গ্যালারি

যাকাত ও যাকাতের উপকারিতা

যাকাত ইসলামের পাঁচটি ফরযের একটি। কালিমায়ে শাহাদাত ও সালাতের পর যাকাতের স্থান। কুরআন-হাদিস ও মুসলিমের ইজমা দ্বারা এর ফরযিয়্যাত প্রমাণিত। যাকাতের ফরযিয়্যাত অস্বীকারকারী কাফের ও ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত মুরতাদ। তাকে তওবার জন্য বলা হবে, যদি তওবা করে গ্রহণ করা হবে, অন্যথায় তাকে হত্যা করা। আর যাকাতের ব্যাপারে যে কৃপণতা করল অথবা কম আদায় করল সে যালেমদের অন্তর্ভুক্ত ও আল্লাহর শাস্তির উপযুক্ত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

“আর আল্লাহ যাদেরকে তাঁর অনুগ্রহ থেকে যা দান করেছেন তা নিয়ে যারা কৃপণতা করে তারা যেন ধারণা না করে যে, তা তাদের জন্য কল্যাণকর। বরং তা তাদের জন্য অকল্যাণকর। যা নিয়ে তারা কৃপণতা করেছিল, কিয়ামত দিবসে তা দিয়ে তাদের বেড়ি পরানো হবে। আর আসমানসমূহ ও যমীনের উত্তরাধিকার আল্লাহরই জন্য। আর তোমরা যা আমল কর সে ব্যাপারে আল্লাহ সম্যক জ্ঞাত”। সূরা আলে-ইমরান: (১৮০)

সহিহ বুখারিতে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহ যাকে সম্পদ দান করেছেন, অতঃপর সে তার যাকাত প্রদান করল না, কিয়ামতের দিন তার জন্য বিষধর সাপ সৃষ্টি করা হবে, যার দুটি চোঁয়াল থাকবে, যা দ্বারা সে তাকে কিয়ামতের দিন পেঁছিয়ে ধরবে, অতঃপর তার দু’চোয়াল পাকড়ে বলবে: আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার সঞ্চিত ধন”।[1] আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

“এবং যারা সোনা ও রূপা পুঞ্জীভূত করে রাখে, আর তা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না, তুমি তাদের বেদনাদায়ক আযাবের সুসংবাদ দাও। যেদিন জাহান্নামের আগুনে তা গরম করা হবে, অতঃপর তা দ্বারা তাদের কপালে, পার্শ্বে এবং পিঠে সেঁক দেয়া হবে। (আর বলা হবে) ‘এটা তা-ই যা তোমরা নিজদের জন্য জমা করে রেখেছিলে, সুতরাং তোমরা যা জমা করেছিলে তার স্বাদ উপভোগ কর”। [সূরা আত-তওবা: (৩৪-৩৫)]

সহিহ মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

“স্বর্ণ ও রূপার এমন কোন মালিক নেই, যে এর হক প্রদান করে না, যার জন্য কিয়ামতের দিন আগুনের পাত তৈরি করা হবে না, যা জাহান্নামের আগুনে তাপ দিয়ে অতঃপর তার পার্শ্ব, কপাল ও পৃষ্ঠদেশ সেক দেয়া হবে। যখন যখন তা ঠাণ্ডা হবে গরম করা হবে, সে দিনের পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছর, যতক্ষণ না বান্দাদের ফয়সালা সমাপ্ত হয়”।[2]

যাকাতের রয়েছে দ্বীনি, চারিত্রিক ও সামাজিক বহুবিধ উপকার, যেমন:

দ্বীনি ফায়দা:

  • ১. যাকাত ইসলামের এক বিশেষ রোকন, যার উপর বান্দার দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ নির্ভর করে।
  • ২. অন্যান্য ইবাদতের ন্যায় যাকাত বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্য প্রদান করে ও তার ঈমান বৃদ্ধি করে।
  • ৩. যাকাত আদায়ের ফলে প্রভূত কল্যাণ লাভ হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

    “আল্লাহ সুদকে মিটিয়ে দেন এবং সদাকাকে বাড়িয়ে দেন”।

    সূরা বাকারা: (২৭৬)] আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:

    “আর তোমরা যে সূদ দিয়ে থাক, মানুষের সম্পদে বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য তা মূলতঃ আল্লাহর কাছে বৃদ্ধি পায় না। আর তোমরা যে যাকাত দিয়ে থাক আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে (তাই বৃদ্ধি পায়) এবং তারাই বহুগুণ সম্পদ প্রাপ্ত”। [সূরা রূম: (৩৯)]

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

    “হালাল উপার্জন থেকে যে খেজুর পরিমাণ সদকা করল, আর আল্লাহ হালাল ব্যতীত গ্রহণ করেন না, আল্লাহ তা ডান হাতে গ্রহণ করেন, অতঃপর সদকাকারীর জন্য তা বৃদ্ধি করতে থাকেন, যেমন তোমরা অশ্বশাবক লালন কর অতঃপর পাহাড়ের ন্যায় পরিণত হয়”।[3]

  • ৪. যাকাত দ্বারা আল্লাহ পাপসমূহ দূরীভূত করেন, যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

    “সদকা পাপ মোচন করে দেয়, যেমন পানি আগুন নির্বাপিত করে দেয়”।[4]

    এখানে সদকা দ্বারা উদ্দেশ্য যাকাত-নফল সদকা উভয়।

যাকাতের চারিত্রিক ফায়দা:

  • ১. যাকাত ব্যক্তিকে দানশীল ও বদান্যদের কাতারে শামিল করে।
  • ২. যাকাত প্রমাণ করে, যাকাত আদায়কারী অভাবীদের প্রতি রহম, দয়া ও অনুগ্রহশীল, আর আল্লাহ দয়াশীলদের উপর দয়া করেন।
  • ৩. আমাদের অভিজ্ঞতা যে, মুসলিমদের উপর আর্থিক ও শারীরিক সেবা প্রদান অন্তঃকরণকে প্রশস্ত ও প্রফুল্ল করে এবং মানুষের নিকট যাকাত দাতাকে প্রিয় ও ঘনিষ্ঠ করে তুলে।
  • ৪. যাকাতে রয়েছে লোভ ও কৃপণতা থেকে মুক্তি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

    “তাদের সম্পদ থেকে সদাকা নাও। এর মাধ্যমে তাদেরকে তুমি পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে”। [সূরা তওবা: (১০৩)]

যাকাতের সামাজিক উপকারিতা:

  • ১. যাকাতের ফলে অভাবীদের অভাব দূর হয়, দুনিয়ার অধিকাংশ জায়গায় যাদের সংখ্যাই বেশী।
  • ২. যাকাতের ফলে মুসলিমদের শক্তি অর্জন হয় ও তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়, কারণ যাকাতের একটি খাত জিহাদ।
  • ৩. যাকাত গরীবদের অন্তর থেকে ধনীদের প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষ দূর করে দেয়। কারণ গরীবরা যখন দেখে ধনীরা তাদের সম্পদ দ্বারা যাবতীয় প্রয়োজন পুরো করে, কিন্তু তাদের সম্পদ থেকে তারা কোনভাবে উপকৃত হয় না, এ কারণে অনেক সময় ধনীদের প্রতি তাদের অন্তরে হিংসা ও বিদ্বেষের জন্ম নেয়, যেহেতু ধনীরা তাদের অধিকার রক্ষা করে না, তাদের কোন প্রয়োজনে তারা সাড়া দেয় না, কিন্তু ধনীরা যদি বছর শেষে গরীবদের যাকাত দেয়, তাহলে তাদের অন্তর থেকে এসব বিষয় দূরীভূত হয় এবং উভয় শ্রেণীর মধ্যে মহব্বত ও ভালবাসার সৃষ্টি হয়।
  • ৪. যাকাতের ফলে সম্পদ বৃদ্ধি পায় ও তাতে বরকত হয়। যেমন হাদিসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

    “কোন সদকা সম্পদ হ্রাস করেনি”।[5]

    অর্থাৎ সদকার ফলে যদিও সম্পদের অংক কমে, কিন্তু তার বরকত ও ভবিষ্যতে তার বৃদ্ধি কমে না, বরং আল্লাহ তার সম্পদে বরকত দেন ও তার বিনিময়ে অধিক দান করেন।

  • ৫. যাকাতের ফলে সম্পদে বরকত হয় ও তা বৃদ্ধি পায়। কারণ সম্পদ যখন খরচ করা হয়, তখন তার পরিধি বৃদ্ধি পায় ও মানুষ উপকৃত হয়, ধনীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ও গরীবরা তা থেকে বঞ্চিত হলে যা হয় না।

অতএব এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় ব্যক্তি ও সমাজ বিনির্মাণে যাকাত অপরিহার্য।

যাকাত নিদিষ্ট সম্পদের উপর ওয়াজিব হয়, যেমন স্বর্ণ ও রূপা, শর্ত হচ্ছে এর নিসাব পূর্ণ হতে হবে। স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ, আর রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা বা তার সমপরিমাণ অর্থের মালিক হলে যাকাত ওয়াজিব হবে। স্বর্ণ ও রূপা অলংকার বা যে অবস্থাতে থাক, তাতে যাকাত ওয়াজিব হবে। অতএব নারীর পরিধেয় অলংকারের উপর যাকাত ওয়াজিব যদি তা নিসাব পরিমাণ হয়, সে নিজে পরিধান করুক বা অন্যকে পরিধান করতে দিক। কারণ দলিলের ব্যাপকতা এটাই প্রমাণ করে। দ্বিতীয়ত কতক নির্দিষ্ট দলিল আছে, যা থেকে প্রমাণিত হয় অলংকারের উপর যাকাত ওয়াজিব, যদিও তা ব্যবহারের হয়, যেমন আব্দুল্লাহ ইবন আমর ইবন আস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, জনৈক নারী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আগমন করে, তার হাতে ছিল স্বর্ণের দু’টি চুড়ি, তিনি বললেন: “তুমি এগুলোর যাকাত দাও?”। সে বলল: না। তিনি বললেন: “তুমি কি পছন্দ কর আল্লাহ এগুলোর পরিবর্তে তোমাকে জাহান্নামের দু’টি চুড়ি পরিধান করান?। সে তা নিক্ষেপ করে বলল: এগুলো আল্লাহ ও তার রাসূলের জন্য।[6]

আরো যেসব জিনিসের উপর যাকাত ওয়াজিব তন্মধ্যে রয়েছে: ব্যবসায়ী সম্পদ, অর্থাৎ ব্যবসার জন্য রক্ষিত সম্পদ যেমন জমিন, গাড়ি, চতুষ্পদ জন্তু ও অন্যান্য সম্পদ। এগুলোতে এক-দশমাংশের চার ভাগের এক ভাগ যাকাত ওয়াজিব, অর্থাৎ চল্লিশ ভাগের একভাগ। বছর শেষে হিসাব কষে তা বের করবে, তখন তার মূল্য কেনার দামের চেয়ে কম হোক অথবা বেশী হোক অথবা সমান সমান।

কিন্তু যেসব সম্পদ সে নিজের প্রয়োজন অথবা ভাড়া দেয়ার জন্য রেখেছে, তাতে যাকাত ওয়াজিব হবে না, কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “মুসলিমের উপর তার গোলাম ও ঘোড়ার সদকা নেই”।[7] তবে ভাড়ার উপার্জনে যাকাত আসবে, যদি বছর পূর্ণ হয়।

অনুরূপভাবে স্বর্ণ বা রৌপ্যের অলঙ্কারেও যাকাত আসবে, যেমনটি পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।

 যাকাতের হকদার প্রসঙ্গে

যাদের মধ্যে যাকাত বণ্টন করতে হবে, তারাই যাকাতের হকদার। আল্লাহ তা‘আলা নিজে এদের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন:

“নিশ্চয় সদাকা হচ্ছে ফকীর ও মিসকীনদের জন্য এবং এতে নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্য, আর যাদের অন্তর আকৃষ্ট করতে হয় তাদের জন্য; (তা বণ্টন করা যায়) দাস আযাদ করার ক্ষেত্রে, ঋণগ্রস্তদের মধ্যে, আল্লাহর রাস্তায় এবং মুসাফিরদের মধ্যে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়”। ]সূরা তওবা: (৬০)]

সুতরাং যাকাতের খাত আটটি:

  • ১. ফকির: যাদের নিকট তাদের প্রয়োজনের অর্ধেকও নেই। বছরের ছয় মাস যে নিজের ও পরিবারের খরচের বহনে অক্ষম সেই ফকির। তার ও তার পরিবারের এক বছরের প্রয়োজন মোতাবেক তাকে যাকাত দেয়া হবে।
  • ২. মিসকিন: যাদের নিকট তাদের প্রয়োজনের অর্ধেক বা তার চেয়ে অধিক রয়েছে, কিন্তু পূর্ণ বছরের খোরাক নেই, এদেরকে যাকাত থেকে অবশিষ্ট বছরের খাদ্য দেয়া যাবে।যদি কোন ব্যক্তির নিকট নগদ অর্থ নেই, কিন্তু তার অন্য উৎস, অথবা চাকুরী অথবা সামর্থ রয়েছে, যা তার প্রয়োজন পূরণে যথেষ্ট, তাকে যাকাতের অর্থ দেয়া যাবে না। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

    “ধনী ও কর্মঠ ব্যক্তিদের জন্য যাকাতে কোন অংশ নেই”।[8]

  • ৩. যাকাত উসুলে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ: যাদেরকে সরকার যাকাত উত্তোলন, যাকাত বিতরণ ও যাকাত সংরক্ষণের জন্য নিয়োগ দেয়, তাদেরকে তাদের কর্ম মোতাবেক যাকাত থেকে পারিশ্রমিক দেয়া যাবে, যদিও তারা ধনী হয়।
  • ৪. ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য বিশেষ ব্যক্তিবর্গ: যারা কোন সম্প্রদায়ের সরদার, যাদের ঈমান দুর্বল, তাদের ঈমানের দৃঢ়তা বৃদ্ধির জন্য যাকাত থেকে তাদেরকে দেয়া যাবে, যেন তারা ইসলামের প্রতি আহ্বানকারী ও তার আদর্শ ব্যক্তিরূপে গড়ে উঠে। আর যদি দুর্বল ঈমানদার ব্যক্তি সরদার না হয়ে সাধারণ হয়, তার ঈমানের দৃঢ়তা বৃদ্ধির জন্য যাকাত দেয়া যাবে কি-না?কতক আলেম বলেন তাকে যাকাতের অর্থ দেয়া যাবে, কারণ দ্বীনের স্বার্থ শরীরের স্বার্থের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ ফকিরকে যখন তার শরীরের প্রয়োজনে খাদ্যরূপে যাকাত দেয়া বৈধ, তাহলে তার অন্তরের খাদ্যরূপে ঈমান অধিক উপকারী। কতক আলেম বলেছেন তাকে যাকাত দেয়া যাবে না, কারণ তার ঈমানের দৃঢ়তা বৃদ্ধিতে শুধু ব্যক্তি স্বার্থ বিদ্যমান, যা শুধু তার সাথেই খাস।
  • ৫. গর্দান মুক্ত করা: অর্থাৎ যাকাতের অর্থে গোলাম খরিদ করা ও আযাদ করা, চুক্তিবদ্ধদের মুক্ত হতে সাহায্য করা এবং মুসলিম বন্দীদের মুক্ত করার জন্য যাকাতের অর্থ ব্যয় করা।
  • ৬. ঋণগ্রস্ত: যাদের নিকট তাদের ঋণ পরিশোধ করার অর্থ নেই, তাদের ঋণ পরিমাণ অর্থ কম/বেশী যাকাত থেকে দেয়া যাবে, যদিও তাদের খাদ্যের অভাব না থাকে। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যদি এমন হয়, যার নিজের ও পরিবারের খাদ্যের ব্যবস্থা আছে, কিন্তু ঋণ পরিশোধ করার সামর্থ তার নেই, তাকে ঋণ পরিমাণ যাকাত দেয়া যাবে। কিন্তু ঋণী ব্যক্তি থেকে ঋণ মৌকুফ করে যাকাতের নিয়ত করলে যাকাত শুদ্ধ হবে না।যদি পিতা-মাতা অথবা সন্তান ঋণগ্রস্ত হয়, তাদেরকে যাকাতের অর্থ দেয়া যাবে কি না, এ ব্যাপারে আলেমদের দ্বিমত রয়েছে, বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী তাদেরকে যাকাত দেয়া বৈধ।যাকাত আদায়কারী ঋণদাতার কাছে গিয়ে ঋণগ্রস্তের পক্ষ থেকে তার হক আদায় করে দিতে পারবে যদিও ঋণগ্রস্ত তা না জানে। তবে শর্ত হচ্ছে যাকাত আদায়কারীকে নিশ্চিতভাবে জানতে হবে যে, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি ঋণ পরিশোধে অক্ষম।
  • ৭. ফি সাবিলিল্লাহ বা আল্লাহর রাস্তা: অর্থাৎ আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য যাকাত দেয়া যাবে। অতএব মুজাহিদদেরকে তাদের প্রয়োজন মোতাবেক যাকাতের অর্থ দেয়া জায়েয। যাকাতের অর্থ দিয়ে জিহাদের অস্ত্র খরিদ করাও বৈধ।আল্লাহর রাস্তার একটি হচ্ছে, শর‘য়ী ইলম। সুতরাং শর‘য়ী জ্ঞান অন্বেষণকারীকে তার প্রয়োজন মোতাবেক কিতাব ইত্যাদি ক্রয় করার জন্য যাকাতের অর্থ দেয়া বৈধ, তবে সে সচ্ছল হলে ভিন্ন কথা।
  • ৮. ইবন সাবিল: অর্থাৎ মুসাফির, যার পথ খরচ শেষ হয়ে গেছে, তাকে যাকাত থেকে বাড়িতে পৌঁছার অর্থ দেয়া যাবে।এরা সবাই যাকাতের খাত ও হকদার। আল্লাহ স্বয়ং কুরআনে এদের উল্লেখ করেছেন। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফরয, যা তিনি স্বীয় জ্ঞান ও প্রজ্ঞা থেকে তার বান্দাদের উপর ফরয করেছেন।

এ খাতসমূহ ব্যতীত অন্য কোন খাতে যাকাত ব্যয় করা যাবে না, যেমন, মসজিদ নির্মাণ অথবা রাস্তাঘাট তৈরী বা মেরামত; কেননা আল্লাহ যাকাতের খাত সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। নির্দিষ্ট করার পরার পর তা আর অনির্দিষ্ট খাতে দেয়া যায় না।

আমরা যাকাতের এসব খাত নিয়ে চিন্তা করলে দেখতে পাই, এদের কেউ যাকাতের মুখাপেক্ষী, আবার কেউ আছে যার মুখাপেক্ষী মুসলিম উম্মাহ। এখান থেকে আমরা যাকাত ওয়াজিবের হিকমত বুঝতে পারি। অর্থাৎ এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে একটি সুশৃঙ্খল ও সুন্দর সমাজ গঠন করা। ইসলাম সম্পদ ও সম্পদের উপর ভিত্তি-করা স্বার্থকে গৌণভাবে দেখে নি। আবার ইসলাম লোভী, কৃপণ আত্মাকে তার প্রবৃত্তি ও কৃপণতার উপর ছেড়ে দেয় নি, বরং ইসলাম হচ্ছে, সর্বোত্তম কল্যাণের পথ-প্রদর্শক এবং জাতিসমূহের সর্বোৎকৃষ্ট সংশোধনকারী।

  যাকাতুল ফিতর প্রসঙ্গে

যাকাতুল ফিতর ফরয। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  রমযান শেষে ঈদুল ফিতরের সময় তা ফরয করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবন ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন:

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোলাম, স্বাধীন, পুরুষ, নারী, ছোট-বড় সকল মুসলিমের উপর সদকাতুল ফিতর ফরয করেছেন”।[9]

সদকাতুল ফিতরের পরিমাণ এক ‘সা’, দেশের প্রচলিত খাদ্য থেকে তা পরিশোধ করতে হবে। আবু সায়িদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:

“আমরা ঈদুল ফিতরের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে এক ‘সা’ খাদ্য প্রদান করতাম, তখন আমাদের খাদ্য ছিল গম, কিশমিশ, পনির ও খেজুর”।[10]

অতএব টাকা, বিছানা, পোশাক ও জীব জন্তুর খাদ্য দ্বারা সদকাতুল ফিতর আদায় হবে না, কারণ এটা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশের বিপরীত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

“যে এমন আমল করল, যার উপর আমাদের আদর্শ নেই তা পরিত্যক্ত”।[11]

এক ‘সা’ এর পরিমাণ হচ্ছে, দুই কেজি চল্লিশ গ্রাম ভালো গম। এটা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ‘সা’, যার দ্বারা তিনি সদকাতুল ফিতর নির্ধারণ করেছেন।

ঈদের সালাতের আগে সদকাতুল ফিতর বের করা ওয়াজিব, তবে উত্তম হচ্ছে ঈদের দিন সালাতের পূর্বে সদকাতুল ফিতর আদায় করা। ঈদের একদিন বা দু’দিন পূর্বেও দেয়া আদায় করা বৈধ। সালাতের পরে দিলে আদায় হবে না। আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত:

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম “বেহুদা ও অশ্লীলতা থেকে সওমকে পবিত্র করা ও মিসকিনদের খাদ্য স্বরূপ সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব করেছেন। যে তা সালাতের পূর্বে আদায় করল, সেটাই গ্রহণযোগ্য সদকা, আর যে তা সালাতের পরে আদায় করল, সেটা অন্যান্য সদকার ন্যায় সাধারণ সদকা”।[12]

আর যদি কেউ ঈদের সালাত শেষ হয়ে যাওয়ার পর ঈদ সম্পর্কে জানতে পারে, অথবা সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হওয়ার সময় মরুভূমিতে থাকে, অথবা এমন জায়গায় থাকে যেখানে সদকা গ্রহণ করার কেউ নেই, তাহলে সুযোগ মত আদায় করলেই হবে। আল্লাহ ভাল জানেন।

আর আল্লাহ আমাদের নবী মুহাম্মাদ ও তার পরিবার ও সাহাবীদের উপর দুরুদ ও সালাম পাঠান।


[1] বুখারি: (৮৪০৩)

[2] মুসলিম: (৯৮৭)

[3] বুখারি: (১৪১০), মুসলিম: (১০১৬)

[4] সুনানে তিরমিযি: (২৬১৬), তিরমিযি হাদিসটি সহিহ বলেছেন। ইবন মাজাহ: (৯৩৭৩), মুসনাদে ইমাম আহদ: (৩/৩২১)

[5] মুসলিম: (২৫৮৮), তিরমিযি: (২০২৯), আমহদ: (৩/৩২১)

[6] আবু দাউদ: (১৫৬৩), তিরমিযি: (৬৩৭), নাসায়ি: (২৪৭৯)

[7] বুখারি: (১৪৬৪), মুসলিম, কিতাবুয যাকাত: (৮)

[8] আবু দাউদ: (১৬৩৩), নাসায়ি: (২৫৯৮), আহমদ: (৪/২২৪)

[9] বুখারি: (১৫১১), মুসলিম: (৯৮৪)

[10] বুখারি: (১৫১০)

[11] বুখারি: (২০), (২৬৯৭), মুসলিম: (১৭১৮), আবু দাউদ: (৪৬০৬), ইবন মাজাহ: (১৪), আহমদ: (২/১৪৬)

[12] আবু দাউদ: (১৬০৯), ইবন মাজাহ: (১৮২৭), হাকেম: (১/৪০৯), হাকিম হাদিসটি সহিহ বলেছেন এবং ইমাম যাহাবি তার সমর্থন করেছেন।

সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ:

Advertisements

One comment on “যাকাত ও যাকাতের উপকারিতা

  1. আসসালামু আলাইকুম। যাকাত সম্পর্কে সুন্দর ভাবে উপস্থাপণ করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। খোদা হাফেজ।

    Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s