গ্যালারি

ইঞ্জিল শরীফের আলোকে ঈসা মাসীহের পরিচয় – ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর

(এ পুস্তিকায় বাইবেলের সকল উদ্ধৃতি বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি প্রকাশিত কেরি বাইবেল থেকে গৃহীত। প্রয়োজনে ইংরেজি অথোরাইয্ড ভার্শন (KJV/AV) ও রিভাইয্ড স্টান্ডার্ড ভার্শনের (RSV) ভাষ্য উল্লেখ করা হয়েছে)প্রচলিত বাইবেল বা ইঞ্জিল শরীফে ঈসা মাসীহ (আ) সম্পর্কে অনেক খারাপ কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সামান্য কয়েকটি বিষয় এখানে উল্লেখ করছি:

(১) নিরপরাধকে অভিশাপ

f5যীশু তাঁর যুগের ইহূদীদেরকে বলেন, অতীতকাল থেকে নিহত সকল ধার্মিকের হত্যার দায় তাদের উপর: “যেন পৃথিবীতে যত ধার্মিক লোকের রক্তপাত হইয়া আসিতেছে, সেই সমস্ত তোমাদের উপরে বর্তে, ধার্মিক হেবলের রক্তপাত অবধি, বরখিয়ের পুত্র যে সখরিয়কে তোমরা মন্দিরের ও যজ্ঞবেদির মধ্যস্থানে বধ করিয়াছিলে, তাঁহার রক্তপাত পর্যন্ত। আমি তোমাদিগকে সত্য কহিতেছি, এই কালের লোকদের উপরে এই সমস্তই বর্তিবে।” (মথি ২৩/৩৫-৩৬)

প্রিয় পাঠক, একটু চিন্তা করুন, একের অপরাধে অন্যের শাস্তি হবে কেন? বাইবেলের বিধান: “যে প্রাণী পাপ করে, সেই মরিবে; পিতার অপরাধ পুত্র বহন করিবে না, ও পুত্রের অপরাধ পিতা বহন করিবে না; ধার্মিকের ধার্মিকতা তাহার উপর বর্তিবে, ও দুষ্টের দুষ্টতা তাহার উপর বর্তিবে।” (যিহিষ্কেল ১৮/২০)

তাহলে কীভাবে পূর্ববর্তী খুনিদের খুনের দায় পরবর্তী মানুষদের উপর বর্তায়? এরূপ অযৌক্তিক ও অমানবিক কথা কি ঈসা মাসীহ বলতে পারেন?

(২) নির্বোধের মত পাপাচার

  • ক. ঈসা মাসীহ ক্ষুধার্ত হয়ে ডুমুর গাছ দেখে ফলের আশায় গাছ তলায় যান। তখন ডুমুর ফলের মৌসুম নয়। তবুও তিনি গাছে ফল খুঁজতে থাকেন। ফল না পেয়ে অভিশাপ দিয়ে গাছটিকে মেরে ফেলেন। (মথি ২১/১৮-২১, মার্ক ১১/১২-২২)প্রিয় পাঠক, একটু ভাবুন! ভাদ্র মাস আমের সময় নয়। কোনো ২৫/৩০ বৎসর বয়স্ক মূর্খ বাঙালীও কি ভাদ্র মাসে আম গাছে আম খেতে উঠবেন? মালিকের অনুমতি ছাড়া ফল খাওয়া কি পাপ নয়? খৃস্টানগণ দাবি করেন যে, যীশু ঈশ্বরের পুত্র ঈশ্বর। একজন ঈশ্বর জানতে পারলেন না যে ডুমুর গাছটিতে ডুমুর নেই!এর চেয়েও ভয়ঙ্কর একটি প্রাণকে বিনষ্ট করা। আশ্বিন মাসে আম গাছে আম না থাকা কি গাছের অপরাধ? আদৌ গাছে ফল না থাকা কি গাছের অপরাধ? তাহলে এজন্য একটি গাছকে অভিশাপ দিয়ে হত্যা করা কি মহাপাপ নয়? পরের দ্রব্য ধ্বংস করা কি মহাপাপ নয়? যীশুর অলৌকিক ক্ষমতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতো যে, তিনি ডুমুরগাছটির ফলের জন্য প্রার্থনা করতেন এবং গাছটি তৎক্ষণাৎ ফলে পূর্ণ হতো। এরপর তিনি ফল ভক্ষণ করতেন। কারামত দিয়ে গাছে ফল না ধরিয়ে গাছ পুড়িয়ে মারা ভয়ঙ্কর নির্বুদ্ধিতা ও পাপের কাজ। যীশু কি এরূপ পাপে লিপ্ত হতেন? না ইঞ্জিলের মধ্যে জালিয়াতগণ এ সকল গল্প ঢুকিয়েছে?জালিয়াতির একটি বড় প্রমাণ, ঘটনাটি দু ইঞ্জিলে দুভাবে লেখা হয়েছে। মথি ২১/১৮-২১ ও মার্ক ১১/১২-২২ মিলিয়ে দেখলেই বৈপরীত্য দেখতে পাবেন।
  • খ. যীশু এক পাগলের অনেকগুলি ভূত বের করে একপাল শূকরের দেহে প্রবেশ করান; এতে শূকরগুলি সমূদ্রে ডুবে মরে। “সেই স্থানে পর্বতের পার্শে এক বৃহৎ শূকরপাল চরিতেছিল। তাহারা (ভূতগুলি) বিনতি করিয়া কহিল ঐ শূকরগুলির মধ্যে প্রবেশ করিতে আমাদিগকে পাঠাইয়া দিউন। তিনি তাহাদিগকে অনুমতি দিলেন। তখন সেই অশুচি আত্মারা বাহির হইয়া শূকরদের মধ্যে প্রবেশ করিল; তাহাতে সেই শূকর-পাল, কমবেশ দুই হাজার শূকর, মহাবেগে দৌড়িয়া ঢালু পাড় দিয়া সমুদ্রে গিয়া পড়িল এবং সমুদ্রে ডুবিয়া মরিল। তখন যাহারা সেইগুলি চরাইতেছিল, তাহারা পলায়ন করিয়া…।” (মার্ক ৫/১০-১৪)প্রিয় পাঠক, একটু চিন্তা করুন! পরের সম্পদ নষ্ট করা এবং বিনা অপরাধে দুহাজার প্রাণীকে বধ করা! কোনো বিবেকবান মানুষ কি জিনভুত ছাড়ানোর নামে এরূপ পাগলামি করবেন? যীশু কি পারতেন না যে, তিনি পাগলটির ভূতগুলিকে সমুদ্রে পাঠিয়ে দেবেন? অথবা এক জন মানুষের ভূতগুলিকে একটি শূকরের মধ্যে প্রবেশ করাবেন? তাহলে তিনি শূকরের মালিকদেরকে এ বিশাল ক্ষতির মধ্যে ফেললেন কেন? অকারণে এতগুলি প্রাণীকে হত্যার মত মহাপাপে লিপ্ত হলেন কেন? এগুলি কি ঈসা মাসীহের নামে জালিয়াতি নয়?পাঠক, হয়ত কেউ বলতে পারেন: যীশু অ-ইস্রায়েলীয় মানুষদেরকে শূকর ও কুকুর বলে আখ্যায়িত করেছেন (মথি ৭/৬, ১৫/২২-২৮, মার্ক ৭/২৫-২৯) আর এখানে তিনি ২ হাজার শূকর বিনা কারণে হত্যা করলেন। এজন্যই বোধহয় আমেরিকা-ইউরোপের খৃস্টানগণ বিনা কারণে বোমা মেরে বা ড্রোন হামলা করে ইরাক, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সোমালিয়া, ইয়েমন ও অন্যান্য দেশে শতশত বা হাজার হাজার মানুষ হত্যা করতে মোটেও কষ্ট পান না। কারণ যীশুর মতে বাঙালী, পাকিস্তানী ও অন্যান্য সকলেই “শূকর ও কুকুর”। আর ইচ্ছামত ২/৪ হাজার শূকর বা কুকুর হত্যা করা বাইবেলীয় ঈসা মাসীহের সুন্নাত। প্রচলিত ইঞ্জিলকে সঠিক বললে এরূপ কথা বলা কি অসম্ভব?

(৩) প্রচলিত ইঞ্জিলের আলোকে ঈসা কোনোভাবেই মাসীহ হতে পারেন না

মাসীহ অর্থ কোনো অলৌকিক ব্যক্তিত্ব বা ক্ষমতা নয়। মাসীহ অর্থ ‘অভিষিক্ত’ বা আল্লাহর বিশেষ করুণা প্রাপ্ত রাজা। বাইবেলে ভাল, মন্দ, জালিম ও কাফির রাজাদেরকেও মাসীহ, ‘অভিষিক্ত বা ‘খৃস্ট’ (The Messiah, The Anointed, The Christ) বলা হয়েছে। মূল হিব্র“ বাইবেলে ও আরবী অনুবাদে সকল ক্ষেত্রে “মাসীহ” শব্দ ব্যবহার করা হলেও ইংরেজী ও বাংলায় “মাসীহ” বা ‘খৃস্ট’ (Messiah, Christ) ব্যবহার না করে (Anointed) ‘অভিষিক্ত’ ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ মূল শব্দ ‘মাসীহ’ এবং শব্দগুলির অর্থ একই।

কিতাবুল মুকাদ্দাসে বারংবার দায়ূদ নবীকে “মাসীহ” বলা হয়েছে (২ শমূয়েল ২২/৫১, যাবূর ১৮/৫০, যাবূর ১৩২/১০)। বাইবেলের বর্ণনায় শৌল বা তালূত ছিলেন ইহূদীদের একজন ভয়ঙ্কর জালিম ও পাপাচারী রাজা। এ পাপী রাজাও আল্লাহর মাসীহ ছিলেন। বাইবেলে বারংবার তাকে সদাপ্রভুর মাসীহ বা অভিষিক্ত (আরবীতে: মাসীহুর রাব্ব, ইংরেজিতে: (the anointed of the Lord) বলা হয়েছে। (১ শমূয়েল ২৪/৬ ও ১০, ২৬/৯, ১১, ১৬, ২৩ ও ২ শমূ ১/১৪, ১৬)। পারস্যের বিধর্মী সাইরাসকেও “মাসীহ” বলা হয়েছে। (যিশাইয় ৪৫/১)

ইহূদীগণ বিশ্বাস করেন যে, ঈসা মাসীহ ছিলেন না; বরং (আ) ভণ্ড ও যাদুকর ছিলেন। তাঁরা এখনো মাসীহের অপেক্ষায় রয়েছেন। খৃস্টানগণ বিশ্বাস করেন যে, ঈসা-ই মাসীহ। তবে প্রচলিত কিতাবুল মুকাদ্দাসের আলোকে প্রমাণিত হয় যে, ঈসা কোনোভাবেই মাসীহ বলে গণ্য হতে পারেন না। নিম্নের বিষয়গুলি লক্ষ্য করুন।

  • প্রথম বিষয়:
    • (ক) ইহূদী-খৃস্টান বিশ্বাস ও বাইবেলের বর্ণনা অনুসারে মাসীহকে অবশ্যই দায়ূদের সিংহাসনে বসতে হবে। (লূক ১/৩২)
    • (খ) বাইবেলের বর্ণনানুসারে যোশিয় রাজা পুত্র যিহোয়াকীম রাজা ভয়ঙ্কর কুফরী করে অভিশপ্ত হন; এজন্য আল্লাহ ঘোষণা দেন যে, যিহোয়াকীমের বংশের কেউ দায়ূদের সিংহাসনে বসতে পারবে না। (যিরমিয় ৩৬/৩০)
    • (গ) ইঞ্জিলে স্পষ্টভাবে লিখিত যে, যীশু যিহোয়াকীমের বংশধর (মথি ১/১-১৭)

    প্রচলিত কিতাবুল মুকাদ্দাস ও ইঞ্জিল শরীফ সত্য বলে বিশ্বাস করলে বিশ্বাস করতে হবে যে, অভিশপ্ত যিহোয়াকীমের বংশধর হওয়ার কারণে যীশুর ‘আল্লাহর মাসীহ’ বা খৃস্ট হওয়ার হওয়ার কোনো যোগ্যতা বা অধিকার ছিল না।

  • দ্বিতীয় বিষয়: মসীহের আগমনের শর্ত, তার পূর্বে এলিয়ের আগমন। একারণেই ইহূদীগণ যীশুকে মাসীহ বলে মানতে অস্বীকার করেন, কারণ এলিয় তখনো আগমন করেন নি। যীশু নিজেও স্বীকার করেছেন যে, এলিয় প্রথমে আসবেন। যোহনকে এলিয় বলে ইঞ্জিলের কোথাও ইঙ্গিত করা হয়েছে। কিন্তু যোহন নিজেই বলেছেন যে, তিনি এলিয় নন। “যিহূদীগণ কয়েকজন যাজক ও লেবীয়কে দিয়া তাঁহার কাছে এই কথা জিজ্ঞাসা করিয়া পাঠাইলেন, ‘আপনি কে?’ তখন তিনি স্বীকার করিলেন… যে, আমি সেই খৃস্ট নই। তাহারা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল, তবে কি? আপনি কি এলিয় (Eli’jah)? তিনি বলিলেন, আমি নই।” (যোহন ১/১৯-২১)। আর তিনি নিজে যে কথা অস্বীকার করেছেন তার বিষয়ে অন্য কেউ সেকথা বললে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একথা তো কল্পনা করা যায় না যে, এলিয় একজন ওহীপ্রাপ্ত নবী হবেন, অথচ নিজের পদমর্যাদা ও অবস্থা সম্পর্কে তিনি নিজেই জানবেন না। এভাবে এলিয়ের আগমন না হওয়ার কারণে যীশুর মাসীহ হওয়ার দাবি অগ্রহণযোগ্য।
  • তৃতীয় বিষয়: যীশুর অলৌকিক কার্যাবলি তাঁর মাসীহ হওয়ার প্রমাণ হতে পারে না। কারণ ইঞ্জিলে বলা হয়েছে যে, ভণ্ডগণও এমন সব মহান অলৌকিক কাজ করতে পারবে যেগুলি সাধারণ মানুষ তো বটেই, ওলীগণকেও প্রতারণা করতে পারবে। (মথি ২৪/২৪) দাজ্জাল সম্পর্কে ইঞ্জিলের বক্তব্য: “সেই ব্যক্তির আগমন শয়তানের কার্যসাধন অনুসারে মিথ্যার সমস্ত পরাক্রম ও নানা চিহ্ন ও অদ্ভুত লক্ষণ সহকারে হইবে।” ২ থিষলনীকীয় ২/৯)।

(৪) কোনো মোজেজা বা অলৌকিক কর্ম দেখান নি

মথির ১২ অধ্যায়: “৩৯ তিনি উত্তর করিয়া তাহাদিগকে কহিলেন, এই কালের দুষ্ট ও ব্যভিচারী লোকে চিহ্নের অন্বেষণ করে (মুজিযা দেখতে চায়), কিন্তু যোনা ভাববাদীর চিহ্ন ছাড়া আর কোনো চিহ্ন ইহাদিগকে দেওয়া যাইবে না। ৪০ কারণ যোনা যেমন তিন দিন ও তিন রাত্র (three days and three nights) বৃহৎ মৎস্যের উদরে ছিলেন, তেমনি মনুষ্যপুত্রও তিন দিন ও তিন রাত্র (three days and three nights)পৃথিবীর গর্ভে থাকিবেন।”

এখানে যীশু ইতোপূর্বে কোনো মুজিযা দেখিয়েছেন বলেও জানান নি। ভবিষ্যতেও কোনো মুজিযা দেখাবেন না বলে জানালেন। শুধু একটি মুজিযাই দেখাবেন: তিনি তিন দিবস ও তিন রাত্র পৃথিবীর গর্ভে অবস্থান করার পরে পুনরুত্থিত হবেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি এ মুজিযাও দেখান নি। কারণ ইঞ্জিলের বর্ণনানুসারে শুক্রবার দ্বিপ্রহরে যীশুকে ক্রুশে দেওয়া হয়। ঘন্টা তিনেক পর তিনি মৃত্যু বরণ করেন। সন্ধ্যায় অরিমাথিয়ার যোষেফ গভর্নর পীলাতের নিকট যেয়ে যীশুর দেহ প্রার্থনা করেন। শুক্রবার দিবাগত রাত্রে যীশুকে কবরস্থ করা হয়। রবিবার প্রত্যুষে সূর্যোদয়ের পূর্বেই এই দেহটি কবর থেকে অদৃশ্য হয়। যীশুর দেহ কোনো অবস্থাতেই পৃথিবীর গর্ভে তিন দিন ও তিন রাত্র থাকে নি; বরং এক দিন ও দুই রাত্রি তা পৃথিবীর গর্ভে ছিল। শুক্রবার দিবাগত রাত, শনিবারের দিন ও শনিবারের দিবাগত রাত। (মথি ২৭/৪৫-৬১; মার্ক ১৫/৩৩-৪৭; লূক ২৩/৪৪-৫৬; যোহন ১৯/২৫-৪২; ২০/১-১৮। আরো দেখুন: মথি ২৮/১-১০; মার্ক ১৬/১-১১; লূক ২৪/১-১২।)

এভাবে ইঞ্জিলের বর্ণনানুসারে ঈসা মাসীহ কোনো মোজেযাই দেখান নি। তিনি মৃতকে জীবিত করেছেন, অন্ধকে দৃষ্টি দিয়েছেন ইত্যাদি বর্ণনা তাহলে মিথ্যা। অথবা এ বর্ণনাটি মিথ্যা। অথবা সবই মিথ্যা।

(৫) মিথ্যা ওয়াদা

প্রচলিত ইঞ্জিলের বর্ণনায় ঈসা মাসীহ অনেক মিথ্যা ওয়াদা করেছেন। যেমন:

  • ক. তিনি ১২ শিষ্যকে ওয়াদা করেন যে, তারা সকলেই কিয়ামতে তাঁর পাশে ১২ সিংহাসনে বসবেন। মথি ১৯/২৮: “যীশু তাঁহাদিগকে কহিলেন, আমি তোমাদিগকে সত্য কহিতেছি, তোমরা যত জন আমার পশ্চাদগামী হইয়াছ, পুনঃসৃষ্টিকালে, যখন মনুষ্যপুত্র আপন প্রতাপের সিংহাসনে বসিবেন, তখন তোমরাও দ্বাদশ সিংহাসনে বসিয়া ইস্রায়েলের দ্বাদশ বংশের বিচার করিবে।” এ ওয়াদা অন্তত একজনের জন্য মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। কারণ, এ ১২ জনের একজন ঈষ্করিয়োতীয় যিহূদা। তিনি ৩০ রৌপ্যমুদ্রার বিনিময়ে যীশুকে ইহূদীদের হাতে তুলে দেন এবং তিনি ধর্মত্যাগী ও নরকবাসী রূপেই মৃত্যু বরণ করেন (মথি ২৭/৫; প্রেরিত ১/১৮)। তার পক্ষে সিংহাসনে বসা সম্ভব হবে না।
  • খ. মার্ক ১৬/১৭-১৮: “আর যাহারা বিশ্বাস করে, এই চিহ্নগুলি তাহাদের অনুবর্তী হইবে; তাহারা আমার নামে ভূত ছাড়াইবে, তাহারা নূতন নূতন ভাষায় কথা কহিবে, তাহারা সর্প তুলিবে, এবং প্রাণনাশক কিছু পান করিলেও তাহাতে কোন মতে তাহাদের হানি হইবে না; তাহারা পীড়িতদের উপরে হস্তার্পণ করিবে, আর তাহারা সুস্থ হইবে।” কোনো যুগে এবং কোনো দেশেই কেউ এগুলি করতে পারে নি। জিনভূত ছাড়ানো বা অসুস্থকে সুস্থ করার দাবি ও প্রমাণ সকল ধর্মের ও অধর্মের যাদুকর, সন্যাসী, গুরু, ফকীর ও কবিরাজই করে থাকে। খৃস্টান গুরুগণ এরূপ ফকীরী ছাড়া উপরের অন্য কোনো কারামতই দেখাতে পারে নি। তাদের কেউই লেখাপড়া না করে নতুন নতুন ভাষায় কথা বলতে পারেন নি, বিষধর সাপ গলায় ঝুলাতে বা বিষপান করে বেঁচে থাকতে পারেন নি। খৃষ্টান প্রচারকগণ ধোঁকা দিতে বলেন, অমুক দেশে অমুক ব্যক্তি করেছিলেন। তাদের এ সকল দাবী সবই মিথ্যা। যীশুর বারো শিষ্যর কেউই এগুলি করে দেখাতে পারেন নি। সবচেয়ে বড় কথা এখানে ঈসা মাসীহ স্পষ্টত বলেছেন যারাই বিশ্বাস করে তারাই এগুলি করবে। কিন্তু বাস্তবে এ কথা মিথ্যা বলে প্রমাণিত। হয় ইঞ্জিলকে জাল বলে স্বীকার করতে হবে। অথবা ঈসা মাসীহকে মিথ্যাবাদী বলতে হবে!
  • গ. “যীশু বলিলেন, আমি তোমাদিগকে সত্য কহিতেছি, এমন কেহ নাই, যে আমার নিমিত্ত ও সুসমাচারের নিমিত্ত বাটী কি ভ্রাতৃগণ কি ভগিনী কি মাতা কি পিতা কি {স্ত্রী কি সন্তানসন্ততি} কি ক্ষেত্র ত্যাগ করিয়াছে, কিন্তু এখন ইহকালে তাহার শতগুণ না পাইবে; সে বাটী, ভ্রাতা, ভগিনী, মাতা, সন্তান ও ক্ষেত্র, তাড়নার সহিত এই সকল পাইবে, এবং আগামী যুগে অনন্ত জীবন পাইবে।” (মার্ক ১০/২৯-৩০। আরো দেখুন: লূক ১৮/২৯-৩০)

সুপ্রিয় পাঠক, কথাটি কি উদ্ভট নয়? ঈশ্বরের জন্য নিজের মা-বাবাকে পরিত্যাগ করলে ইহকালেই ১০০ জন মা ও ১০০ জন বাবা লাভ! একজন স্ত্রী পরিত্যাগ করলে ইহকালেই ১০০ স্ত্রী? অথচ খৃস্টধর্মে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ নিষিদ্ধ!! সর্বোপরি তাঁর এ প্রতিশ্র“তি বাস্তবে মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে। এ সকল শিষ্য কেউই ইহকালে শতগুণ পিতা, মাতা, স্ত্রী ইত্যাদি লাভ করেন নি। সত্যই কি যীশু এরূপ উদ্ভট কথা বলেছেন? না জালিয়াতরা এগুলি বানিয়ে লিখেছে?

(৬) আল্লাহর পুত্র আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে অজ্ঞ

ইঞ্জিলের বর্ণনায় ঈসা মাসীহ পূর্ববর্তী নবীগণের নামে অনেক কথা বলেছেন, যা কিতাবুল মুকাদ্দাসের কোথাও নেই। দু-একটি নমুনা দেখুন:

ক. মার্ক ২/২৫-২৬: “তিনি (যীশু) তাহাদিগকে (ইহূদী ফরীশীগণকে) কহিলেন, দায়ূদ ও তাঁহার সঙ্গীরা খাদ্যের অভাবে ক্ষুধিত হইলে তিনি যাহা করিয়াছিলেন, তাহা কি তোমরা কখনো পাঠ কর নাই? তিনি ত অবিয়াথর মহাযাজকের সময়ে ঈশ্বরের গৃহে প্রবেশ করিয়া, যে দর্শন-রুটী যাজকবর্গ ব্যতিরেকে আর কাহারও ভোজন করা বিধেয় নয়, তাহাই ভোজন করিয়াছিলেন, এবং সঙ্গিগণকেও দিয়াছিলেন।”

১ শমূয়েল-এর ২১ ও ২২ অধ্যায় থেকে প্রমাণিত যে, ঈসা মাসীহের এ কথাটি ভুল। কারণ ‘দর্শন-রুটী’ ভোজন করার সময় দায়ূদ ‘একা’ ছিলেন, তাঁর সাথে অন্য কেউ ছিল না। কাজেই ‘ও তাঁহার সঙ্গীরা’ এবং ‘সঙ্গিগণকেও দিয়াছিলেন’ দুটি কথাই ভুল। এছাড়া এ ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট মহাযাজকের নাম ছিল ‘অহীমেলক’। ‘অবিয়াথর’ এ সময়ে যাজক ছিলেন না।

পাঠক, আপনাকে স্বীকার করতে হবে যে, ইঞ্জিলগুলি জাল অথবা যীশু দাউদের ঘটনা জানতেন না, এজন্য আন্দাজে মিথ্যা বলেছেন! (নাঊযু বিল্লাহ)

খ. ঈসা মাসীহ বলেছেন: “আর স্বর্গে কেহ উঠে নাই; কেবল যিনি স্বর্গ হইতে নামিয়াছেন, সেই মনুষ্যপুত্র, যিনি স্বর্গে থাকেন।” (যোহন ৩/১৩)

তাওরাতের ভাষ্যে এ কথাটি ভুল। কারণ হনোক (Enoch: ইদরীস আ.) এবং এলিয় (Eli’jah: আল-ইয়াসা’ আ.) উভয়ে স্বর্গে গমন করেছেন (আদিপুস্তক ৫/২৩-২৪; ২ রাজাবলি ২/১-১১।)

সুপ্রিয় পাঠক, খৃস্টানগণ দাবি করেন যে, খোদা তিনজন: পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা। এরা প্রত্যেকেই সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ঈশ্বর। তিনজন স্বয়ংসম্পূর্ণ ও পৃথক ঈশ্বর মিলে এক ঈশ্বর (১+১+১=১???!!!) উপরের উদ্ধৃতিগুলিতে পুত্র ঈশ্বরের অজ্ঞতা প্রমাণিত হয়। খৃস্টানগণ দাবি করেন যে, পবিত্র আত্মা বা পাক রূহের তত্ত্বাবধানে ইঞ্জিল লেখা হয়। এগুলিতেও এ জাতীয় অনেক ভিত্তিহীন তথ্য পাওয়া যায়। সামান্য কয়েকটি নমুনা দেখুন:

গ. যীশুর পিতামাতা তাঁকে নিয়ে মিসর থেকে ফিলিস্তিনে ফিরে নাসরৎ নামক শহরে বসবাস করতে থাকেন। এ বিষয়ে মথি বলেন: “এবং নাসরৎ নামক নগরে গিয়া বসতি করিলেন; যেন ভাববদিগণের দ্বারা কথিত এই বচন পূর্ণ হয় যে, তিনি নসরতীয় বলিয়া আখ্যাত হইবেন।” (মথি ২/২৩)

ইঞ্জিলের এ কথাটি অসত্য। কোনো ভাববাদীর কোনো পুস্তকেই এ কথা নেই। ইহূদীগণ বলেন যে, মথির এ কথাটি নবীগণের নামে জালিয়াতি।

ঘ. যীশুর বারো শিষ্যের অন্যতম ঈষ্করিয়োতীয় যিহূদা। তিনি মাত্র ৩০ রৌপ্যমুদ্রার বিনিময়ে যীশুকে ইহূদীদের কাছে ধরিয়ে দেন। এ প্রসঙ্গে মথি ২৭/৯-এর বক্তব্য: “তখন যিরমিয় ভাববাদী দ্বারা কথিত এই বচন পূর্ণ হইল, ‘আর তাহার সেই ত্রিশ রৌপ্যমুদ্রা লইল”। এ কথাটিও ভিত্তিহীন ও অসত্য। এ বাক্যটি বা এ অর্থে কোনো বাক্য যিরমিয় ভাববাদীর পুস্তকের কোথাও নেই।

ঙ. যীশুর বংশাবলি-পত্রে লূক লিখেছেন (৩/২৭): “ইনি যোহানার পুত্র, ইনি রীষার পুত্র, ইনি সরুব্বাবিলের পুত্র, ইনি শল্টীয়েলের পুত্র ইনি নেরির পুত্র”।

পুরাতন নিয়ম থেকে প্রমাণিত যে এখানে তিনটি অসত্য তথ্য রয়েছে:

  • প্রথমত: “রীষা সরুব্বাবিলের পুত্র” কথাটি অসত্য। মথি লিখেছেন (১/১২-১৩) “সরুব্বাবিলের পুত্র অবীহূদ।” লূক ও মথি দুজনের কথাই অসত্য। কারণ ১ বংশাবলি ৩/১৯-এ রয়েছে যে, সরুব্বাবিলের ৫টি পুত্র ছিল, তাদের মধ্যে (রীষা) বা (অবীহূদ) নামে কোনো পুত্র ছিল না।
  • দ্বিতীয়ত: সরুব্বাবিল শল্টীয়েলের পুত্র ছিলেন না। তিনি ছিলেন পদায়ের পুত্র। হ্যাঁ, তিনি শল্টীয়েলের ভাতিজা ছিলেন। (১ বংশাবলি ৩/১৭-১৮)
  • তৃতীয়ত: শল্টীয়েলের পিতার নাম নেরি ছিল না। তার পিতার নাম ছিল যিকনিয় (যিহোয়াখীন)। (১ বংশাবলি ৩/১৭ ও মথি ১/১২)

চ. লূক ঈসা মাসীহের বংশতালিকায় লিখেছেন: “ইনি শেলহের পুত্র, ইনি কৈননের পুত্র, ইনি অর্ফকষদের পুত্র” (লূক ৩/৩৬)। এ কথাটিও ভিত্তিহীন ও ভুল। কারণ, শেলহ নিজেই অর্ফকষদের পুত্র ছিলেন, তিনি অর্ফকষদের পৌত্র ছিলেন না। আদিপুস্তক ১০/২৪: ১১/১২-১৪: ১ বংশাবলি ১/১৮।

এরূপ অগণিত ভিত্তিহীন তথ্য ইঞ্জিলগুলিতে পাওয়া যায়। এতে প্রমাণিত হয় এগুলি জাল। অথবা “পাক রুহ” নামক খোদা নবীগণের কিতাবগুলি সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। আন্দাযে সত্যমিথ্যা অনেক কিছু বলেছেন।

(৭) মিথ্যা ভবিষ্যদ্বাণী

ইঞ্জিল বলে, ঈসা মাসীহ মিথ্যা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। দু-একটি নমুনা দেখুন:

ক. ঈসা মসীহ এক জমায়েতে বলেন, সেখানে উপস্থিত কয়েকজন মানুষ বেঁচে থাকতেই কিয়ামত হবে। মথি ১৬/২৭-২৮: “কেননা মনুষ্যপুত্র আপন দূতগণের (angels) সহিত আপন পিতার প্রতাপে আসিবেন, আর তখন প্রত্যেক ব্যক্তিকে তাহার ক্রিয়ানুসারে প্রতিফল দিবেন। আমি তোমাদিগকে সত্য কহিতেছি, যাহারা এখানে দাঁড়াইয়া রহিয়াছে, তাহাদের মধ্যে এমন কয়েক জন আছে, যাহারা কোন মতে মৃত্যুর আস্বাদ পাইবে না, যে পর্যন্ত মনুষ্যপুত্রকে আপনার রাজ্যে আসিতে না দেখিবে।”

এ ভবিষ্যদ্বাণীটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। কারণ, সেখানে যারা দাঁড়িয়ে ছিল তাদের সকলেই প্রায় ২০০০ বৎসর পূর্বে মৃত্যুর আস্বাদ পেয়েছেন কিন্তু তাদের কেউই ঈশ্বরের পুত্রকে ফিরিশতাগণের সাথে এসে প্রতিফল দিতে দেখেন নি।

খ. যীশুর শিষ্যগণও এরূপ মিথ্যা ভবিষ্যদ্বাণী করতেন। তাঁরা বলতেন যে, তাঁদের মৃত্যুর আগেই কিয়ামত হবে এবং জীবিত অবস্থাতেই তাদের রূপান্তর হবে। ১ থিষলনীকীয় ৪/১৫-১৭: “কেননা আমরা প্রভুর বাক্য দ্বারা তোমাদিগকে ইহা বলিতেছি যে, আমরা যাহারা জীবিত আছি, যাহারা প্রভুর আগমন পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকিব, আমরা কোন ক্রমেই সেই নিদ্রাগত লোকদের অগ্রগামী হইব না। কারণ প্রভু স্বয়ং আনন্দধ্বনি সহ, প্রধান দূতের রব সহ, এবং ঈশ্বরের তূরীবাদ্য সহ স্বর্গ হইতে নামিয়া আসিবেন, আর যাহারা খ্রীষ্টে মরিয়াছে তাহারা প্রথমে উঠিবে। পরে আমরা যাহারা জীবিত আছি, যাহারা অবশিষ্ট থাকিব, আমরা আকাশে প্রভুর সহিত সাক্ষাৎ করিবার নিমিত্ত একসঙ্গে তাহাদের সহিত মেঘযোগে নীত হইব; আর এইরূপে সতত প্রভুর সঙ্গে থাকিব।”

১ করিন্থীয় ১৫/৫১-৫২: “দেখ, আমি তোমাদিগকে এক নিগূঢ়তত্ত্ব বলি; আমরা সকলে নিদ্রাগত হইব না (মরিব না), কিন্তু সকলে রূপান্তরীকৃত হইব; এক মুহূর্তের মধ্যে, চক্ষুর পলকে, শেষ তূরীধ্বনিতে হইবে; কেননা তূরী (সিঙ্গা) বাজিবে, তাহাতে মৃতেরা অক্ষয় হইয়া উত্থাপিত হইবে, এবং আমরা রূপান্তরীকৃত হইব।” এ ভবিষ্যদ্বাণী যে মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে তা আমরা জানি।

গ. এ মিথ্যা ওয়াদার কারণেই যীশুর শিষ্যগণ ইঞ্জিল লেখার কোনো চিন্তাই করেন নি। বরং তারা তা লিখতে নিষেধ করতেন। কিয়ামত যেহেতু কয়েক বছরের মধ্যে এসে যাবে সেহেতু লেখালেখির প্রয়োজন নেই, যার যা মনে আছে বা মনে আসে তা বলতে থাক ও প্রচার কর। জান্নাতীরা জান্নাতের জন্য ও জাহান্নামীরা জাহান্নামের জন্য তৈরি হয়ে যাক!! প্রচলিত ইঞ্জিল শরীফের শেষ বই প্রকাশিত বাক্যের ২২ অধ্যায়ের ১০-১১ শ্লোকে বলা হয়েছে: “আর তিনি আমাকে কহিলেন, তুমি এ গ্রন্থের ভাববাণীর বচন সকল মুদ্রাঙ্কিত করিও না (লিখিও না); কেননা সময় সন্নিকট। যে অধর্মচারী, সে ইহার পরেও অধর্মাচরণ করুক এবং যে কলুষিত, সে ইহার পরেও কলুষিত হউক; এবং যে ধার্মিক, সে ইহার পরেও ধর্মাচরণ করুক; এবং যে পবিত্র, সে ইহার পরেও পবিত্রকৃত হউক।”

এরূপ বিশ্বাসের কারণেই প্রকৃত ইঞ্জিল হারিয়ে যায়। প্রায় ৩০০ বৎসর পরে মানুষের নিজেদের ইচ্ছামত সত্য ও মিথ্যা মিশিয়ে অনেক ইঞ্জিল লিখে প্রচার শুরু করে। বর্তমানে প্রচলিত ৪ ইঞ্জিল ও অন্যান্য পত্র-পুস্তিকা এ সময়ে লেখা কয়েক শত ইঞ্জিলের মধ্য থেকে সুবিধামত বাছাই করা কয়েকটি বই মাত্র।

(৮) বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা

যারা জাতি, ধর্ম বা বংশের জন্য অন্য মানুষকে ঘৃণা, অবজ্ঞা বা ছোট মনে করে তাদেরকে বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িক বলা হয়। আমরা জানি এরূপ করা জঘন্য অন্যায়। একজন সাধারণ নেতাও যদি এরূপ করেন তবে তাকে খারাপ মনে করা হয়। কিন্তু প্রচলিত ইঞ্জিল ঈসা মাসীহকে সাম্প্রদায়িক ও বর্ণবাদী রূপে চিত্রিত করেছে। তিনি রক্ত, বংশ বা ধর্মের কারণে মানুষদেরকে ঘৃণা করতেন, কুকুর ও শূকর বলে আখ্যায়িত করতেন! তিনি তাঁর বারোজন শিষ্য বা হাওয়ারিকে ধর্ম প্রচারের নির্দেশ দিয়ে বলেন: “তোমরা পরজাতিগণের (Gentiles) পথে যাইও না, এবং শমরীয়দের কোন নগরে প্রবেশ করিও না; বরং ইস্রায়েল-কুলের হারান মেষগণের কাছে যাও।” (মথি ১০/৫-৮)

এখানে স্পষ্টভাষায় ঈসা মাসীহ বলেছেন যে, তার ধর্ম সার্বজনীন বা সকল মানুষের জন্য নয়। পরজাতি অর্থাৎ কোনো বাঙালী যদি তাঁর ধর্ম গ্রহণ করে তবে সে জান্নাত পাবে না; কারণ তিনি শুধু ইসরায়েল বংশের মুক্তিদাতা।

অন্যদেরকে খৃস্টধর্মের দীক্ষা না দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যায় তিনি বলেন: “পবিত্র বস্তু কুকুরদিগকে দিও না, এবং তোমাদের মুক্তা শূকরদের সম্মুখে ফেলিও না; পাছে তাহারা পা দিয়া তাহা দলায়, এবং ফিরিয়া তোমাদিগকে আক্রমণ করে।” (মথি ৭/৬) অর্থাৎ ইসরায়েল বংশের মানুষ ছাড়া অন্য সকল মানুষ কুকুর ও শূকর। কাজেই ধর্মের মত কোনো পবিত্র বস্তু তাদেরকে দেওয়া যাবে না।

ইঞ্জিলে অন্যত্র রয়েছে: “আর দেখ, ঐ অঞ্চলের এক জন কনানীয় স্ত্রীলোক আসিয়া এই বলিয়া চেঁচাইতে লাগিল, হে প্রভু, দায়ূদ-সন্তান, আমার প্রতি দয়া করুন, আমার কন্যাটি ভূতগ্রস্ত হইয়া অত্যন্ত ক্লেশ পাইতেছে। কিন্তু তিনি তাহাকে কিছুই উত্তর দিলেন না। তখন তাঁহার শিষ্যেরা নিকটে আসিয়া তাঁহাকে নিবেদন করিলেন, ইহাকে বিদায় করুন, কেননা এ আমাদের পিছনে পিছনে চেঁচাইতেছে। তিনি উত্তর করিয়া কহিলেন, ইস্রায়েল-কুলের হারান মেষ ছাড়া আর কাহারও নিকটে আমি প্রেরিত হই নাই (I am not sent but unto the lost sheep of the house of Israel)। কিন্তু স্ত্রীলোকটি আসিয়া তাঁহাকে প্রণাম করিয়া বলিল, প্রভু, আমার উপকার করুন। তিনি উত্তর করিয়া কহিলেন, সন্তানদের খাদ্য লইয়া কুকুরদের কাছে ফেলিয়া দেওয়া ভাল নয় (It is not meet to take the children’s bread, and to cast it to dogs)|” (মথি ১৫/২২-২৮)

মার্কের ইঞ্জিলে মহিলাকে কননীয় (অর্থাৎ আরবীয়) না বলে গ্রীক ও সুর ফৈনীকী বলা হয়েছে। অর্থাৎ মহিলার পরিচয় ‘পবিত্র আত্মা’ বা ‘পাক রূহ’ ঠিকমত মনে রাখতে পারেন নি। এখানে বলা হয়েছে: “… স্ত্রীলোকটি গ্রীক, জাতিতে সুর-ফৈনীকী। সে তাঁহাকে বিনতি করিতে লাগিল, যেন তিনি তাহার কন্যার ভূত ছাড়াইয়া দেন। তিনি তাহাকে কহিলেন, প্রথমে সন্তানরা তৃপ্ত হউক, কেননা সন্তানদের খাদ্য লইয়া কুকুরদের কাছে ফেলিয়া দেওয়া ভাল নয়। কিন্তু স্ত্রীলোকটি উত্তর করিয়া তাঁহাকে কহিল, হাঁ, প্রভু, আর কুকুরেরাও মেজের নিচে ছেলেদের খাদ্যের গুঁড়াগাঁড়া খায়। তখন তিনি তাহাকে বলিলেন, এই বাক্য প্রযুক্ত চলিয়া যাও, তোমার কন্যার ভূত ছাড়িয়া গিয়াছে।” (মার্ক ৭/২৫-২৯)

এখানে ঈসা মাসীহ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় দুটি বিষয় জানিয়েছেন:

প্রথমত: তাঁকে পৃথিবীর সকল মানুষের মুক্তির জন্য প্রেরণ করা হয় নি। তাঁর ইঞ্জিলে পরিত্রাণ, মুক্তি, স্বর্গ-রাজ্য, পাপ মোচন ইত্যাদি বিষয়ে যা কিছু বলা হয়েছে তা সবই শুধু ইস্রায়েল বংশের মানুষদের জন্য; অন্যদের জন্য নয়।

দ্বিতীয়ত: ইস্রায়েলীয়গণ ঈশ্বরের সন্তান। অ-ইস্রায়েলীয় মানুষ কুকুর বৈ কিছুই নয়। সন্তানের খাদ্য যেমন কুকুরকে দেওয়া ঠিক নয়, তেমনি অ-ইস্রায়েলীয় কোনো মানুষকে মাসীহের দুআ দেওয়াও ঠিক নয়। তবে যদি কোনো অ-ইস্রায়েলীয় নিজেকে উচ্ছিষ্ট-খেকো কুকুর বলে স্বীকার ও বিশ্বাস করে তবে হয়ত সে তাঁর দুআ দ্বারা উপকৃত হতে পারে।

সম্মানিত পাঠক, কোনো নবী কি কোনো মানুষকে তার ধর্ম বা বর্ণের কারণে কুকুর বলে আখ্যা দিতে পারেন? প্রচলিত ইঞ্জিল সত্যি বলে বিশ্বাস করলে আপনাকে অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে যে, ইস্রায়েল বংশ ছাড়া অন্য সকল বংশের মানুষ, অর্থাৎ বাঙালী, ভারতীয়, আর্য, অনার্য, আরব, ইরানী ও অন্যান্য জাতির মানুষ কুকুর ও শূকর। তাদেরকে শূকর বা কুকুর বলা ঈসা মাসীহের সুন্নাত। মানুষকে এভাবে গালি দেওয়ার মত মহাপাপ কী আর আছে?

খৃস্টান পাদরিগণ বলবেন যে, সঙ্গীদেরকে বুঝানোর জন্য যীশু এ কথা বলেছিলেন। অর্থাৎ যীশুর ঈমান এত দুর্বল ছিল যে, তিনি সঙ্গীদের খুশি করতে মিথ্যার মত মহাপাপে লিপ্ত হতেন? অথবা তিনি মানুষকে খুশি করতে যাকে যেভাবে পারতেন মিথ্যা বলতেন? না কি তিনি শিষ্যদেরকে খুশি করার জন্য তাদেরকে সাম্প্রদায়িকতা ও মিথ্যাবাদিতার মত মহাপাপ শিক্ষা দিতেন?

(৯) রক্তপিপাসু ক্ষমতালিপ্সু

খৃস্টান প্রচারকগণ দাবি করেন যে, খৃস্টধর্ম প্রেমের ধর্ম। কিন্তু কিতাবুল মুকাদ্দাস ও ইঞ্জিল শরীফের বর্ণনা সম্পূর্ণ বিপরীত। স্বয়ং যীশু বলেন: “But those mine enemies, which would not that I should reign over them, bring hither, and slay them before me”, “পরন্তু আমার এই যে শত্র“গণ ইচ্ছা করে নাই যে, আমি তাহাদের উপরে রাজত্ব করি, তাহাদিগকে এই স্থানে আন, আর আমার সাক্ষাতে বধ কর।” (লূক ১৯/২৭)

প্রিয় পাঠক, একটু ভাবুন! নবী-রাসূল তো দূরের কথা কোনো জালিম শাসক কি এরূপ নির্দেশ দিতে পারে। কেউ হয়ত বলতে পারেন, যুদ্ধের ময়দানে শত্র“দেরকে হত্যা কর। কোনো জালিম হয়ত বলতে পারে, আমার রাজত্বের বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্র করে তাদেরকে হত্যা কর। কিন্তু শুধু তার রাজত্ব অপছন্দ করে বলে নিরস্ত্র মানুষদেরকে ধরে এনে জবাই করা!! তাও আবার নিজের সামনে! জবাই-এর সময় কিভাবে মানুষ ছটফট করে তা দেখার জন্য? মানুষের রক্ত দেখে মন ঠাণ্ডা করার জন্য? এরূপ ভয়ঙ্কর নির্দেশ কি কোনো নবী প্রদান করতে পারেন?

কিতাবুল মুকাদ্দাসের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধবন্ধী, নিরস্ত্র নারী, পুরুষ, শিশু ও অবলা প্রাণী নির্বিচারে হত্যা করার , বিধর্মীদের উপাসনালয় ভেঙ্গে ফেলার , সরলপ্রাণ বিধর্মীদেরকে খানাপিনার দাওয়াত দিয়ে তাদের হত্যা করার , নিরস্ত্র বন্দীদেরকে হত্যার বা পুড়িয়ে মারার নির্দেশ বা ব্যবস্থা রয়েছে।। বিবেকবান মানুষেরা স্বীকার করবেন যে, এগুলি কোনো ধর্মগ্রন্থের নির্দেশ হতে পারে না।

কিন্তু এ সকল ‘পবিত্র’ নির্দেশের ভিত্তিতেই যুগে যুগে খৃস্টান পাদরি ও পোপগণ লক্ষকোটি মানুষকে ধর্মের নামে হত্যা করেছেন। লক্ষকোটি নিরপরাধ বিজ্ঞানী, গবেষক, সাহিত্যিক, ধর্মীয় ভিন্নমতাবলম্বী ও অন্যধর্মাবলম্বী মানুষকে হত্যা, জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ করা, কারাগারে আবদ্ধ রাখা, নির্মম অত্যাচার করা বা জোরপূর্বক ধর্মান্তর করা খৃস্টান পাদরী-পোপ ও শাসকদের অতিপরিচিত ইতিহাস। অনুসন্ধিৎসু পাঠক যে কোনো এনসাইক্লোপিডিয়া, উইকিপিডিয়া বা ইন্টারনেটে নিম্নের বিষয়গুলি অধ্যয়ন করলে খৃস্টান লেখকদের লেখা থেকেই তা বুঝতে পারবেন:

Christian Persecutions, DEMOLISH THEM, Theodosian Code, Christian advocacy of persecution, heresy, The Protestant theory of persecution, Moriscos, Crusades, Christian terrorism, European colonization of the Americas, History of the Jews in Spain, Baptism of Poland, Christianization of Kievan Rus’, Christianization, Conquistador, Santería, Inquisition, Waldensians, Lollardy, Cathari, Catharism, Ku Klux Klan, New Christian Public Worship Regulation Act 1874, genocide, Massacre of Saint Bartholomew’s Day, The Wars of Religion …

(১০) ভীত-কাপুরুষ

খৃস্টানগণ দাবি করেন যে, ঈসা মাসীহকে বিশ্বাস করলে সকল ভয় থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। অথচ ইঞ্জিলে ঈসা মাসীহকে অত্যন্ত ভীতরূপে চিত্রিত করা হয়েছে। খৃস্টানগণ দাবি করেন, যীশু ঈশ্বর, তাঁর আগমনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ক্রুশে মরে মানবজাতিকে পাপমুক্ত করা। অথচ ইঞ্জিলে বলা হয়েছে যে, তিনি যখন জানতে পারলেন যে, ইহূদীগণ তাঁকে ধরে বিচার করার ষড়যন্ত্র করছে তখন তিনি মাটিতে মাথা ঠুকে কাঁদতে থাকেন এবং রক্তক্ষরণের মত ঘামতে থাকেন। (মথি ২৬/৩৬-৪৬, লূক ২২/৪১-৪৬) এরপর ইহূদীরা তাঁকে ধরে নিয়ে ক্রুশে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। তাঁর সাথে আরো দুজন চোরকে একইভাবে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়। চোর দুজন নীরবে ও সাহসিকতার সাথে তাদের এ মৃত্যু মেনে নেন। কিন্তু ঈসা মাসীহ মৃত্যুর পূর্বে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে মুত্যুবরণ করেন। (মথি ২৭/৩৮-৫১; মার্ক ১৫/২৭-৩৮)

প্রিয় পাঠক, কেউ যদি এখন বলেন, ক্রুশে মরতেই যার আগমন, সেই যীশুই মৃত্যুর ভয়ে এত ভীত, কাজেই তাকে বিশ্বাস করলে তো ভয় শতগুণ বাড়বে বৈ কমবে না! তাহলে কি তাকে দোষ দেওয়া যায়?

প্রিয় পাঠক, আমার জানি কোনো নিরপরাধ ধার্মিক মানুষকে জুলুম করে মুত্যুদণ্ড দিলে তিনি মৃত্যুর সময় কাঁদেন না, বরং সাহসিকতার সাথে মেনে নেন। এমনকি কোনো চোর ডাকাত থেকেও এরূপ কথা শোনা যায় না যে, পুলিশের ভয়ে পাগলের মত মাটিতে মাথা ঠুকে কেঁদেছে অথবা ফাঁসির কাঠে ঝুলে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে মরে গিয়েছে। কেউ যদি এরূপ করে তাহলে মানুষেরা তাকে কাপুরুষ বলে নিন্দা করে। অথচ আল্লাহর মহান রাসূল ঈসা মাসীহকে প্রচলিত ইঞ্চিলে কীভাবে চিত্রিত করা হয়েছে দেখুন!

(১১) অপবিত্র

প্রচলিত খৃস্টধর্মের প্রতিষ্ঠাতা সাধু পল যীশুকে অপবিত্র বলে প্রমাণ করেছেন (নাঊযু বিল্লাহ)। কারণ সাধু পলের মতে যারা শরীয়ত মেনে হালাল-হারাম বাছ বিচার করে খায় তারা অপবিত্র। তিনি লিখেছেন: “বাস্তবিক ঈশ্বরে সৃষ্ট সমস্ত বস্তুই ভাল; ধন্যবাদসহ গ্রহণ করিলে কিছুই অগ্রাহ্য নয়, কেননা ঈশ্বরের বাক্য ও প্রার্থনা দ্বারা তাহা পবিত্রীকৃত হয়।” (তীমথিয় ৪/৪-৫) অর্থাৎ শূকর, কুকুর যাই খাও না কেন, খাওয়ার আগে দুআ করলেই সব পবিত্র হয়ে গেল!!

অন্যত্র সাধু পল বলেছেন যে, যারা অপবিত্র তারাই শুধু হালাল-হারাম খাদ্য বাছবিচার করে। তিনি বলেন: “কোন বস্তুই স্বভাবত অপবিত্র নয়; কিন্তু যে যাহা অপবিত্র জ্ঞান করে, তাহারই পক্ষে তাহা অপবিত্র।” (রোমীয় ১৪/১৪)। তিনি আরো বলেন: “শুচিগণের পক্ষে সকলই শুচি (Unto the pure all things are pure); কিন্তু কলুষিত ও অবিশ্বাসীদের পক্ষে কিছুই শুচি নয়; বরং তাহাদের মন ও সংবেদ (বিবেক) উভয়ই কলুষিত হইয়া পড়িয়াছে।” (১ তীত ১৫)।

সুপ্রিয় পাঠক, কিতাবুল মুকাদ্দাস থেকে প্রমাণিত যে, স্বয়ং ঈসা মাসীহ এবং সকল নবী শরীয়ত মানতেন এবং হালাল-হারাম বিচার করতেন। সাধু পলের এ কথা থেকে কি প্রমাণিত হয় না যে, মূসা (আ) থেকে ঈসা (আ) পর্যন্ত সকল নবী ও স্বয়ং যীশু কেউই পবিত্র ছিলেন না, তাদের মন ও বিবেক কলুষিত ছিল এজন্যই তাদের জন্য অনেক খাদ্য ও পানীয় হারাম ও অপবিত্র ছিল!

সম্মানিত পাঠক, সাধু পল বলছেন যে, নবীগণের শরীয়ত মানা যাবে না। যে তা মানবে সে অপবিত্র। অথচ যীশু বলেছেন যে কিয়ামত পর্যন্ত শরীয়তের প্রতিটি অক্ষর মানতে হবে। যে ব্যক্তি শরীয়ত পালনের বিরুদ্ধে বলে সে স্বর্গরাজ্যে অতি ক্ষুদ্র। তিনি বলেন: “মনে করিও না যে, আমি ব্যবস্থা কি ভাববাদিগ্রন্থ লোপ করিতে আসিয়াছি; আমি লোপ করিতে আসি নাই, কিন্তু পূর্ণ করিতে আসিয়াছি। কেননা আমি তোমাদিগকে সত্য কহিতেছি, যে পর্যন্ত আকাশ ও পৃথিবী লুপ্ত না হইবে, সে পর্যন্ত ব্যবস্থার এক মাত্রা কি এক বিন্দুও লুপ্ত হইবে না, সমস্তই সফল হইবে। অতএব যে কেহ এই সকল ক্ষুদ্রতম আজ্ঞার মধ্যে কোন একটি আজ্ঞা লঙ্ঘন করে, ও লোকদিগকে সেইরূপ শিক্ষা দেয়, তাহাকে স্বর্গরাজ্যে অতি ক্ষুদ্র বলা যাইবে; কিন্তু যে কেহ সে সকল পালন করে ও শিক্ষা দেয়, তাহাকে স্বর্গ-রাজ্যে মহান বলা যাইবে। কেননা আমি তোমাদিগকে কহিতেছি, অধ্যাপক ও ফরীশীদের অপেক্ষা তোমাদের ধার্মিকতা যদি অধিক না হয় তবে তোমরা কোন মতে স্বর্গ-রাজ্যে প্রবেশ করিতে পারিবে না।” (মথি ৫/১৭-২০)

পাঠক, একটু ভাবুন! যদি ঈসা মাসীহের কথা সত্য হয় তাহলে সাধু পল অভিশপ্ত ও অতি ক্ষুদ্র। কারণ তিনি ক্ষুদ্রতম ও বৃহত্তম সকল আজ্ঞা বা বিধান লঙ্ঘনের নির্দেশ দিতেন। আর যদি সাধু পলের কথা সত্য হয় তাহলে ঈসা মাসীহ অপবিত্র কারণ তিনি শরীয়ত পালন করতেন। খৃস্টান প্রচারকগণ অবশ্য বলতে চান যে,ঈসা মাসীহ ইহূদীদের ভয়ে শরীয়ত পালন করতেন এবং সত্য গোপন করতেন!! অর্থাৎ মুনাফিকী করতেন ও মিথ্যা বলতেন! নাঊযূ বিল্লাহ।

পাঠক, সাধু পল স্বস্বীকৃত মিথ্যাবাদী! তিনি নিজেই নিজের মিথ্যাচারের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন: “For if the truth of God hath more abounded through my lie unto his glory; why yet am I also judged as a sinner?” কিন্তু আমার মিথ্যায় যদি ঈশ্বরের সত্য তাঁহার গৌরবার্থে উপচিয়া পড়ে, তবে আমিও বা এখন পাপী বলিয়া আর বিচারিত হইতেছি কেন?” (রোমান ৩/৭) এতে প্রমাণিত হয় যে, তিনি ঈসা মাসীহ ও আল্লাহর নামে যা কিছু বলেছেন সবই মিথ্যা বলেছেন। বস্তুত এ স্বঘোষিত ও স্বস্বীকৃত মিথ্যাবাদীই ঈসা মাসীহের ধর্ম বিকৃত করেন।

আমাদের দেশে যেমন অনেক ভণ্ড ব্যক্তি বিভিন্ন ওলী-বুজুর্গ ও তরীকার নামে মানুষদেরকে বিভ্রান্ত করে, ঠিক তেমনিভাবে সাধু পল ঈসা মাসীহের পবিত্র নামটি ব্যবহার করে তার ধর্মকে বিকৃত করেন। অতিভক্তির নামে উদ্ভট কিছু তত্ত্ব চালু করেন। যে সকল বিষয় জাহান্নামের কারণ বলে ঈসা মাসীহ বলেছেন ঠিক সে সকল বিষয়কে তিনি খৃস্টধর্মের নামে মানুষদের মধ্যে চালু করেন। এভাবে তিনি মানুষদেরকে জাহান্নামী করার ব্যবস্থা করেন।

সুপ্রিয় পাঠক, যীশু বলেছেন: “কেননা ভাক্ত (ভণ্ড) খ্রীস্টেরা ও ভণ্ড নবীরা উঠিবে, এবং এমন মহৎ মহৎ চি‎হ্ন অদ্ভুত অদ্ভুত লক্ষণ দেখাইবে যে, যদি হইতে পারে, তবে মনোনীতদিগকেও ভুলাইবে।” (মথি ২৪/২৪) “সেই দিন অনেকে আমাকে বলিবে, হে প্রভু, হে প্রভু, আপনার নামেই আমরা কি ভাববাণী বলি নাই? আপনার নামেই কি ভূত ছাড়াই নাই? আপনার নামেই কি অনেক পরাক্রম-কার্য করি নাই? তখন আমি তাহাদিগকে স্পষ্টতই বলিব, আমি কখনও তোমাদিগকে জানি নাই; হে অধর্মাচারীরা, আমার নিকট হইতে দূর হও।” (মথি ৭/১৫-২৩)

এ বিষয়ে যীশুর বক্তব্যগুলি পর্যালোচনা করলে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, সাধু পল একজন ভণ্ড ছিলেন। বিশেষত বাইবেলে ভণ্ডদের দুটি চিহ্ন উল্লেখ করা হয়েছে: (১) ভণ্ড প্রচারকের অপমৃত্যু হবে এবং (২) তার ভবিষ্যদ্বাণী সফল হবে না। (দ্বিতীয় বিবরণ ১৮/১৭-২২) এ দুটি চিহ্নই সাধু পলের ক্ষেত্রে কার্যকর হয়েছে।

(১২) অভিশপ্ত

সাধু পল তাঁর এ মিথ্যানির্ভর “শরীয়তমুক্ত” সহজ “মারফতী” ধর্মকে ঈসা মাসীহের ধর্ম বলে প্রতিষ্ঠিত করতে অতিভক্তির নামে এভাবে তাঁকে “অপবিত্র” বলে প্রমাণ করেই ক্ষান্ত হন নি; উপরন্ত তাঁকে “অভিশপ্ত” বলে ঘোষণা করেছেন। তাঁর মতে দুটি কারণে তিনি অভিশপ্ত: (১) তিনি শরীয়ত মানতেন; আর যে শরীয়ত মানে সে অভিশপ্ত। (২) তিনি ক্রুশে মরেছেন; আর তাওরাতের বিধানে ক্রুশে মৃত ব্যক্তি অভিশপ্ত। এ বিষয়ে সাধু পল গালাতীয় পত্রের ১০-১৩ শ্লোকে লিখেছেন: “বাস্তবিক যাহারা ব্যবস্থার ক্রিয়াবলম্বী, তাহারা সকলে শাপের অধীন (অভিশপ্ত)… খৃস্টই মূল্য দিয়া আমাদিগকে ব্যবস্থার শাপ হইতে মুক্ত করিয়াছেন, কারণ তিনি আমাদের নিমিত্তে শাপস্বরূপ হইলেন। কেননা লেখা আছে, যে ব্যক্তিকে গাছে টাঙ্গান যায়, সে শাপগ্রস্ত।”

(১৩) শাপগ্রস্থ থিওরি ও প্রচলিত খৃস্টধর্ম

সাধু পলের ধর্মই শেষ পর্যন্ত খৃস্টানধর্ম বলে প্রচলিত হয়ে যায়। তাঁর এ “শাপগ্রস্থ” থিওরিই এ ধর্মের মূল বিশ্বাস। এ ধর্মের মূল বিশ্বাস নিম্নরূপ:

“আদম নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ করে মহাপাপ করেন। এজন্য কিয়ামত পর্যন্ত সকল আদমসন্তান মহাপাপী ও অনন্ত নরকের বাসিন্দা হয়ে যায়। ‘পিতার অপরাধে সকল আদম-সন্তানের নরক-গমনের’ এ “দয়াময়” ব্যবস্থায় দয়াময় স্রষ্টা অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে পড়েন। মানুষদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করার কোনো উপায় না পেয়ে তিনি নিজের পুত্রকে কুরবানী করার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ, আদম যে পাপ করেছেন তার জন্য কাফ্ফারা দিতে হবে। কিন্তু পাপী নিজে বা তার শতকোটি সন্তানে কাফফারা দিলে হবে না। বরং নিরপরাধ-নিষ্পাপ কাউকে ধরে কুরবানী দিতে হবে। এজন্য স্রষ্টা নিজের আপন পুত্রকে কুরবানি হিসেবে পৃথিবীতে পাঠান। তিনি ক্রুশে মরে অভিশপ্ত হয়ে নরকে প্রবেশ করেন। তিনদিন নরকভোগ করেন এবং শয়তানের হাত থেকে নরকের চাবি কেড়ে নিয়ে মানুষদেরকে চিরতরে মুক্ত করে দেন। এখন মানুষ যত পাপই করুক না কেন যীশুকে বিশ্বাস করলেই নরক থেকে চিরমুক্তি!”

সম্মানিত পাঠক, আপনিই চিন্তা করুন! এ সকল বিশ্বাসের মাধ্যমে কি আমরা মহান স্রষ্টা ও তাঁর মহান রাসূল ঈসা মাসীহের মর্যাদা বৃদ্ধি করলাম না তাঁদেরকে অপমানিত করলাম? মহান আল্লাহ একের অপরাধে অন্যকে শাস্তি দিবেন! বান্দা অপরাধ করে ক্ষমা চাইলেও তিনি তাঁকে ক্ষমা করতে পারবেন না! অপরাধী নিজে কাফ্ফারা দিলে হবে না, পাপীর অপরাধে নিষ্পাপকে ধরে কুরবানী দিতে হবে! মানুষদেরকে শরীয়তের সকল বিধান থেকে মুক্তি দিতে স্বয়ং আল্লাহকে ক্রুশবৃদ্ধ হয়ে মরে অভিশপ্ত হতে হবে? তা না হলে তিনি মানুষদেরকে শরীয়ত লঙ্ঘনের পারমিশন দিতে পারবেন না? ঈশ্বরকে জাহান্নামে পুড়তে হবে? কোনো পাগলে কী এরূপ চিন্তা করতে পারে?

একজন খৃস্টান লেখক লিখেছেন: “No heathen tribe has conceived so grotesque an idea, involving as it does the assumption, that man was born with a hereditary stain uopn him, and that this stain (for wihch he was not personally responsible) was to be atoned for, and that the creator of all things had to sacrifice His only begotten son to neutralise this mysterious curse.”

“কোনো নাস্তিক পাপাচারী উপজাতিও এরূপ উদ্ভট বিশ্বাস পোষণ করে না যে, মানুষ বংশগতভাবে পাপের কলঙ্ক নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, এবং এ কলঙ্ক, যার জন্য সে নিজে কোনোরূপ দায়ী নয়, তার জন্য কাফ্ফারা দিতে হবে এবং এ অদ্ভুত রহস্যময় অভিশাপকে অকার্যকর করতে সকল কিছুর স্রষ্টা নিজের একমাত্র ঔরসজাত সন্তানকে কুরবানী দিতে বাধ্য হলেন।” (Ahmed Deedat, The Choice, Volume 2, page 165.)

(১৪) ঈসা মাসীহ ও তাঁর শিষ্যদের বিরুদ্ধে অশ্লীলতা ও মাতলামির অপবাদ

আমরা মুসলমানরা বিশ্বাস করি যে, ঈসা (আ) ও তাঁর শিষ্যগণ সকল অশ্লীলতা ও মাদকতা থেকে পবিত্র ছিলেন। তবে প্রচলিত ইঞ্জিলে যীশু এবং তাঁর শিষ্যদের বিষয়ে আপত্তিকর কাহিনী বিদ্যমান। সামান্য কয়েকটি উদ্ধৃতি দেখুন:

(ক) লূক ৭/৩৪-৫০ “মনুষ্যপুত্র আসিয়া ভোজন পান করেন, আর তোমরা বল, ঐ দেখ, একজন পেটুক ও মদ্যপায়ী… আর দেখ, সেই নগরে এক পাপীষ্ঠা স্ত্রীলোক ছিল; সে যখন জানিতে পারিল, তিনি সেই ফরীশীর বাটীতে ভোজনে বসিয়াছেন, তখন একটি শ্বেত প্রস্তরের পাত্রে সুগন্ধি তৈল লইয়া আসিল, এবং পশ্চাৎ দিকে তাঁহার চরণের নিকটে দাঁড়াইয়া রোদন করিতে করিতে চক্ষের জলে তাঁহার চরণ ভিজাইতে লাগিল, এবং আপনার মাথার চুল দিয়া তাহা মুছাইয়া দিল, আর তাঁহার চরণ চু¤¦ন করিতে করিতে সেই সুগন্ধি তৈল মাখাইতে লাগিল। তাহা দেখিয়া, যে ফরীশী তাঁহাকে নিমন্ত্রণ করিয়াছিল সে মনে মনে কহিল, এ যদি ভাববাদী হইত, তবে জানিতে পারিত, ইহাকে যে স্পর্শ করিতেছে, সে কে এবং কি প্রকার স্ত্রীলোক, কারণ সে পাপীষ্ঠা।… পরে তিনি সেই স্ত্রীলোককে কহিলেন, তোমার পাপ সকল ক্ষমা হইয়াছে।..তোমার বিশ্বাস তোমাকে পরিত্রাণ করিয়াছে; শান্তিতে প্রস্থান কর।”

(খ) যোহন ১১/১-৫: “বৈথনিয়ায় এক ব্যক্তি পীড়িত ছিলেন, তাহার নাম লাসার; তিনি মরিয়ম ও তাঁহার ভগিনী মার্থার গ্রামের লোক। ইনি সেই মরিয়ম, যিনি প্রভুকে সুগন্ধি তৈল মাখাইয়া দেন, এবং আপন কেশ দিয়া তাঁহার চরণ মুছাইয়া দেন; তাঁহারই ভ্রাতা লাসার পীড়িত ছিলেন। … যীশু মার্থাকে ও তাঁহার ভগিনীকে এবং লাসারকে প্রেম করিতেন।”

(গ) লূক ৮/১-৩: “ইহার পরেই তিনি ঘোষণা করিতে করিতে এবং ঈশ্বরের রাজ্যের সুসমাচার প্রচার করিতে করিতে নগরে নগরে ও গ্রামে গ্রামে ভ্রমণ করিলেন, আর তাঁহার সঙ্গে সেই বারো জন, এবং যাঁহারা দুষ্ট আত্মা কি¤¦া রোগ হইতে মুক্ত হইয়াছিলেন, এমন কয়েক জন স্ত্রীলোক ছিলেন, মºলীনী নাম্মী মরিয়ম, যাঁহা হইতে সাতটি ভূত বাহির হইয়াছিল, যোহানা, যিনি হেরোদের বিষয়াধ্যক্ষ কূষের স্ত্রী, এবং শোশন্না ও অন্য অনেক স্ত্রীলোক ছিলেন; তাঁহারা আপন আপন স¤পত্তি হইতে তাঁহাদের পরিচর্যা করিতেন।”

(ঘ) নিস্তারপর্বের পূর্বে যীশুর মদপান প্রসঙ্গে যোহন ১৩/৪-৫: “তিনি ভোজ হইতে উঠিলেন, এবং নিজ পোশাকাদি খুলিয়া রাখিলেন আর একখানি গামছা লইয়া লুঙ্গির মত পরিধান করিলেন (KJV: laid aside his garments; and took a towel, and girded himself. RSV: laid aside his garments; and girded himself with a towel. উপরের বস্ত্র খুলিয়া রাখিলেন, আর একখানি গামছা লইয়া কটি বন্ধন করিলেন।) পরে তিনি পাত্রে জল ঢালিলেন ও শিষ্যদের পা ধুইয়া দিতে লাগিলেন, এবং যে গামছা তিনি পরিধান (কেরি: কটিবন্ধন) করিয়াছিলেন তাহা দিয়া মুছাইয়া দিতে লাগিলেন।”

পাঠক, ইঞ্জিল শরীফের আলোকে ঈসা মাসীহের পরিচয়-১ এর উপরের উদ্ধৃতিগুলি দেখলেন। এবার নিম্নের বিষয়গুলি বিবেচনা করুন:

কিতাবুল মুকাদ্দাসের বর্ণনায় দ্রাক্ষারস বা মদ ঈশ্বরের দৃষ্টিতে মন্দ। এজন্যই ঈশ্বর হারোণ ও তার সন্তানদের জন্য সমাগম-তাম্বুতে প্রবেশের সময় মদপান করা চিরস্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। (লেবীয় ১০/৮)। সরা-নিবাসী মানোহ নামক ব্যক্তির স্ত্রীকে ফিরিশতারা গর্ভকালীন সময়ে মদপান করতে নিষেধ করেন; যেন মায়ের পান করা মদের অশুচিতা তার গর্ভস্থ সন্তানকে স্পর্শ না করে। (বিচারকতৃগণ ১৩/৪-১৪) যিশাইয় নবী মদপানকারীর নিন্দা করেছেন এবং উল্লেখ করেছেন যে, ভাববাদীগণ ও যাজকগণ মদ ও সুরা পানের কারণে বিভ্রান্ত ও ধর্মচ্যুত হয়েছেন। (যিশাইয় ৫/২২, ২৮/৭)। কিতাবুল মুকাদ্দাসের বক্তব্য: “দ্রাক্ষারসের (মদের) প্রতি দৃষ্টিপাত করিও না, যদিও উহা রক্তবর্ণ, যদিও উহা পাত্রে চক্মক্ করে, যদিও উহা সহজে গলায় নামিয়া যায়; অবশেষে উহা সর্পের ন্যায় কামড়ায়, বিষধরের ন্যায় দংশন করে।” (হিতোপদেশ ২৩/৩১-৩২)

তাহলে কীভাবে যীশু ও শিষ্যগণ এভাবে মদপান করতেন? তাঁরা কি কিতাবুল মুকাদ্দাসের এ সকল নির্দেশ জানতেন না? নাকি অমান্য করতেন? সমালোচকগণ বলেন যে, যীশু ও প্রেরিতগণ মদপানে এত বেশি অভ্যস্ত ছিলেন যে, মানুষেরা তাদেরকে মদ্যপ বলত। বিশেষত নিস্তারপর্বে পোশাক খুলে গামছা পরার বিষয়ে তারা বলেন, এ কথা থেকে মনে হয়, যীশু এ সময়ে এমন মাতাল হয়েছিলেন যে, তিনি কি করছিলেন তা তিনি নিজেই বুঝতে পারছিলেন না। কারণ পা ধোয়ানোর জন্য তো পোশাকাদি খুলে নগ্ন হওয়া লাগে না।” নিঃসন্দেহে এ সকল কাহিনী বানোয়াট ও জাল। জালিয়াতগণ অতিভক্তির নামে যা পেরেছে লিখেছে।

সম্মানিত পাঠক, পরিণত বয়সী নারীদের সাথে পুরুষদের একান্ত সংমিশ্রণও অত্যন্ত ভয়ঙ্কর বিপদজনক বিষয়। বিশেষত এক্ষেত্রে পুরুষ যদি যুবক, মধ্যবয়সী, অবিবাহিত ও মদ্যপ হন এবং মহিলা যদি ব্যভিচারে অভ্যস্ত হন, যুবকের ভালবাসার পাত্র হন, তার সাথে সর্বদা একত্রে চলাচল ও রাত্রিযাপন করতে থাকেন এবং নিজের সম্পদ দিয়ে সদাসর্বদা এরূপ যুবকের সেবাযতœ করতে থাকেন তবে সেক্ষেত্রে ব্যভিচার থেকে আত্মরক্ষার কোনোই আশা থাকে না।

সুপ্রিয় পাঠক, এ বিষয়ে সাধারণ মানুষদের চেয়ে ঈশ্বরের ঔরসজাত পুত্র ও মাসীহদের ভয় অনেক বেশি। কারণ বাইবেল বলে যে, সাধারণ মানুষগণ যে বিষয়ে ধৈর্য্য ধারণ করতে পারে, ঈশ্বরের পুত্র ও মাসীহ সেখানে ধৈর্য্য ধারণ করতে পারেন না, বরং অতি সামান্য কারণেই ব্যভিচার, ধর্ষণ ইত্যাদি মহাপাপে লিপ্ত হন। ঈশ্বরের ঔরসজাত পুত্র ও মাসীহ দায়ূদের অবস্থা দেখবেন পরের অনুচ্ছেদে। একজন মহিলার প্রতি একবারের দৃষ্টি পড়ার কারণে তিনি তাকে ধর্ষণ করেন এবং তার স্বামীকে হত্যা করেন! অথচ তিনি ছিলেন বিবাহিত, তাঁর ঘরে ছিল অনেকগুলি সুন্দরী স্ত্রী এবং তাঁর বয়সও ৫০ পার হয়ে গিয়েছিল!

সুপ্রিয় পাঠক, বেগানা মহিলাদের বিষয়ে বাইবেলের নির্দেশ: “বেগানা-অনাত্মীয় নারীর (KJV: strange woman কেরি: পরকীয়া স্ত্রীর) ওষ্ঠ হইতে মধু ক্ষরে, তাহার বাক্য তৈল অপেক্ষাও স্নিগ্ধ; কিন—ু তাহার শেষ ফল নাগদানার ন্যায় তিক্ত, দ্বিধার খড়্গের ন্যায় তীক্ষè। তাহার চরণ মৃত্যুর কাছে নামিয়া যায়, তাহার পদক্ষেপ পাতালে (নরকে: hell) পড়ে। (হিতোপদেশের ৫/৩-২০) “কেহ যদি বক্ষঃস্থলে অগ্নি রাখে, তবে তাহার বস্ত্র কি পুড়িয়া যাইবে না? কেহ যদি জ্বলন্ত অঙ্গারের উপর দিয়া চলে, তবে তাহার পদতল কি দগ্ধ হইবে না? তদ্রƒপ যে প্রতিবাসীর স্ত্রীর কাছে গমন করে; যে তাহাকে স্পর্শ করে, সে অদণ্ডিত (নিরপরাধ: innocent) থাকিবে না।” (হিতোপদেশের ৬/২৭-২৯) “তোমার চক্ষু বেগানা (পরকীয়া) স্ত্রীদিগকে (strange women) দেখিবে, তোমার চিত্ত কুটিল কথা কহিবে; তুমি তাহার তুল্য হইবে, যে সমুদ্রের মধ্যস্থলে শয়ন করে, যে মাস্তুলের উপরে শয়ন করে।” (হিতোপদেশ ২৩/৩৩-৩৪)

প্রিয় পাঠক, এখানে কি কিছু প্রশ্ন করা অবান্তর হবে?

কিতাবুল মুকাদ্দাসের এ কথাগুলি কি যীশু জানতেন না? তাহলে কিভাবে তিনি মরিয়মের মত বেশ্যা নারীকে তাঁকে স্পর্শ করার বা অনবরত চুম্বন করার সুযোগ দিলেন? তাঁর পূর্বপুরুষ ঈশ্বরের ঔরসজাত পুত্র ও মাসীহ দায়ূদের কথা তাঁর মনে পড়ল না? তিনি কিভাবে ভুলে গেলেন যে, নারীকে স্পর্শ করে অদণ্ডিত বা নিরপরাধ থাকা যায় না, যেমন কেউ বক্ষঃস্থলে অগ্নি রাখলে তার বস্ত্র না পুড়ে পারে না এবং কেউ জ্বলন্ত অঙ্গারের উপর দিয়ে চললে তার পা না পুড়ে পারে না!

প্রিয় পাঠক, একটু কল্পনা করুন! আপনার সমাজে একজন হুজুর, ঠাকুর বা পাদরি, গোনাহ মাফের পাইকারী ওয়াদা দিয়ে নারীদেরকে কাছে টানছে, একান্ত খেদমত নিচ্ছে, একসাথে সফর এবং বসবাস করছে! আপনি তার বিষয়ে কী বলবেন? বিশ্বাস খুবই ভাল বিষয়, কিন্তু সেজন্য একজন নারী একজন যুবক ধর্মগুরুকে অনবরত চুমু খাবে? নিজের চুল দিয়ে পা মোছাবে?

প্রিয় পাঠক, একজন সুপরিচিতা বেশ্যা, যে ইতোপূর্বে গোপনে বা প্রকাশ্যে তওবা করেনি বা তার পাপের পথ থেকে ফিরে আসেনি। এরূপ একজন বেশ্যাকে একজন পাদরি, পুরোহিত বা হুজুর অনুমতি দিলেন যে, তিনি যখন তার কোনো বন্ধুর বাড়িতে অতিথি হবেন তখন সে উপস্থিত সকলের সামনে তাঁর পদযুগল ধুইয়ে দেবে এবং অনবরত চুম্বন করবে। বিষয়টি কি খুব মানানসই হবে?

যীশু মরিয়মকে প্রেম করতেন। এ প্রেমকৃত রমণী ও অন্যান্য অনেক নারীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি পথে পথে চলতেন ও রাত্রিযাপন করতেন। এ সকল রমণী তাঁর সেবাযতœ করত। এরূপ অবাধ সংমিশ্রণ ও রাত্রিযাপনের পরেও যীশু বা তাঁর প্রেরিতদের পদস্খলন হয় নি? বিশেষত, কিতাবুল মুকাদ্দাসে আমরা দেখব যে, নবীগণ, নবী-সন্তানগণ, খোদার বেটাগণ ও মসীহগণের পদস্খলন সবচেয়ে বেশি।

এক্ষেত্রে প্রেরিতগণের পদস্খলনের আশঙ্কা অধিকতর। কারণ খৃস্টান পণ্ডিতগণ দাবি করেন যে, যীশুর ঊর্ধ্বারোহণের পূর্বে তারা বিশ্বাসের পূর্ণতা লাভ করতে পারেন নি। পরবর্তী যুগের খৃস্টান সাধু, পাদরি ও বিশপগণের অবস্থা দেখলে তা বুঝা যায়। মধ্যযুগে তাদের গীর্জাগুলি বেশ্যালয়ের মতই ব্যভিচারের কারখানায় পরিণত হয়েছিল। বর্তমানেও খৃস্টান দেশগুলিতে পাদরিগণের যৌন কেলেঙ্কারী ও শিশু ধর্ষণ উইরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় অন্যতম আলোচিত বিষয়।

প্রিয় পাঠক, মুসলিমগণ বলেন যে, এ গল্গগুলি জাল। আর নাস্তিকরা বলেন, যীশু ও তার প্রেরিতগণের বিবাহের প্রয়োজন হয় নি; কারণ এ সকল মহিলার মাধ্যমে তাঁরা তাদের বিবাহের প্রয়োজন মিটিয়ে নেন । ঠিক যেভাবে ক্যাথলিক পাদরি, বিশপ ও পুরোহিতগণের বিবাহের প্রয়োজন হয় না।

প্রিয় পাঠক, আপনি কোন্ মতটি অধিকতর গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন?

ঙ. যোহন ১৩/২১-২৪ “এই কথা বলিয়া যীশু আত্মাতে উদ্বিগ্ন হইলেন, আর সাক্ষ্য দিয়া কহিলেন, সত্য, সত্য, আমি তোমাদিগকে বলিতেছি, তোমাদের মধ্যে এক জন আমাকে সমর্পণ করিবে। শিষ্যেরা এক জন অন্যের দিকে চাহিতে লাগিলেন, স্থির করিতে পারিলেন না, তিনি কাহার বিষয় বলিলেন। তখন যীশুর শিষ্যদের এক জন, যাঁহাকে যীশু প্রেম করিতেন, তিনি তাঁহার কোলে হেলান দিয়া বসিয়া ছিলেন (there was leaning on Jesus’ bosom one of his disciples, whom Jesus loved)| তখন শিমোন পিতর তাঁহাকে ইঙ্গিত করিলেন ও কহিলেন, বল, উনি যাহার বিষয় বলিতেছেন, সে কে? তাহাতে তিনি সেইরূপ বসিয়া থাকাতে যীশুর বক্ষঃস্থলের দিকে পশ্চাতে হেলিয়া বলিলেন, প্রভু, সে কে? (He then lying on Jesus’ breast saith unto him, Lord, who is it?) যীশুর এ শিষ্যের বিষয়ে বাইবেলে বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে যে, যীশু তাকে ‘প্রেম’ করতেন। (যোহন ১৯/২৬, ২০/২, ২১/৭)

পাঠক, কল্পনা করুন! একজন ধর্মগুরু বসে আছেন। তার একজন প্রেমকৃত শিষ্য তারই কোলে হেলান দিয়ে বসে আছেন। আবার কিছু জিজ্ঞাসা করতে স্ত্রী যেমন স্বামীর বুকের মধ্যে মাথা এগিয়ে আদর করে কিছু জানতে চায় সেভাবেই তিনি জানতে চাচ্ছেন। কেউ একে নোংরা অর্থে ব্যাখ্যা করলে কি দোষ দেওয়া যায়?

কিতাবুল মুকাদ্দাসের বর্ণনায় নবীগণ

কিতাবুল মুকাদ্দাসে সকল নবী রাসূলকে এবং নবী-সন্তানদেরকে খারাপভাবে চিত্রিত করা হয়েছে। যেমন, তাঁরা ছিলেন ব্যভিচারী ও ধর্ষক , মদ্যপ , মিথ্যাবাদী , তাঁরা মানুষের মল ও গোবিষ্ঠা ভক্ষণ করতেন , উলঙ্গ হয়ে চলাফেরা করতেন , মদপান করে উলঙ্গ হতেন , মূর্তিপূজা করতেন , ..ইত্যাদি।

যে পাপের কথা চিন্তা করলেও গা শিউরে উঠে এবং যে পাপ করতে পাপীও রাজি হয় না সে পাপও নবীগণ ও তাদের সন্তানগণ করতেন বলে বাইবেলে বলা হয়েছে। যেমন নিজের কন্যাদের সাথে ব্যভিচার করা , পিতার স্ত্রীকে ধর্ষণ করা , নিজের বোনকে ধর্ষণ করা , সকল মানুষের সামনে নিজের পিতার স্ত্রীগণকে গণধর্ষণ করা নিজের পুত্রবধুর সাথে ব্যভিচার করা ইত্যাদি।

এত পাপাচারের পরেও ঈশ্বর তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করেন নি। বাইবেলের বর্ণনা অনুসারে জারজ সন্তানদের প্রতি ঈশ্বরের মায়া মনে হয় একটু বেশিই। ঈশ্বরের ঔরষজাত দুই পুত্র ও দুই মাসীহ দায়ূদ ও ঈসা জারজ সন্তানের বংশধর। (দ্বিতীয় বিবরণ: ২: ১৭-১৯ এবং ২০: ১৩-১৬, মথি: ১: ১-৩)।

ঈশ্বরের পুত্র ও মাসীহ কর্তৃক ব্যভিচার-ধর্ষণ ও হত্যা

সকল নবীর বিষয় বিস্তারিত বলা সম্ভব হচ্ছে না। একজনের কথা লিখছি। ইহূদী-খৃস্টানদের প্রাণপুরুষ দাউদ (আ)। দাউদের বংশধর হওয়া যীশুখৃস্টের শ্রেষ্ঠ গৌরব ও অন্যতম পরিচয়। বাইবেলের ভাষ্যে দায়ূদ ঈশ্বরের একমাত্র বা প্রথমজাত পুত্র, ঔরসজাত পুত্র এবং ঈশ্বরের মাসীহ। যাবুর-এর ২/৭ শ্লোকে বলা হয়েছে: “সদাপ্রভু আমাকে কহিলেন, তুমি আমার পুত্র, অদ্য আমি তোমাকে জন্ম দিয়াছি (Thou art my Son; this day have I begotten thee)” যাবূরের ৮৯/২০-২৭: “আমার দাস দায়ূদকেই পাইয়াছি, আমার পবিত্র তৈলে তাহাকে অভিষিক্ত করিয়াছি (with my holy oil have I anointed him) ।…সে আমাকে ডাকিয়া বলিবে, তুমি আমার পিতা, আমার ঈশ্বর (Thou art my father, my God)… আবার আমি তাহাকে প্রথমজাত (my firstborn) করিব ..।”

এভাবে দায়ূদকে অভিষিক্ত অর্থাৎ মাসীহ (Christ, Anointed, Messiah), ঈশ্বরের ঔরসজাত পুত্র (begotten son) ও প্রথমজাত পুত্র (firstborn) বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁকেও বাইবেলে ব্যভিচারী ও ধর্ষক বলে চিত্রিত করা হয়েছে। উরিয়া নামে দাউদের এক প্রতিবেশী ছিলেন। তিনি যুদ্ধের ময়দানে যুদ্ধরত ছিলেন। দায়ূদ উরিয়ার স্ত্রীকে এক নজর দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকে ধর্ষণ করেন। মহিলা এ ধর্ষণে গর্ভবতী হয়ে যান। দায়ূদ সেনাপতিকে চিঠি লিখে কৌশলে উরিয়াকে হত্যা করান এবং উক্ত মহিলাকে বিবাহ করেন। (২ শমূয়েল: ১১/১৪: ১৭)

ধর্ষণ ও হত্যা একত্রে! একজন সাধারণ পাপীও এমন করবেন না। একজন সাধারণ পাপী বয়স্ক মানুষ, যার অর্ধশতাধিক স্ত্রী বিদ্যমান, তিনি একজন মহিলাকে একনজর দেখেই তাকে ধর্ষণ করতে ব্যস্ত হবেন এবং তাঁর স্বামীকে হত্যা করবেন?

তাওরাতে বিধান ব্যভিচারীকে প্রস্তর নিক্ষেপ করে হত্যা করতে হবে। কিন্তু তাওরাতের ঈশ্বর অপরাধীর চেহারা দেখে বিচার করেন বলে মনে হয়। সম্ভবত দায়ূদ যেহেতু ঈশ্বরের পুত্র ও মাসীহ, সেহেতু ঈশ্বর দাউদের অপরাধের জন্য শাস্তি দিলেন দায়ূদের বৈধ স্ত্রীদেরকে। তিনি দায়ূদকে বলেন, তুমি যেহেতু ব্যভিচার ও হত্যায় লিপ্ত হলে, সেহেতু তোমার সামনে তোমার স্ত্রীদের গণধর্ষণের ব্যবস্থা করব। কী অদ্ভুত বিচার ব্যবস্থা!! একটি পাপের শাস্তি হিসেবে আরেকটি পাপের ব্যবস্থা ও ধর্ষকের শাস্তি হিসেবে নিরপরাধকে ধর্ষণের ব্যবস্থা করা!! (২ শমূয়েল ১২: ১১-১২)

কিতাবুল মুকাদ্দাসের বর্ণনায় স্রষ্টার গুণাবলি

আমরা জানি যে, মহান আল্লাহ সর্বশক্তিমান, সবকিছু জানেন ও শুনেন, সকল মানবীয় দুর্বলতা থেকে মুক্ত, তিনি দয়াময় ও ন্যায় বিচারক। কিন্তু বাইবেল আল্লাহর নামে অনেক অশোভন কথা বলা হয়েছে। সামান্য নমুনা দেখুন:

(১) অনেক কিছুই দেখতে, শুনতে বা জানতে পারেন না

বাইবেলের বর্ণনানুসারে স্রষ্টা অনেক কিছুই জানতে, দেখতে বা শুনতে পারেন না। কেউ গাছের আড়ালে গেলে তাকে দেখতে পান না; বরং তাকে ডেকে প্রশ্ন করতে বাধ্য হন যে, তুমি কোথায় (আদিপুস্তক ৩/৯)। দূরের মানুষদের অবস্থা দেখতে তাকে নিচে নেমে আসতে হয় (আদিপুস্তক ১১/৫)। পৃথিবীর মানুষদের চিৎকার তাঁর কানে পৌঁছালেও তাদের কর্ম তিনি দেখতে পান না। অর্থাৎ তাঁর শ্রবণ শক্তির চেয়ে দর্শন শক্তি দুর্বল (আদিপুস্তক ১৮/২০-২১)

(২) না জেনে কর্ম করে ও মাসীহ বানিয়ে পরে আফসোস করেন

বাইবেলের ভাষ্যে মহান আল্লাহ না বুঝেই কাজ করেন এবং পরে আফসোস-অনুশোচনা এবং মনের ব্যথায় কষ্ট পান। মানুষ সৃষ্টি করার পর যখন মানুষেরা পাপ কর্ম করতে থাকে তখন তিনি মানুষ সৃষ্টি করে ভুল করেছেন ভেবে আফসোস করেন এবং মনের ব্যথ্যায় কষ্ট পেতে থাকেন। (আদিপুস্তক ৬/৬-৭)। তিনিই তালূত বা শৌলকে ইহূদীদের রাজা বানান এবং তাকে মাসীহ বা খৃস্ট হিসেবে অভিষিক্ত করেন। রাজা হয়ে এ মাসীহ যে অন্যায় করবে তা তিনি বুঝতে পারেন নি! রাজা হওয়ার পরে তালূত অন্যায় করলে খোদা আফসোস-অনুশোচনায় ভেঙ্গে পড়েন! (১ শমূয়েল-এর ১৫ অধ্যায়ের ১১ ও ৩৫ শ্লোক)

(৩) নিরপরাধ সৃষ্টিকে শাস্তি এবং নির্বিচারে অত্যাচার ও ধ্বংস

কিতাবুল মুকাদ্দাসের ভাষ্যে আল্লাহ বিনা অপরাধে তাঁর সৃষ্টিকে শাস্তি দেন, ধ্বংস করেন, একের অপরাধে অন্যকে শাস্তি দেন, সামান্য অপরাধে ভয়ঙ্কর শাস্তি দেন, অন্যায় বিচার করেন, অপরাধীকে ভালবাসেন কিন্তু নিরপরাধকে অভিশপ্ত করেন, জালিমের পক্ষে মাযলুমের বিরুদ্ধে ফয়সালা দেন!!! (নাঊযু বিল্লাহ)

তিনি মানুষের পাপের অপরাধে নিরপরাধ পশু-পাখীকে ধ্বংস করেন (আদিপুস্তক ৬/৬-৭)। বৈৎ-শেমস গ্রামের মধ্য দিয়ে ইহূদীদের পবিত্র সিন্দুকটি নিয়ে যাওয়ার সময় গ্রামবাসী সিন্দুকটির দিকে দৃষ্টিপাত করে। এ অপরাধে আল্লাহ সেই গ্রামের ৫০ হাজার ৭০ জনকে হত্যা করেন! (১ শমূয়েল ৬/১৯)।

আল্লাহর একটি হুকুম অমান্য করায় ইহূদী জাতির সকল নেতা ও গোত্রপতিকে শুলে চড়িয়ে হত্যা করেন এবং ২৪ হাজার মানুষকে মহামারীতে ধ্বংস করেন। (গণনা পুস্তক ২৫/৪-৯)। ইহূদীদেরকে তিনি নির্দেশ দেন, ইহূদীদের চেয়েও বড় ৭ টি জাতির সকল নারী, পুরুষ, শিশু, কিশোর লক্ষলক্ষ মানুষকে নির্দয়ভাবে গণহত্যা করতে (দ্বিতীয় বিবরণ ৭/২-১৬)।

অনুরূপভাবে শমরীয়দের গণহত্যা করতে, বিশেষভাবে ‘শিশুদেরকে আছড়াইয়া খণ্ড খণ্ড’ করতে এবং ‘গর্ভবতী স্ত্রীলোকদের উদর বিদীর্ণ’ করতে নির্দেশ প্রদান করেন (হোশেয়র পুস্তকের ১৩/১৬)।

বাইবেলের বর্ণনায় দেখা যায় যে, মহান আল্লাহ অপরাধীর অপরাধের জন্য নিরপরাধকে শাস্তি দেন। এমনকি পিতার অপরাধের কারণে ৪ পুরুষ পর্যন্ত বংশধরগণ শাস্তি পাবে বলে বিধান দিয়েছেন। (যাত্রাপুস্তক ৩৪/৭) এমনকি ৯/১০ পুরুষ আগের পূর্বপুরুষের অপরাধের কারণে ৪০০ বৎসর পরের উত্তরপুরুষদের প্রতিটি মানুষকে এবং সকল সম্পদকে নির্দয়ভাবে ধ্বংস করতে নির্দেশ দেন। এমনকি “স্ত্রী ও পুরুষ, বালক-বালিকা ও স্তন্যপায়ী শিশু, গরু ও মেষ, উষ্ট্র ও গর্দভ সকলকেই বধ” করতে নির্দেশ দেন। (১ শমূয়েল ১৫/১-৩)

অন্য গল্পে নূহ (আ) মদপান করে মাতাল হয়ে উলঙ্গ হন (নাঊযু বিল্লাহ)। তাঁর ছোট ছেলে হাম হঠাৎ পিতাকে উলঙ্গ অবস্থায় দেখে ফেলেন। মাতলামি কাটার পর বিষয়টি জেনে নূহ (আ) ক্রুদ্ধ হয়ে হামের ছেলে কনানকে ভয়ঙ্কর অভিশাপ দেন এবং ঈশ্বর সে অভিশাপ বাস্তবায়ন করেন!!!! (আদিপুস্তক ৯/১৮-২৫)

সম্মানিত পাঠক, খৃস্টান প্রচারকগণ দাবি করেন যে, তাদের ধর্ম দয়ার ধর্ম। এখানে বাইবেলীয় ঈশ্বরের দয়া ও ইনসাফের নমুনা দেখুন। মাতাল হয়ে উলঙ্গ হওয়ায় নূহের কোনো অপরাধ হলো না কিন্তু অসতর্কভাবে তা দেখে ফেলায় হামের অপরাধ হলো। ভয়ঙ্কর বিষয় হলো অপরাধ করলো হাম কিন্তু অভিশাপ ও শাস্তি পেল হামের এক ছেলে কনান!! আরো মজার ব্যাপার হলো অপরাধী হামের চারটি পুত্র ছিল: কূশ, মিসর, পূট ও কনান। (আদিপুস্তক ১০/৬) তাদের মধ্য থেকে শাস্তির জন্য শুধু কনানকে বেছে নেওয়ার কারণটিই বা কী?

এরূপ জুলুম, প্রতারণা করে নিরপরাধ মানুষদেরকে গণহত্যা, অপরাধীকে শাস্তি না দেওয়া, নিরপরাধকে শাস্তি দেওয়া ইত্যাদি বিষয়ে অগণিত গল্প পবিত্র বাইবেলে রয়েছে। সব লিখতে গেলে আরেকটি বাইবেল হয়ে যাবে।

(৪) অন্ধের মত আশীর্বাদ, জালিমকে প্রেম ও মাজলুমকে ঘৃণা

ইসহাক নবীর দুই ছেলে: বড় ছেলে এযৌ ও ছোটে ছেলে ইয়াকুব। ইসহাক তার বড় ছেলে এযৌকে ভালবাসতেন। বৃদ্ধ বয়সে ইসহাক অন্ধ হয়ে যান। তিনি আল্লাহর বিধান মত বড় ছেলে এযৌকে আশীর্বাদ করে “গদ্দীনশীন” করতে চান। কিন্তু ইয়াকূব প্রতারণা করে এযৌ-এর বেশ ধরে পিতার কাছে এসে আশীর্বাদ প্রার্থনা করলে ইসহাক না বুঝে এযৌ মনে করে তাকে আশীর্বাদ করেন। (আদিপুস্তক ২৭ অধ্যায়) মজার কথা হলো, ইসহাক অন্ধ হওয়ার কারণে এযৌ ভেবে ইয়াকুবকে আশীর্বাদ করলেন এবং ঈশ্বরও অন্ধের মতই তা কবুল করে নিলেন। প্রতারককে শাস্তি দেওয়া তো দূরের কথা, ইশ্বর ঘোষণা দিয়ে বললেন কোনো অপরাধ ছাড়াই তিনি এযৌকে ঘৃণা করলেন, শাস্তি দিলেন এবং অপরাধী প্রতারক ইয়াকূবকে প্রেম করলেন (মালাখি ১ম অধ্যায়: ২-৩)

(৫) মিথ্যাবাদিতা

বাইবেলের ভাষ্যে আল্লাহ মিথ্যা বলেন এবং তাঁর প্রিয় বান্দাদের মিথ্যা বলতে নির্দেশ দেন। (যাত্রাপুস্তক৩/১৭-১৮, ৫/৩, ১১/২, ১২/৩৫, ১ শমূয়েল ১৬/১-৪)

(৬) মানুষের সাথে ঈশ্বরের মল্লযুদ্ধ

আল্লাহ সারা রাত ধরে ইয়াকুবের (আ) সাথে রেসলিং বা মল্লযুদ্ধ করেন!! শেষ রাতে ইয়াকুব তাকে ছেড়ে দেন!! এজন্য ইয়াকূবের নাম হলো “ইস্রায়েল” অর্থাৎ আল্লাহর সাথে মল্লযুদ্ধকারী!!! (আদিপুস্তক ৩২/২৪-৩০)

(৭) উদ্ভট ও অদ্ভুৎ সব বিধান

লেবীয় ১৫: “২ পুরুষের শরীরে প্রমেহ running issue/ RSV discharge from his body হইলে সেই প্রমেহে সে অশুচি হইবে … ৭ আর যে কেহ প্রমেহীর গাত্র স্পর্শ করে সে আপন বস্ত্র ধৌত করিবে, জলে স্নান করিবে এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত অশুচি থাকিবে।…“১২ আর প্রমেহী যে কোন মাটির পাত্র স্পর্শ করে, তাহা ভাঙ্গিয়া ফেলিতে হইবে, ও সকল কাষ্ঠপাত্র জলে ধৌত হইবে। … ১৬ আর যদি কোন পুরুষের রেতঃপাত হয়, তবে সে আপনার সমস্ত শরীর জলে ধৌত করিবে, এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত অশুচি থাকিবে। …১৯ আর যে স্ত্রীর মাসিক হয় তাহার শরীরস্থ রক্ত ক্ষরিলে সাত দিবস তাহার অশৌচ থাকিবে এবং যে কেহ তাহাকে স্পর্শ করে সে সন্ধ্যা পর্যন্ত অশুচি থাকিবে। …. ২১ আর যে কেহ তাহার শয্যা স্পর্শ করিবে সে আপন বস্ত্র ধৌত করিবে, জলে স্নান করিবে এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত অশুচি থাকিবে। ২২ আর যে কেহ তাহার বসিবার কোন আসন স্পর্শ করে, সে আপন বস্ত্র ধৌত করিবে, জলে স্নান করিবে, এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত অশুচি থাকিবে। ২৩ আর তাহার শয্যার কিম্বা আসনের উপর কোনো কিছু থাকিলে যে কেহ তাহা স্পর্শ করে, সে সন্ধ্যা পর্যন্ত অশুচি থাকিবে…।”

অদ্ভুৎ সব বিধান! মাটির পাত্র ভেঙ্গে ফেলা অকারণে সম্পদ নষ্ট করা ছাড়া কিছুই নয়। এ কথা তো স্পষ্ট যে, এরূপ ব্যক্তি কোনো একটি পাত্র স্পর্শ করলেই সে পাত্রের মধ্যে রোগব্যধি বা অপবিত্রতা ছড়িয়ে পড়বে এরূপ চিন্তা করার কোনো ভিত্তি নেই। এরপরও যদি কল্পনা করা হয় যে, উক্ত পাত্রের মধ্যে অসুস্থতা বা অপবিত্রতা ছড়িয়ে পড়েছে, তবে সেক্ষেত্রে তো পাত্রটি ধৌত করলেই হত, যেমনভাবে কাঠের পাত্র ধৌত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ভেঙ্গে ফেলার কী প্রয়োজন?

দ্বিতীয় বিধানটি দেখুন! রেতঃপাতের পরে সমস্ত শরীর জলে ধৌত করার পরেও সন্ধ্যা পর্যন্ত অশুচি থাকার অর্থ কি? তৃতীয় বিধানটিও অদ্ভুৎ ও উদ্ভট! ঋতুবতী রমণী কোনা কিছুর উপর বসলেই তাতে তার ঋতুস্রাবের রক্ত লেগে যাওয়া জরুরী নয়। এরপর সে আসন স্পর্শ করলে স্পর্শকারীর দেহের মধ্যে ঋতুস্রাবের রক্ত বা অপবিত্রতা ছড়িয়ে পড়ে বলে চিন্তা করার কি কোনোরূপ ভিত্তি আছে? এরপরও যদি কল্পনা করা হয় যে, স্পর্শকারীর দেহের মধ্যে অপবিত্রতা সঞ্চারিত হয়েছে, তবে স্পর্শকারীর দেহ ও কাপড়চোপড় পুরোপুরি ধৌত করলেই তো হল। দেহ ও পোশাক ধৌত করার পরেও সন্ধ্যা পর্যন্ত তার অশুচি থাকার অর্থ কি? সবচেয়ে মজার বিষয় যে, কোনো পুরুষ যদি স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় বা স্বপ্নে রেতঃপাত করে তবে তাকে তার পোশাক ধৌত করতে হয় না, শুধু নিজে স্নান করলেই হবে। অথচ ঋতুবতীর আসন স্পর্শ করলে তাকে স্নান করা ছাড়াও নিজের পোশাকও ধৌত করতে হবে।

বাইবেলের এ সকল বিধানের আলোকে প্রমাণিত হয় যে, পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে অশুচি ও অপবিত্র মানুষ হচ্ছেন খৃস্টানগণ; কারণ তারা এ সকল বিধান কোনোভাবে পালন করেন না বা তোয়াক্কা করেন না।

ঈসা মাসীহের ধর্ম বনাম সাধু পলের প্রচারিত “ঈসায়ী ধর্ম” বা “খৃস্টধর্ম”

সুপ্রিয় পাঠক, খৃস্টান প্রচারকগণ বলেন যে, তাঁরা ঈসায়ী: ঈসা নবীর উম্মাত। উপরের আলোচনা থেকে পাঠক আশা করি বুঝতে পেরেছেন যে, তাঁদের এ কথাটি একেবারেই অসত্য। তাঁরা কখনোই ঈসা মাসীহকে কথা মানেন না। তাঁরা ঈসা মাসীহের নাম ভাঙ্গিয়ে সাধু পলের ধর্ম অনুসরণ করেন। পলের বানোয়াট ধর্মকে তারা ঈসায়ী ধর্ম বলে চালান। সাধু পলের ধর্মের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক যে, ঈসা মাসীহ যে কর্মগুলিকে জাহান্নামের পথ বলে উল্লেখ করেছেন, সাধু পলের ধর্মে সেগুলিকেই জান্নাতের পথ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে চারটি বিষয় উল্লেখ করছি: (ক) তাওহীদ ও শিরক, (খ) পাপের শাস্তি (গ) শরীয়ত পালন এবং (ঘ) ক্রুশে মরণ।

প্রথমত: তাওহীদ ও শিরক

(ক) ঈসা মাসীহ “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ঈসা রাসূলুল্লাহ”- বিশ্বাসের প্রচার করেছেন

প্রচলিত খৃস্টধর্মের মূল বিশ্বাস আল্লাহর ত্রিত্ব ও ঈসা মাসীহের ঈশ্বরত্ব। প্রচলিত ইঞ্জিলের মধ্যে বিদ্যমান ঈসা মাসীহের কোনো বক্তব্যে এ দুটি বিষয় নেই। ঈসা মাসীহ মূলত এক আল্লাহর ইবাদতের দাওয়াত দিয়েছেন। হিব্র“ ভাষার ব্যবহার অনুসারে তিনি আল্লাহকে পিতা বলতেন। পিতা অর্থ জগৎপিতা আর পুত্র অর্থ বান্দা। বিশেষত ধার্মিক মানুষদেরকে আল্লাহর পুত্র বলা হয়েছে বাইবেলে হাজার হাজার স্থানে। রোমীয় ৮/১৪ “যত লোক ঈশ্বরের আজ্ঞা দ্বারা চালিত হয়, তাহারাই ঈশ্বরের পুত্র।” এ অর্থেই শুধু তিনি নিজেকে আল্লাহর পুত্র ও আল্লাহকে পিতা বলতেন। পাশাপাশি তিনি আল্লাহর প্রেরিত বা রাসূল বলে প্রচার করেছেন। তিনি বলেন: “আর ইহাই অনন্ত জীবন যে, তাহারা তোমাকে, একমাত্র সত্যময় ঈশ্বরকে, এবং তুমি যাঁহাকে পাঠাইয়াছ, তাঁহাকে, যীশু খ্রীষ্টকে, জানিতে পায়। (And this is life eternal, that they might know thee the only true God, and Jesus Christ, whom thou hast sent.)” (যোহন ১৭/৩) অর্থাৎ জান্নাত বা অনন্ত জীবন লাভ করতে হলে বিশ্বাস করতে হবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবূদ নেই এবং ঈসা মাসীহ তাঁর “প্রেরিত” বা “রাসূল”।

যীশু তার শিষ্যদেরকে বলেন: “আর পৃথিবীতে কাহাকেও ‘পিতা’ বলিয়া স¤ে¦াধন করিও না, কারণ তোমাদের পিতা এক জন, তিনি সেই স¦র্গীয়। তোমরা ‘আচার্য’ বলিয়া সম্ভাষিত হইও না, কারণ তোমাদের আচার্য এক জন, তিনি খ্রীষ্ট।” (মথি ২৩/৯-১০) এ কথাটির সুস্পষ্ট অর্থ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ঈসা রাসূলুল্লাহ। আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবূদ নেই এবং ঈসা মাসীহ আচার্য, শিক্ষক বা রাসূল।

এক ব্যক্তি তাঁকে প্রশ্ন করে, হে সৎ গুরু (Good Master),অনন্ত জীবন পাইবার জন্য আমি কিরূপ সৎকর্ম করিব? তিনি তাহাকে কহিলেন, (Why callest thou me good? there is none good but one, that is, God: KJV/AU) আমাকে কেন সৎ (good) কহিতেছ? একজন ব্যতীত আর কেউই সৎ নন, তিনি ঈশ্বর।” (মথি ১৯/১৬-১৭। বাংলা অনুবাদে বিকৃতি আছে)।

তিনি নিজেকে “গড” বা ঈশ্বর বলা তো দূরের কথা “গূড” বা ভাল বলতেও রাজি হন নি। তাহলে যারা তাকে “গড” বা “খোদাবন্দ ঈসা মাসীহ” বলেন তাদের প্রতি তিনি কিরূপ নারাজ হবেন তা কল্পনা করুন। খৃস্টান প্রচারকগণ বলবেন যে, যীশু ইহূদীদের ভয়ে সত্য গোপন করেছেন। একজন মানুষ অনন্ত জীবনের পথ জানতে চাচ্ছেন, অথচ তিনি তাঁকে মিথ্যা বলে জাহান্নামী বানাবেন? ইহূদীদের ভয়ে সত্য গোপন করবেন? এরূপ কথায় কি ঈসা মাসীহের অবমাননা হয় না?

(খ) নিজের ইচ্ছামত কাউকে জান্নাতে নেওয়ার অধিকার বা ক্ষমতা যীশুর নেই

যীশু বলেন: “যাহারা আমাকে হে প্রভু, হে প্রভু বলে, তাহারা সকলেই যে স¦র্গ-রাজ্যে প্রবেশ করিতে পারিবে, এমন নয়, কিন্তু যে ব্যক্তি আমার স¦র্গস্থ পিতার ইচ্ছা পালন করে, সেই পারিবে। সেই দিন অনেকে আমাকে বলিবে, হে প্রভু, হে প্রভু, আপনার নামেই আমরা কি ভাববাণী বলি নাই? আপনার নামেই কি ভূত ছাড়াই নাই? আপনার নামেই কি অনেক পরাক্রম-কার্য করি নাই? তখন আমি তাহাদিগকে স্পষ্টতই বলিব, আমি কখনও তোমাদিগকে জানি নাই; হে অধর্মাচারীরা, আমার নিকট হইতে দূর হও।” (মথি ৭/২১-২৩)

এখানে তিনি স্পষ্ট করে বললেন যে, তাঁর ইচ্ছায় নয়, বরং আল্লাহর ইচ্ছাতেই জান্নাত মিলবে। কেউ যদি তাঁর নামে অনেক কারামতও দেখায়, কিন্তু আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করে তাহলে সে তাঁর শাফাআত লাভ করবে না এবং জান্নাত লাভ করবে না।”

যীশুর দু শিষ্যের মা তাঁর কাছে দাবি করেন যে, তার দুই ছেলে যেন তাঁর রাজ্যে তাঁর দুপাশে বসার অধিকার পায়। যীশু উত্তরে বলেন যে, তাঁর পাশে বসানোর ক্ষমতাও তাঁর নেই; বরং সকল ক্ষমতা আল্লাহর তিনি যাকে বসাবেন সেই বসবে: “যাহাদের জন্য আমার পিতা কর্তৃক স্থান প্রস্তুত করা হইয়াছে, তাহাদের ভিন্ন আর কাহাকেও আমার দক্ষিণ পার্শ্বে ও বাম পার্শ্বে বসিতে দিতে আমার অধিকার নাই।” (মথি ২০/২০-২৩) এখানে যীশু তার অধিকার ও ক্ষমতা অস্বীকার করলেন এবং একমাত্র আল্লাহই যে সকল ক্ষমতার মালিক তা ঘোষণা করলেন।

(গ) ঈসা মাসীহ গায়েব জানতেন না

তিনি বলেন: “কিন্তু সেই দিনের বা সেই দণ্ডের তত্ত্ব কেহই জানে না; স¦র্গস্থ দূতগণও জানেন না, পুত্রও জানেন না, কেবল পিতা জানেন।” (মার্ক ১৩/৩২) অর্থাৎ ঐশ্বরিক বা অলৌকিক ক্ষমতা তো দূরের কথা কোনো গাইবী বা অলৌকিক জ্ঞানও তাঁর নেই। কাজেই যারা দাবি করেন যে, ঈসা মাসীহ গাইবী ইলম বা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী তাঁরা মিথ্যাবাদী।

দ্বিতীয়ত: কিতাবুল মুকাদ্দাসের সাক্ষ্যে যীশু কারো পাপ বহন করবেন না

উপরের উদ্ধৃতিগুলি থেকে স্পষ্ট যে, কারো পাপ বহন করা তো দূরের কথা, ঈসা মাসীহ নিজের ইচ্ছায় কাউকে জান্নাতেও নিতে পারবেন না। কিতাবুল মুকাদ্দাস প্রমাণ করে যে, যীশু পাপীদের পাপ বহন করবেন না। প্রত্যেক পাপীকে তার নিজের পাপের জন্য দায়ী হতে হবে: “যে প্রাণী পাপ করে, সেই মরিবে; পিতার অপরাধ পুত্র বহন করিবে না, ও পুত্রের অপরাথ পিতা বহন করিবে না; ধার্মিকের ধার্মিকতা তাহার উপর বর্তিবে, ও দুষ্টের দুষ্টতা তাহার উপর বর্তিবে।” (যিহিষ্কেল ১৮/২০)

যীশু বলেছেন, “অধ্যাপক ও ফরীশীদের অপেক্ষা তোমাদের ধার্মিকতা যদি অধিক না হয় তবে তোমরা কোন মতে স্বর্গ-রাজ্যে প্রবেশ করিতে পারিবে না।” (মথি ৫/২০) যদি তিনি পাপীর পাপ বহন করবেন তাহলে ইহূদী দরবেশদের চেয়েও অধিক ধার্মিকতাকে জান্নাতের শর্ত করলেন কেন? মানুষকে প্রতারণা করতে মিথ্য বলেছেন?

প্রচলিত ইঞ্জিলের শেষ বইয়ের সর্বশেষ বক্তব্যগুলির মধ্যে রয়েছে: (But the fearful, and unbelieving, and the abominable, and murderers, and whoremongers, and sorcerers, and idolaters, and all liars, shall have their part in the lake which burneth with fire and brimstone: which is the second death: KJV/AU:: আক্ষরিক অনুবাদ: “কিন্তু ভীরুগণ, এবং অবিশ্বাসীগণ, এবং ঘৃণ্যগণ, এবং হত্যাকারীগণ, এবং ব্যভিচারী বা বেশ্যাগামীগণ, যাদুকরগণ এবং প্রতিমাপূজকগণ, এবং সকল মিথ্যাবাদীগণ তাদের অংশ লাভ করবে অগ্নি ও গন্ধক প্রজ্বলিত হ্রদে; এ হলো দ্বিতীয় মৃত্যু।” (প্রকাশিত বাক্য ২১/৮)

যদি যীশু পাপীদের পাপ বহন করবেন তাহলে এরূপ ছোট বড় সকল পাপের জন্য চিরস্থায়ী নরক বা দ্বিতীয় মৃত্যুর কথা বললেন কেন? অন্যত্র যীশু বলেন: “যে কেহ কোন স্ত্রীলোকের প্রতি কামভাবে দৃষ্টিপাত করে, সে তখনই মনে মনে তাহার সহিত ব্যভিচার করিল। আর তোমার দক্ষিণ চক্ষু যদি তোমার বিঘœ জন্মায় তবে তবে তাহা উপড়াইয়া দূরে ফেলিয়া দেও; কেননা সমস্ত শরীর নরকে নিক্ষিপ্ত হওয়া অপেক্ষা বরং একটি অঙ্গের নাশ হওয়া তোমার পক্ষে ভাল।” (মথি ৫/২৮-২৯)

তিনি সুস্পষ্ট বললেন যে, চক্ষু না তুললে পুরো দেহ জাহান্নামে পুড়বে। তিনি যদি পরনারীর প্রতি দৃষ্টিপাতের পাপও বহন করতে না পারেন তাহলে কোন্ পাপ বহন করবেন? খৃস্টান প্রচারক হয়ত বলবেন যে, তিনি মানুষদেরকে বুঝানোর জন্য এ সব কথা বলেছেন, মূলত তিনি সকল পাপ বহন করবেন; এভাবেই তাঁরা তাঁদের প্রতারণার প্রচারণা করতে যীশুকে মিথ্যাবাদী, ভীরু বা মুনাফিক বলেন। প্রকৃত সত্য হলো, তিনি কোনো পাপীর পাপই বহন করবেন না; তবে শুধু ইসরায়েল বংশের শিরকমুক্ত ঈমানদার মানুষদের পাপ ক্ষমার জন্য তিনি সুপারিশ করবেন।

তৃতীয়ত: কিতাবুল মুকাদ্দাসের শরীয়ত ও বিধিবিধান প্রতিষ্ঠা

আমরা দেখেছি যে, যীশু আক্ষরিকভাবে শরীয়তের ছোটবড় সকল বিধান পালন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। অথচ বর্তমান খৃস্টানগণ সাধু পলের মতানুসারে শরীয়তের কোনো বিধানই পালন করেন না। মাত্র দুটি বিধান উল্লেখ করছি:

(১) কিতাবুল মুকাদ্দাসে শিরক-কুফর-এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। যদি কোনো ব্যক্তি, পুরুষ, নারী, ছোট, বড় যে কেউ কোনোভাবে প্রতিমা, মূর্তি বা প্রতিকৃতি প্রতিষ্ঠা করে, শিরক করে বা শিরকের প্ররোচনা দেয় তাহলে তাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করতে হবে। এমনকি যদি কোনো নবীও অনেক মুজিযা দেখানোর পর কোনোভাবে শিরকের প্ররোচনা দেন, তাহলে তাকেও প্রস্তরাঘাতে হত্যা করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনোরূপ করুণা দেখানো যাবে না। যদি কোনো জনপদবাসী কোনোরূপ শিরকে নিপতিত হয় তাহলে সে গ্রামের বা নগরের সকল মানুষকে অবশ্যই হত্যা করতে হবে এবং সে গ্রামের সকল জীব-জানোয়ার পশুও হত্যা করতে হবে। গ্রামের সকল সম্পদ ও দ্রব্যাদি পুড়িয়ে ফেলতে হবে। এক্ষেত্রে তাওবারও কোনো সুযোগ নেই। (যাত্রাপুস্তক ২২/২০, ৩২/২৮, দ্বিতীয় বিবরণ ১৩/১-১৬, ১৭/২-৭, ১ রাজাবলী ১৮/৪০)

(২) বাইবেলে ব্যভিচার-এর একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। (লেবীয়: ২০/১০-১৭) আমরা দেখলান যে, পরনারীর প্রতি দৃষ্টিপাতকেও যীশু ব্যভিচার বলে গণ্য করেছেন এবং উক্ত ব্যক্তিকে তার চোখ তুলে ফেলে দিতে বলেছেন। (মথি ৫/২৮-২৯)

সম্মানিত পাঠক, যদি আজ ইহূদী-খৃস্টান বিশ্ব তাওহীদ ও শরীয়তের বিচার ও শাস্তি প্রতিষ্ঠা করতো তাহলে মানব সভ্যতা বর্তমানের ভয়ঙ্কর অবক্ষয়ের মধ্যে পড়তো না। এজন্যই মহান আল্লাহ তাদেরকে তাওরাত-ইঞ্জিল নির্দেশিত তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করতে (আল-ইমরান: ৬৪) এবং শরীয়তের আইনগুলি প্রতিষ্ঠা করতে (মায়িদা ৪৪-৪৮, ৬৮) নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ, তাওরাত-ইঞ্জিলের জালিয়াতি সত্ত্বেও অন্তত এগুলির মধ্যে বিদ্যমান তাওহীদ ও শরীয়তের বিধানগুলি যদি খৃস্টানগণ প্রতিষ্ঠা করতেন তাহলে মানব সভ্যতা রক্ষা পেত।

এ দুটি বিধানের আলোকে খৃস্টান চার্চ ও ধর্মগুরুদের অবস্থা বিচার করুন। প্রতিটি চার্চ যীশু, মরিয়ম ও অগণিত মানুষের ছবি বা মূর্তিতে পরিপূর্ণ। এগুলিকে ভক্তি করা হচ্ছে। খৃস্টান সমাজ তো বটেই, খৃস্টান চার্চগুলি ব্যভিচারের আখড়া। ইন্টারনেটে বা উইকিপিডিয়াতে sex abuse, sex abuse of catholic church, catholic celibacy ইত্যাদি বিষয়ে সার্চ করলে অনেক কিছু জানতে পারবেন।

সুপ্রিয় পাঠক, আসুন কিতাবুল মুকাদ্দাসের একটি বিধান কায়েম করি!

বাইবেলের নির্দেশ: “যে ব্যক্তি কোন ক্ষোদিত বা ছাঁচে ঢালা প্রতিমা, সদাপ্রভুর ঘৃণিত বস্তু, শিল্পকরের হস্ত নির্মিত বস্তু নির্মাণ করিয়া গোপনে স্থাপন করে সে শাপগ্রস্ত। তখন সমস্ত লোক উত্তর করিয়া বলিবে: আমেন” (দ্বিতীয় বিবরণ: ২৭/১৫) সকল ব্যভিচারী শাপগ্রস্ত (দ্বি. বি. ২৭/২০-২৩)। “যে কেহ এই ব্যবস্থার কথা সকল পালন করিবার জন্য সেই সকল অটল না রাখে, সে শাপগ্রস্ত। তখন সমস্ত লোক বলিবে: আমেন। (দ্বি. বিবরণ ২৭/২৬)। আসুন আমরা এ নির্দেশ পালন করে দুআ করি:

যে সকল পাদরি, পোপ ও বিশপ যীশু, মেরি ও অন্যান্য মানুষের ক্ষোদিত বা ছাঁচে ঢালা প্রতিকৃতি তৈরি করে চার্চে ও সমাজে প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাওরাতের বিধান প্রতিষ্ঠায় অটল থাকেন নি, বরং ঈসা মাসীহ পাপীর পাপ বহন করবেন বলে প্রতারণা করে সকল প্রকারের পাপাচার ও ব্যভিচার প্রশ্রয় দিয়েছেন, মানব সমাজকে এবং চার্চগুলিকে ব্যভিচারের আখড়া বানিয়েছেন, তারা সকলেই অভিশপ্ত হোক! আমীন!!

চতুর্থত: ক্রুশে মরণের অভিশাপ

ঈসা মাসীহের ভয়ঙ্কর অবমাননা তাঁর ক্রুশে মৃত্যুর দাবি। পাপীর পাপ ক্ষমার জন্য ঈশ্বরকে, ঈশ্বরের পুত্রকে অথবা কোনো নবীকে ক্রুশে মরে অভিশপ্ত হতে হবে? এর চেয়ে আজগুবি ও উদ্ভট কথা কিছু হতে পারে? প্রচলিত ইঞ্জিলের বর্ণনা প্রমাণ করে যে, ঈসা মাসীহের ক্রুশে মরণের গল্পগুলি বানোয়াট। কারণ চার ইঞ্জিলে ক্রুশের ঘটনা সম্পূণ চার রকমে বলা হয়েছে। বর্ণণাগুলির মধ্যে অনেক বৈপরীত্য। যে সকল ইঞ্জিলে প্রকৃত সত্য লেখা ছিল সেগুলি সাধু পলের অনুসারীরা গোপন করে ফেলেছেন। এরূপ একটি ইঞ্জিল বার্নাবাসের ইঞ্জিল (The Gospel of Barnabas)। বার্নাবাস (Barnabas: Joses/Joseph The Levite) যীশুর একজন শিষ্য। (প্রেরিত ১৩ থেকে ১৫ অধ্যায় এবং প্রেরিত ৪/৩৬-৩৭, ৯/২৭, ১১/১৯-৩০, ১২/২৫, ১ করিন্থীয় ৯/৬।) বার্নাবাসের ইঞ্জিল প্রাচীন ইঞ্জিলগুলির অন্যতম। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকে লিখিত পুস্তকাবলিতে এ ইঞ্জিলের উল্লেখ পাওয়া যায়। ৩২৫ সালে নিকীয় মহাসম্মেলনের পূর্ব পর্যন্ত বার্নাবাসের ইঞ্জিল আলেকজেন্দ্রীয় চার্চে ‘স্বীকৃত ইঞ্জিল’ হিসেবে গণ্য ছিল। দ্বিতীয় শতকের খৃস্টান ধর্মগুরু আরিনাউস (Irenaeus) এ ইঞ্জিল থেকে অনেক উদ্ধৃতি দিয়েছেন বলে জানা যায়। নিকীয় মহাসম্মেলনে একে ‘বাতিল’ ইঞ্জিল বলে ঘোষণা করা হয় এবং এর পাণ্ডুলিপিগুলি ক্রমান্বয়ে নির্মুল করা হয়। ১৬শ শতকে এর একটি পান্ডুলিপি পোপের ব্যক্তিগত পাঠাগার থেকে বের করা হয়। ফ্রাও ম্যারিনো নামে পোপ পঞ্চম সিক্সটাসের (Sixtus V: 1585-1590) এর একজন বন্ধু ছিলেন। একদিন পোপের ব্যক্তিগত পাঠাগারে তিনি ‘বার্নাবাসের ইঞ্জিলের’ একটি ল্যাটিন পাণ্ডুলিপি দেখতে পান। আরিনাউসের লিখনিতে ‘বার্নাবাসের সুসমাচারের’ উদ্ধৃতি পড়ে তার সুসমাচারটির বিষয়ে কৌতুহল ছিল। এজন্য তিনি পোপের অজান্তে পাণ্ডুলিপিটি চুরি করে নিয়ে যান। পরবর্তীকালে পাণ্ডলিপিটি বিভিন্ন প্রসিদ্ধ বই সংগ্রাহকদের হাতে পড়ে। অবশেষে ১৭৩৮ সাল থেকে তা ভিয়েনার লাইব্রেরীতে স্থিতি পেয়েছে। অষ্টাদশ শতকে প্রসিদ্ধ পাদরি জর্জ সেল এবং অক্সফোর্ডের প্রফেসর ড. মেনকহাউসর মাধ্যমে সুসমাচারটির ইংরেজি অনুবাদ করা হয়। ১৯০৭ সালে ইংরেজি অনুবাদটি প্রকাশ করা হয়। তবে অদ্ভুতভাবে তা বাজার থেকে উধাও হয়ে যায়। শুধু ব্রিটিশ মিউজিয়াম ও কংগ্রেস লাইব্রেরীতে দুটি কপি থেকে যায়। বার্নাবাসের ইঞ্জিলে সুস্পষ্ট লেখা হয়েছে যে, ঈসা মাসীহ ক্রুশে মরেন নি; বরং ঈষ্করিয়োতীয় যিহূদাকে আল্লাহ ঈসা মাসীহের আকৃতি প্রদান করেন এবং ইহূদীরা তাকে ধরে ক্রুশে হত্যা করে।

মহান আল্লাহ বলেন: “তাদের কথা: ‘আমরা আল্লাহ্র রাসুল র্মাইয়াম তনয় ’ঈসা মসীহ্কে হত্যা করেছি’ … অথচ তারা তাকে হত্যা করেনি, ক্রুশবিদ্ধও করেনি; কিন্তু তাদের এরূপ বিভ্রম হয়েছিল। যারা তাঁর সম্বন্ধে মতভেদ করেছিল, তারা নিশ্চয় এ সম্বন্ধে সংশয়যুক্ত ছিল; এ সম্পর্কে অনুমানের অনুসরণ ছাড়া তাদের কোন জ্ঞানই ছিল না। এটা নিশ্চিত যে, তারা তাঁকে হত্যা করেনি, বরং আল্লাহ্ তাকে তাঁর নিকট তুলে নিয়েছেন এবং আল্লাহ্ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (আল-ইমরান, ১৫৭-১৫৮)

ঈসা মাসীহকে প্রেম করার সত্যিকার উপায়

(ক) বাইবেলের মধ্যে জালিয়াতি বিদ্যমান; তাই কুরআনই নাজাতের পথ

সম্মানিত পাঠক, আমরা সবাই একমত যে, আল্লাহর মহান রাসূল ঈসা (আ)-কে ভালবাসতে হবে। আমরা নিশ্চিত হলাম যে, প্রচলিত কিতাবুল মুকাদ্দাস আল্লাহর কালাম বলে বিশ্বাস করলে যীশু, আল্লাহ ও নবীগণের বিষয়ে উপরের সব অশুভ বিষয় বিশ্বাস করতে হবে। আমরা নিশ্চিত হলাম যে, প্রচলিত কিতাবুল মুকাদ্দাস ও ইঞ্জিল শরীফ সত্য, মিথ্যা, জালিয়াতি ও বিকৃতিতে পরিপূর্ণ একটি গ্রন্থ। এজন্য ঈসা মাসীহকে সত্যিকারভাবে জানতে হলে আমাদেরকে কুরআন কারীমের উপর নির্ভর করতে হবে। কুরআন ঘোষণা করেছে যে, ইহূদী-খৃস্টানণ তিনভাবে তাওরাত, যাবূর ও ইঞ্জিলকে বিকৃত ও নষ্ট করে: (১) ভুলে যাওয়া, (২) বিকৃত করা (মায়িদা: ১৩, ১৪ ও ৪১), ও (৩) জাল কথা ও বই সংযোজন করা (বাকারা ৭৯, আল-ইমরান ৭৮)। এরূপ বিকৃতিসহ “তাওরাত”, “যাবূর” ও “ইঞ্জিল” নামে গ্রন্থগুলি বিদ্যমান, যেগুলির মধ্যে বিকৃতির পাশাপাশি মূল ওহীর কিছু বিষয় বিদ্যমান। যেমন, আল্লাহর একত্ব, ঈসা মাসীহের মানবত্ব, শরীয়তের আইন, মুহাম্মাদ (স.)-এর নুবুওয়াত ইত্যাদি বিষয়ক অনেক কথা এ সকল বিকৃত গ্রন্থে বিদ্যমান। কুরআনে জালিয়াতির নিন্দা করার পাশাপাশি ইহূদী-খৃস্টানদেরকে তাওরাত-ইঞ্জিলে বিদ্যমান আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (মায়িদা ৪৪-৪৮, ৬৮)। সর্বোপরি, জালিয়াতি থেকে বিশুদ্ধ বিষয়কে বাছাই করার জন্য আল-কুরআনকে সংরক্ষক, নিয়ন্ত্রক বা মানদণ্ড হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। (মায়িদা: ৪৮)

(খ) ঈসায়ী মুসলমান প্রসঙ্গ

সম্মানিত পাঠক, খৃস্টান প্রচারকগণ অনেক সময় কুরআন মানার দাবী করে বলেন যে, আমরা “ঈসায়ী মুসলমান”, আমরা বাইবেল ও কুরআন উভয়ই মানি, আমরা ঈসা (আ) ও মুহাম্মাদ (স.) উভয়কেই মানি। তাঁদের এ কথাগুলি সবই অসত্য।

সুপ্রিয় পাঠক, আপনি যদি জন্মগত খৃস্টান হন এবং আপনার ধর্ম সম্পর্কে আপনার জ্ঞান থাকে তাহলে আপনি নিশ্চিত জানেন যে, আপনার ধর্মে কুরআন এবং মুহাম্মাদ (স.)-কে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করা হয় এবং তাঁকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রতারক, ভণ্ড ও ঘৃণ্য মানুষ বিশ্বাস করা হয় (নাঊযু বিল্লাহ)। তাহলে কেন আপনি মিথ্য বলছেন? সত্য কথা বলে ধর্ম প্রচার করুন। আপনি কি জানেন না যে, ইঞ্জিলের শেষ কথা যে, মিথ্যবাদী চির-জাহান্নামী (প্রকাশিত বাক্য ২১/৮)

সুপ্রিয় পাঠক, আপনি যদি খৃস্টান প্রচারকদের এ সকল মিথ্যা কথায় প্রভাবিত হয়ে নতুন ঈসায়ী হয়ে থাকেন তাহলে আপনাকে জানতে হবে যে, একই সাথে ঈসা (আ) ও মুহাম্মাদ (স.)-কে মানার দাবি মিথ্যা। কারণ:

(১) যিনি একাধিক নবী মানার দাবি করেন তিনি মিথ্যাবাদী অথবা পাগল এবং তার ধর্ম জারজ ধর্ম। সকল নবীকে সম্মান করতে হয়; কিন্তু দুজনকে একত্রে মান্য করা যায় না। একাধিক নবী মানার দাবি করার অর্থ কাউকে না মানা। কারণ প্রত্যেক নবীর ধর্মেই বলা হয়েছে যে, অন্য কোনো ধর্ম বা নবী মানা যাবে না।

(২) যীশু বলেন: “আর পৃথিবীতে কাহাকেও ‘পিতা’ বলিয়া স¤ে¦াধন করিও না, কারণ তোমাদের পিতা এক জন, তিনি সেই স¦র্গীয়। তোমরা ‘আচার্য’ বলিয়া সম্ভাষিত হইও না, কারণ তোমাদের আচার্য এক জন, তিনি খ্রীষ্ট।” (মথি ২৩/৯-১০) অর্থাৎ: আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবূদ নেই এবং ঈসা তাঁর রাসূল, যাকে একমাত্র আচার্য বা শিক্ষক হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আপনি যদি বলেন যে, আপনি যীশু এবং মুহাম্মাদ (স.) উভয়কেই আচার্য মানেন তাহলে তো আপনি যীশুর এ কথা অবিশ্বাস করলেন।

(৩) ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ অর্থও একই: আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (স.) ছাড়া কোনো আচার্য বা মুরশিদ নেই। তাঁকে রাসূল হিসেবে বিশ্বাসের অর্থ একমাত্র তাঁর অনুসরণের মাধ্যমেই আল্লাহর প্রেম অর্জন করা যাবে বলে বিশ্বাস করা। আল্লাহ বলেন: “বল, ’তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর, আল্লাহ্ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ্ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (আল-ইমরান: ৩১)

এমনকি তাঁর নির্দেশ মান্য করার পরেও যদি মনের মধ্যে অন্য কোনো নবী বা আচার্যের শিক্ষার প্রতি টান থাকে, অন্য কারো শিক্ষা গ্রহণ করা যেতে পারে বলে বিশ্বাস থাকে বা অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থে সত্য সন্ধানের চিন্তা থাকে তাহলেও সে মুসলিম বলে গণ্য হবে না। আল্লাহ বলেন: “কিন্তু না, আপনার প্রতিপালকের শপথ! তারা মুমিন হবে না, যতক্ষন পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের মধ্যকার সকল বিতর্ক-সমস্যার বিচার-সিদ্ধান্তের ভার আপনার উপর অর্পণ না করে; তারপর আপনার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে এবং আন্তরিকভাবে তা মেনে নেয়।” (নিসা ৬৫)।

(৪) একই সাথে দুজনকে মানার একমাত্র পথ যে পরবর্তীকে মানতে হবে। পূর্ববর্তী সকল প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী বা এমপিকে সম্মান করতে হয়, কিন্তু দুজনকে একত্রে মান্য করা যায় না। কেবল সর্বশেষকেই মান্য করতে হয় এবং তার নির্দেশ মত চলতে হয়। এজন্য দুজনকে মানতে চাইলে অবশ্যই ঈসা মাসীহের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা সহ মুহাম্মাদ (স.)-কে মানতে হবে।

(৫) আমরা দেখেছি যে, ঈসা মাসীহের ইঞ্জিল জালিয়াতগণ নষ্ট করেছেন। তাঁর ধর্ম সাধু পল ও তাঁর অনুসারীরা নষ্ট করেছেন। কাজেই তাঁকে সরাসরি মানার উপায় নেই। তবে আপনি যদি কষ্ট করে প্রচলিত চার ইঞ্জিল থেকে শুধু ঈসা মাসীহের বক্তব্যগুলি একত্রিত করেন তাহলে আপনি নিশ্চিত হবেন যে, প্রচলিত খৃস্টধর্মের সকল বিশ্বাসই মিথ্যা এবং মুহাম্মাদ (স.)-ই ঈসা মাসীহের প্রতি প্রকৃত সম্মান প্রদর্শন করেছেন এবং তাঁর প্রকৃত শিক্ষাগুলি পুনরুজ্জীবিত করেছেন।

(৬) যীশু বলেছেন যে, তাঁর ধর্ম শুধু ইস্রায়েল বংশের মানুষদের জন্য (মথি ৭/৬; ১০/৫-৮; ১৫/২২-২৮)। তিনি বলেছেন যে, তার ধর্ম অসম্পূর্ণ, তাঁর পরে আরেক পারাক্লীত (প্রশংসিত বা সহায়) আসবেন, তিনি সত্যের আত্মা, (আল-আমীন, আস-সাদিক), তিনি তাঁর শিক্ষা পূর্ণ করবেন এবং তাঁর সঠিক মর্যাদা প্রকাশ করবেন (যোহন ১৬/৭-১৪)। কুরআন ঘোষণা করেছে যে, ঈসা মাসীহের প্রতিশ্র“ত “পারাক্লীত” হচ্ছেন আহমদ বা মুহাম্মাদ (স.) (সাফ্ফ: ৬) ঈসা মাসীহ নিজেও তাঁর শিষ্য বার্নাবাসকে জানিয়েছেন যে, এ প্রতিশ্র“ত পারাক্লীতের নাম মুহাম্মাদ ((বার্নাবাসের ইঞ্জিল: ২২০ অধ্যায়। আরো দেখুন: ১১২, ১৩৬ ও ১৬৩ অধ্যায়)।

আপনি যদি সত্যই ইঞ্জিল ও কুরআন মান্য করেন, আপনি যদি সত্যই ঈসা (আ) ও মুহাম্মাদ (স.) উভয়কে মান্য করেন; তবে অবশ্যই আপনাকে মুহাম্মাদ (স.) কে প্রতিশ্র“ত পারাক্লীত বা আহমদ এবং ঈসা মাসীহের একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে বিশ্বাস করে কুরআন ও হাদীস অনুসারে তাঁর দীনের অনুসরণ করতে হবে।

(গ) মধ্যস্থ নয়, বরং মহান আল্লাহর কাছে সরাসরি তাওবাই পাপীর মুক্তির পথ

খৃস্টানগণ বলেন, যীশু আল্লাহ ও তার বান্দার মাঝে মধ্যস্থতাকারী (mediator) (১ তিমথীয় ২/৫)। তাকে “মধ্যস্থ” বা ত্রাণকর্তা বলে বিশ্বাস করার পর আর পাপীর কোনো চিন্তা নেই। যত মহাপাপই কর না কেন, যীশু পার করে দেবেন। এ বিশ্বাস পাপীকে পাপ মুক্ত করে না, বরং পাপীকে মহাপাপীতে পরিণত করে।

পক্ষান্তরে মুহাম্মাদ (স.) জগতের প্রতিটি পাপীকে অতি সহজে পাপ মুক্ত হয়ে আল্লাহর ওলী হওয়ার এবং জান্নাত পাওয়ার পথ শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি তাওবার শিক্ষা দিয়েছেন। যত মহাপাপই হোক না কেন, যে কোনো পাপী বান্দা নিজের মনে অনুশোচনা ও তাওবার মাধ্যমে পরিপূর্ণ ক্ষমা ও নাজাত লাভ করতে পারেন।

সম্মানিত পাঠক, মনে করুন, একজন মায়ের একটি ছেলে। প্রায়ই মায়ের অবাধ্য হয়। এরপর যখনই মনটা নরম হয় মায়ের কাছে যেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে, ক্ষমা চায় এবং মা দোয়া করে আদর করে দেন। প্রায়ই এমন ঘটতে থাকে।

মায়ের আরেক ছেলে। প্রায়ই মায়ের অবাধ্যতা করে। সে জানে তার পিতা বা বড়ভাই তার জন্য মায়ের কাছে সুপারিশ করবেন। কাজেই সে মায়ের সান্নিধ্যে কখনোই যায় না, অথবা যখনই মনটা নরম হয় তখন বাবা বা বড়ভাইকে মায়ের কাছে তার জন্য সুপারিশ করতে অনুরোধ করে। বলুন তো কোন্ সন্তান সত্যিকার মাতৃপ্রেম ও মায়ের স্নেহ লাভ করবে এবং মায়ের সাথে গভীর সম্পর্ক কার হবে?

সম্মানিত পাঠক, সাধু পলের অনুসারীরা যীশুর ঈশ্বরত্ব, প্রায়শ্চিত্ববাদ ইত্যাদির মাধ্যমে মহান আল্লাহকে ও ঈসা মাসীহকে অপমান করেছেন। শুধু তাই নয়। মানুষের জন্য সত্যিকার আল্লাহ প্রেমের পথ বন্ধ করে দিয়েছেন।

সম্মানিত পাঠক, প্রতি মুহূর্তেই আমরা পাপ করি। যখনই মনটা একটু নরম হয় তখনই মনের মধ্যে আল্লাহর কথা মনে করা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়াই হলো পাপ মোচনের সঠিক পথ। পাপের মাধ্যমে আল্লাহর থেকে আমরা যতটুকু দূরে যাই, আল্লাহর যিকর ও তাওবার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর অনেক বেশি প্রেম ও নৈকট্য লাভ করি। ইসলামের শিক্ষা হলো, মহান আল্লাহ মায়ের চেয়েও অনেক প্রিয়, অনেক আপন। প্রতিটি মানুষকে তিনি সন্তানের চেয়েও অনেক বেশি ভালবাসেন। দীন শিক্ষার জন্য মানুষের উস্তাদ বা আলিমের প্রয়োজন। কিন্তু মহান আল্লাহর কাছে দুআ করতে বা তাওবা করতে পাপীকে কারো কাছে যেতে হবে না। কোনো মসজিদ, মাদ্রাসা বা আলিম-ইমামের কাছেও তাকে যেতে হবে না। নিজের স্থানে থেকে নিজের মনের আবেগ ও অনুশোচনা দিয়ে প্রতিটি মানুষ সরাসরি মহান আল্লাহকে ডাকবে, পাপ করলে তাঁর কাছে ক্ষমা চাইবে। দুষ্টু ছেলে যেমন বারবার অন্যায় করে আবার মায়ের কাছে যেয়ে যেয়ে মায়ের প্রিয়তম সন্তানে পরিণত হয়, তেমনি পাপী বান্দা পাপ করে আর ঘরে বসে তাওবা করে আল্লাহর প্রিয়মত ওলীতে পরিণত হন।

পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি যীশু বা অন্য কাউকে আল্লাহ ও তার মাঝে মধ্যস্থতাকারী বলে মনে করে বা কেউ তাকে ত্রাণ করবে বলে বিশ্বাস করে সে তাওবা ও আল্লাহর যিকর থেকে বঞ্চিত হয়, ক্রমান্বয়ে পাপ তার হৃদয়কে অন্ধকার করে তাকে জাহান্নামী করে। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন। আমীন।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s