বের প্রতিদান জান্নাতের চেয়ে কম কিছুই নয়।”

কিন্তু হাজ্জ্বের এই উপকারিতা লাভ করা খুব সহজ নয়। কেবল মাত্র হাজ্জ্বের নিয়মিত আনুষ্ঠানিকতাগুলো পালন করাই এই প্রতিদানের নিশ্চয়তা দেয় না। হাজ্জ্ব কবুল হওয়ার জন্য যিনি হাজ্জ্ব করবেন তাঁর ভিতর প্রকৃত ঈমান থেকে উৎসারিত একপ্রকার আত্মিক প্রেরণা থাকতে হবে। এর ফলে তিনি এমন স্তরে পৌঁছবেন যে হাজ্জ্বের প্রতিটি বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার ভিতর দিয়ে তার উদ্দেশ্য হবে উচ্চতর আত্মিক গুণ অর্জনের লক্ষ্যে উপনীত হওয়া। কেবল মাত্র এরূপ প্রেরণা থাকলেই একজন মানুষ তার হাজ্জ্বকে নষ্ট করে দেয়ার মত সকল ক্রিয়া এবং প্রতিক্রিয়া থেকে বেঁচে থাকতে পারবেন। হাজ্জ্বের সময় একজন হাজ্জ্বকারী বিশ্বের উষ্ণতম স্থানে নিক্ষিপ্ত হন এবং পরিস্থিতি সামলে নেয়ার জন্য খুবই অল্প সময় পান। রকমারি সংস্কৃতি এবং স্বভাবের মানুষ পরস্পরের সান্নিধ্যে আসার ফলে সেখানে ভুল বোঝাবুঝি এবং বিরোধের সম্ভাবনা প্রবল। এছাড়া কিছু সংখ্যক মানুষের অসৎ উদ্দেশ্যে হাজ্জ্বে আসার কারণে হাজ্জ্বের সময় মানসিক আঘাত, শারীরিক কষ্ট ও কাটাছেঁড়া এবং পকেটমারদের এড়ানো একরকম অসম্ভব। কিন্তু সোনা যেভাবে আগুনের স্পর্শে বিশুদ্ধ হয়, তেমনি হাজ্জ্বের সময় দৈহিক, সাংস্কৃতিক এবং মানসিক সংঘর্ষের ভিতর দিয়ে একজন সাধনাকারীর অন্তর বিশুদ্ধতা এবং সমৃদ্ধি লাভ করে। ঘরে বসে থেকে এবং মানুষের ভীড় ও কোলাহল থেকে মুক্ত থেকে একজন ব্যক্তি মাবরুর হাজ্জ্বের উপকারিতা লাভ করার আশা করতে পারে না, কেননা হাজ্জ্ব হচ্ছে মানুষের সাথে সংযোগের ভিতর দিয়ে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের সরণী। রাসূলুল্লাহ (সা) নিঃসঙ্গতা অপেক্ষা সামাজিকতার গুরুত্ব অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন: “যে মুমিন জনগণের সাথে সম্পর্ক রাখে এবং ধৈর্য সহকারে তাদের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত লাঞ্ছনা ও আক্রমণ সহ্য করে, সে ঐ মুমিন অপেক্ষা উত্তম যে কিনা যে জনগণের সাথে মেশে না কিংবা তাদের পক্ষ থেকে কোন আঘাত সহ্য করে না।”

যে হাজ্জ্ব আল্লাহর নিকট গৃহীত হয়, হাজ্জ্বকারীর ওপর তার স্থায়ী প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। তার ভিতর একপ্রকার গভীর আত্মিক পরিবর্তন আসে যা তার জীবনকে নতুন করে (আল্লাহর আনুগত্যের ভিত্তিতে) সাজানোর মাঝে পরিলক্ষিত হয়। মাবরুর হাজ্জ্বের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সচেতনতার ফলে এই ব্যক্তি সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং আত্মিক পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী যে হাতিয়ার, সেই ইসলামকে দর্শন হিসেবে গ্রহণ করার এবং জীবনে বাস্তবায়িত করার প্রতি অন্যদেরকে আহ্বান জানাবে। এরকম পরিবর্তন যদি তার মাঝে দেখা না যায় এবং সে যদি হাজ্জ্বের পরেও পূর্বের অনৈতিক জীবনে প্রত্যাবর্তন করে, তবে বুঝতে হবে তার হাজ্জ্ব আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক গৃহীত হয়নি। এই হাজ্জ্বের ফলে তার দায়িত্ব আদায় হয়েছে বটে, কিন্তু যে উচ্চতর লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য হাজ্জ্বের আচার অনুষ্ঠানগুলো নির্ধারিত ছিল, সেগুলো অর্জিত হয়নি।

বর্তমান মুসলিম সংস্কৃতিতে হাজ্জ্ব: একজন ব্যক্তি বালেগ হওয়া মাত্রই তার ওপর হাজ্জ্ব বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। মুসলিম সংস্কৃতিতে প্রচলিত যে ধারণা যে বৃদ্ধকাল পর্যন্ত হাজ্জ্বকে বিলম্বিত করা উত্তম – তা সম্পূর্ণ ভুল। রাসূলুল্লাহ (সা) এর একটি হাদীসকে ভুল বোঝার ফলে এই ধারণা তৈরী হয়েছে। তিনি (সা) বলেছেন: “যে আল্লাহর নিকট গ্রহণীয় হয়, এমনিভাবে হাজ্জ্ব আদায় করবে, সে এমনিভাবে পাপমুক্ত হয়ে ঘরে ফিরে আসবে, যেন তার মা ঐদিনই তাকে প্রসব করেছে।” এ থেকে কিছু মানুষ ধারণা করে যে হাজ্জ্বকে এমন বয়স পর্যন্ত বিলম্বিত করা উচিৎ, যখন মানুষের কোন ধরনের পাপকাজ করার সামর্থ্যই থাকে না। অথচ হাজ্জ্বকে এভাবে বিলম্বিত করাটা নিজেই একটা পাপ। তাছাড়া যে এভাবে বার্ধক্য পর্যন্ত পাপকাজ করে যাবে বলে মনে মনে ঠিক করে নেয়, তার হাজ্জ্ব আল্লাহর নিকট কবুল না হওয়ারই কথা। বিলম্বিত এই হাজ্জ্ব সাধারণতঃ খুব নি®প্রাণ ও গদবাঁধা হয়ে থাকে, যাতে একাত্মতা থাকে অনুপস্থিত। ফলে এরূপ ব্যক্তিকে দেখা যায় হাজ্জ্ব থেকে ফিরে এসে গায়ে বিশেষ পোশাক (যেমন টুপি) লাগিয়ে এবং নামের শুরুতে “হাজী” লাগিয়ে সদম্ভে ঘোরাঘুরি করতে। কিন্তু তাদের আভ্যন্তরীণ কোন পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় না, যা কিনা এ কথাই প্রমাণ করে যে আল্লাহ তাদের হাজ্জ্ব গ্রহণ করেননি। তেমনি কিছু লোকের জন্য হাজ্জ্ব বাৎসরিক প্রমোদ-ভ্রমণের মত। তাদের জন্য বিশেষ ভাবে “এক্সপ্রেস” হাজ্জ্বের ব্যবস্থা করা হয়, যেন হাজ্জ্বে ন্যূনতম কষ্ট হয়।

মুসলিম চরিত্রে হাজ্জ্বের কাঙ্খিত প্রভাব:

  • ক. বিশ্বজনীনতা: বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দুই মিলিয়ন মুসলিমের বাৎসরিক এই সম্মেলন মুসলিমদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে দৈহিক ও জৈবিক পার্থক্য মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। সকল মানুষই একই জাতির অন্তর্ভূক্ত: মানবজাতি। একজন স্রষ্টাই সবাইকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের জন্য একটি ধর্মই ঠিক করেছেন। হাজ্জ্ব মুসলিমদের আরও মনে করিয়ে দেয় যে বিশ্বে যে রাজনৈতিক বিভক্তি – যার ফলে জাতিগত-রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটেছে, তা কখনই মুসলিম উম্মাহর ভ্রাতৃত্যবোধকে ছাড়িয়ে যেতে পারে না। যে ধরনের জাতীয়তাবোধ পাকিস্তানবাসীকে পাকিস্তানের ক্রিকেট দল এবং ভারতবাসীকে ভারতীয় ক্রিকেট দলের সমর্থন করতে উদ্বুদ্ধ করে, কিংবা মিশর ও সৌদি-আরবের ফুটবল খেলায় নিজ নিজ দেশের লোকদেরকে দুদলে বিভক্ত করে দেয়, সে ধরনের জাতীয়তাবোধ হাজ্জ্বের মাধ্যমে প্রাপ্ত ভ্রাতৃত্ববোধের শিক্ষা এবং উম্মাহর প্রতি দায়িত্ববোধের শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত। যদিও দেশপ্রেম থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু এ ধরনের অনুভূতি এমন মাত্রায় হওয়া উচিৎ নয়, যে অবস্থায় মানুষ তার জাতি, গোত্র কিংবা পরিবারকে সমর্থন করে, যদিও তারা ভুল পথে থাকে। জুনদুব (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে উদ্ধৃত করেছেন: “যে অন্ধভাবে গোত্রবাদকে সমর্থনকারী কিংবা গোত্রবাদের দিকে আহবানকারী আন্দোলনে নিহত হয়, সে জাহিলিয়াতের মৃত্যুবরণ করে।”
  • খ. ধৈর্যশীলতা: কোন একটি নির্দিষ্ট স্থানে একই আনুষ্ঠানিকতা পালনের উদ্দেশ্যে বহুলোক জড় হলে সেখানে দুর্ঘটনা ঘটা স্বাভাবিক। একে অপরের পায়ে পাড়া দেয়া কিংবা পাশের ব্যক্তির কনুইয়ের খোঁচায় ব্যথা পাওয়ার মত ঘটনা খুবই স্বাভাবিক। এরূপ অবস্থায় মানুষ সাধারণতঃ তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে থাকে। কিন্তু একজন হাজ্জ্বকারীকে তার হাজ্জ্ব কবুল হওয়ার জন্য অন্যদের দেয়া এইসব আঘাত চুপ করে সহ্য করতে হয়, ফলে সে ধৈর্যের শিক্ষা লাভ করে।

সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ:

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s